সন্তানধারণের পর কোনটি খাওয়া দরকার, কোনটি নয়— তা নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার লোকের অভাব হয় না। তবে মা হওয়ার পরিকল্পনা পর্বে পুষ্টি নিয়ে আপনি আদৌ সচেতন কি?
পাঁচ বছরের ছেলের মা দীপান্বিতা দত্ত। একসময়ে অফিসে এসে টিফিনে নিয়ম করে ডিম সেদ্ধ আর পেয়ারা খেতেন । সহকর্মীরা একদিন প্রশ্নও করেছিলেন, প্রতি দিন একই খাবার কেন খান তিনি। উত্তর ছিল, মা হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেই নিজেকেও শারীরিক ভাবে প্রস্তুত করছেন। পেয়ারায় ফোলেট রয়েছে, শিশুর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড গঠনে জন্য সেটা খুব জরুরি বলেই খান।
দীপান্বিতার এমন মন্তব্য শুনে কারও মনে হয়েছিল, এটা বাড়াবাড়ি। কারণ মা হওয়ার কথা শুনে এমন খাওয়া-দাওয়া মানা যায়, কিন্তু পরিকল্পনা পর্বে কে এমন করে? তবে পুষ্টিবিদেরা বলছেন, ‘‘দীপান্বিতার মতো সচেতন সকলে হন না। অথচ মাতৃত্বের পরিকল্পনার সময়েই এ নিয়ে ভাবা দরকার।’’ ভ্রূণ গর্ভে চলে এলে হবু মায়ের থেকেই সে পুষ্টি পায়। ভ্রূণ বেড়ে ওঠার পর্বেই দরকার হয় ফোলেট-সহ প্রয়োজনীয় খনিজের। এই পর্বে মায়ের স্বাস্থ্য যদি ঠিক না থাকে তার প্রভাব পড়বে গর্ভস্থ শিশুর উপরেও। তা ছাড়া, সন্তান আসার পথ সুগম করতে কোনটি খাওয়া চলে, কোনটি নয়, জানা জরুরি। এই ব্যাপারেই পরামর্শ দিলেন, পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক এবং শম্পা চক্রবর্তী।
মা হওয়ার পরিকল্পনা পর্বে পুষ্টি কেন জরুরি
অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরে চিকিৎসক এবং পরিবারের অভিভাবকদের পরামর্শে পুষ্টি নিয়ে সচেতন হন হবু মায়েরা। কারণ, তাঁর পুষ্টির অংশেই বেড়ে ওঠে গর্ভস্থ সন্তান। কিন্তু পুষ্টিবিদেরা মনে করাচ্ছেন, স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন তারও আগে, সন্তানকে পৃথিবীতে আনার পরিকল্পনার সময়েই। অনেক সময় গর্ভাবস্থার কথা বুঝতেও খানিক দেরি হয়ে যায়। অথচ শুরু থেকেই ভ্রূণের বেড়ে ওঠার জন্য খনিজ, ভিটামিন, প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া, সন্তানধারণের পথ প্রশস্ত করার জন্যেও সঠিক পুষ্টি জরুরি।
আরও পড়ুন:
শম্পা বলছেন, ‘‘পরিবার পরিকল্পনা করার সময় থেকেই স্বাস্থ্য নিয়ে নারী-পুরুষ, দু’জনেরই সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষত, মহিলাদের ক্ষেত্রে ওজন ঠিক রাখা দরকার। ওজন কম-বেশি হলে, উপযুক্ত ডায়েটের মাধ্যমে তা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক আছে কি না। আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলিক অ্যাসিড, ভিটামিন ডি, ক্যালশিয়ামের মাত্রা ঠিক থাকা খুবই জরুরি। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়া জরুরি। দরকার প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটেরও।’’
ওজন কেন গুরুত্বপূর্ণ
হবু মায়ের ওজন বেশি হলে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার ওজন অনেকটা কম থাকলে, শিশুরও ওজন কম হতে পারে। সু্স্থ সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য তাই মায়ের পুষ্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এই সময়ে তালিকায় কোন খাবার রাখা দরকার, বাদ দেবেন কোনটি, সে সম্পর্কে বিশদে জানালেন পুষ্টিবিদ অনন্যা। তিনি বিশেষ ভাবে জোর দিচ্ছেন, ফোলেটের উপর। শিশুর মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ড গঠনের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। গর্ভাবস্থার শুরুতেই যদি ফোলেটের অভাব হয়, শিশু ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। ‘স্পাইনা বিফিডা’ (মেরুদণ্ড ঠিক ভাবে তৈরি না হওয়া), অ্যানেনসেফালি-র (গর্ভস্থ শিশুর মাথার খুলি, সামনের অংশ ঠিক ভাবে তৈরি না হওয়া) মতো সমস্যা হতে পারে। ফোলেট লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে, গর্ভস্থ শিশুর কোষ বিভাজনে সাহায্য করে। প্রসবের সময় ঝুঁকিও কমায়। অনন্যা বললেন, ‘‘শুধু খাবারের মাধ্যমে ফোলেটই যথেষ্ট নয়, মা হওয়ার পরিকল্পনা পর্ব থেকেই সাপ্লিমেন্ট হিসাবে ফোলেট খাওয়ার দরকার পড়ে। দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম ফোলেট ট্যাবলেট নেওয়া যায়। গর্ভধারণের পরে সেই মাত্রা বৃদ্ধির দরকার হয়।’’ এ ছাড়াও প্রয়োজন হয় কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সঠিক সমন্বয়ের।
মাতৃত্বের ভাবনা থাকলে কী থাকবে পাতে?
ফোলেট
পালংশাক, মেথি, ব্রকোলি, ছানা, মুসুর ডাল, লেবু জাতীয় ফল
প্রোটিন
ডিম, পনির/ টোফু, ডাল, রাজমা, কাবলি ছোলা, মাছ, মুরগির মাংস, টক দই
কার্বোহাইড্রেট
ব্রাউন রাইস, মিলেট (রাগি, জোয়ার, বাজরা), ওট্স, রাঙাআলু
অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ খাবার
বেরি জাতীয় ফল, বেদানা, আমলকি, ডার্ক চকোলেট, হলুদ, গ্রিন টি
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট
ঘি, নারকেল (লিপিডের মাত্রা ঠিক থাকলে), আখরোট, তিসিবীজ, চিয়াবীজ, তৈলাক্ত মাছ
ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড
আখরোট, তৈলাক্ত মাছ, তিসির বীজ
ভিটামিন
আমলকি, লেবু জাতীয় ফল (ভিটামিন সি)
কাঠবাদাম, সূর্যমুখীর বীজ (ভিটামিন ই)
সেলেনিয়াম (বাদাম এবং ডিম)
লাইকোপেন (টোম্যাটো)
জ়িঙ্ক
কুমড়োর বীজ, সাদা তিল, রাজমা, ডিম, মাংস
আয়রন (হিমোগ্লোবিন কম থাকলে খেতে হবে)
পালংশাক, মেথিশাক, ডিম, মেটে, সজনেপাতা
কোন খাবার বাদ দেওয়া প্রয়োজন
ময়দার খাবার, সাদা পাঁউরুটি, মিষ্টি, অতিরিক্ত চিনি, শরবত এড়িয়ে চলা ভাল। মদ্যপান এবং ধূমপানও যতটা সম্ভব কমিয়ে দেওয়া বা ছেড়ে দেওয়া দরকার।
পুষ্টিবিদেরা জানাচ্ছেন, তালিকায় থাকা খাবারগুলির মধ্যে থেকে পছন্দমতো খাবার বেছে নিতে হবে। খেতে হবে ক্যালোরি মেপে, প্রয়োজনমতো। পুষ্টির ভারসাম্য যেন বজায় থাকে।
একই সঙ্গে অনন্যা বলছেন, ‘‘পরিবার পরিকল্পনার সময় শুধু পুষ্টিকর খাওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুমেরও। কারণ, এই বিষয়গুলি হরমোনের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে।’’