৪০-এর পরে মহিলাদের শরীর-মনের বদল, মেজাজ পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। এই সব বিষয়ে আলোচনাও হয় যথেষ্ট। কিন্তু পুরুষদের ৪০-এর পর কী হয়, তা নিয়ে চর্চা তুলনায় কম। মহিলাদের রজোনিবৃত্তির আগে হরমোনের হেরফের হয় অনেক সময়েই। তার প্রভাব পড়ে শরীরে এবং মেজাজে। মোটামুটি ৪৫ থেকেই শুরু হয় মেনোপজ়। এমন কিছু কি হয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও?
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ৪০-এর কোঠায় পৌঁছোলে শুধু মহিলাদের নয়, পুরুষদেরও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতে বদল আসে। তার প্রভাব শুধু শরীরে বা মনে নয়, পড়ে যৌন জীবনেও। এমন বয়সে পৌঁছে ক্লান্তি, খিটখিটে হয়ে যাওয়া, মেজাজ বদলে যাওয়াকে অনেকে বেশি পরিশ্রমের ফল হিসাবে দেখেন। অনেকে ভাবেন, এটা হচ্ছে মানসিক চাপ থেকে। কিন্তু আদতে তা নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে হরমোনের খেলা, বলছেন চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী এবং অভিজ্ঞান মাঝি।
চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষদের শরীরের পরিবর্তন প্রসঙ্গে চিকিৎসক সুবর্ণ বলছেন, ‘‘৪০-এর পরে বহু পুরুষেরই অ্যান্ড্রোপজ় হয়। এটি পুরুষদের বয়সজনিত একটি অবস্থা, যখন শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে যায়। এই বদল আচমকা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়, ‘লেট-অনসেট হাইপোগনাডিজ়ম।’’ ডায়াবিটিসের চিকিৎসক অভিজ্ঞান জানাচ্ছেন, ৪০ পার করার পর প্রতি বছর পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা ১ শতাংশ করে কমতে থাকে। ওজন বৃদ্ধি, পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া বা হাড়ের ক্ষয় নিয়ে এই বয়সে লোকে মাথা ঘামান না। অথচ এই সবের নেপথ্যে কিন্তু হরমোনেরই প্রভাব থাকে।
এই বয়সের সমস্যাগুলি নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা কেন জরুরি? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
‘পুরুষের মেনোপজ়’
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং অ্যান্ড্রোপজ়ের এই পর্যায়কে অনেকে ‘পুরুষের মেনোপজ়’ বলেন। রজোনিবৃত্তির সময় মহিলাদের শরীরে যেমন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়, তেমনই পুরুষ হরমোন বলে পরিচিত টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার ফলে বেশ কিছু বদল হয় পুরুষের শরীরেও। পুরুষালি চেহারা এবং ক্ষমতা কমতে থাকে। কমে যায় যৌন ইচ্ছাও।
কোন ধরনের শারীরিক-মানসিক বদল হতে পারে?
· ক্লান্তি, অল্প কাজ করে হাঁপিয়ে যাওয়া
· পেশির ক্ষয়
· শরীরের ভিতরে ভিসারাল ফ্যাট জমে ভুঁড়ি
· যৌন ইচ্ছা ও ক্ষমতা হ্রাস
· অবসাদ দেখা দেওয়া
· মেজাজের বদল ঘটা
· ব্রেন ফগ ঘটে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
· আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটা
কোন কোন সমস্যা হতে পারে এই বয়সে?
শরীর-মনের এই ছোটখাটো বদলের গভীর প্রভাব পড়তে পারে শরীরে। হতে পারে হার্টের সমস্যা, বেড়ে যেতে পারে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি। ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
অভিজ্ঞান বলছেন, ‘‘টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে থাকার ফলে নানা রকম বদল হয় শরীরে। ফ্যাট জমার প্রবণতা তৈরি হয়। লিভার-সহ শরীরের ভিতরের প্রত্যঙ্গে ভিসারাল ফ্যাট তৈরি হলে অন্যান্য হরমোনের মাত্রার তারতম্য হতে পারে। তার জেরে ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি কমে যায়, অর্থাৎ ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা ঠিক থাকে না। টাইপ ২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।’’
পাশাপাশি, মানসিক চাপ বাড়লে, ঘুম ঠিক না হলে স্ট্রেস হরমোন নামে পরিচিত কর্টিসলের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই বয়সে যেহেতু মেদ জমার প্রবণতা তৈরি হয়, তাই ওজন বশে রাখতে না পারলে তার প্রভাব পড়তে পারে কোলেস্টেরল, রক্তচাপেও। ফলে ঝুঁকি বাড়তি পারে হার্টের অসুখেরও।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে, অস্টিয়োপোরোসিসের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ঝুঁকি কাদের বেশি?
ডায়াবিটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি বা লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অ্যান্ড্রোপজ়ের ঝুঁকি বেশি। সুবর্ণ জানাচ্ছেন, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এই সব রোগের সম্ভাবনা বাড়ায়। যে সব পুরুষ দীর্ঘ দিন স্টেরয়েড বা কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ খান, তাঁদের মধ্যেও দ্রুত অ্যান্ড্রোপজ়ের লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যপরীক্ষা কতটা জরুরি?
৪০-এর পরে সুস্থ থাকতে বছরে এক বার স্বাস্থ্যপরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। হরমোন সংক্রান্ত পরীক্ষাও করা যেতে পারে। তবে এই বয়সে টেস্টোস্টেরন স্বাভাবিক ভাবেই অল্প অল্প করে কমতে থাকবে, মনে করাচ্ছেন অভিজ্ঞান। লিভারের কার্যক্ষমতা, ইসিজি, কোলেস্টেরল, লিপিড-প্রোফাইল, ভিটামিন ডি৩-এর মতো কিছু পরীক্ষা করিয়ে নিতে বলছেন চিকিৎসকেরা। সুবর্ণ বলছেন, ‘‘টেস্টোস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করানো যেতে পারে। তবে সেটা পরের ব্যাপার। তার আগে জীবনযাপনে বদল আনা দরকার।’’
জীবনযাপনে কোন বদল জরুরি
· পু্ষ্টিকর খাবার খাওয়া। ডায়েটে যেন কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন-খনিজের ভারসাম্য বজায় থাকে।
· হাঁটাহাটি, শরীরচর্চা খুব জরুরি। এই বয়সে এসে যদি নতুন করে খেলাধুলোয় যুক্ত হওয়া যায় শরীর ভাল থাকে।
· নিয়ম করে গায়ে রোদ লাগানো, খোলা হাওয়ায় ঘোরাঘুরি শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
· ধূমপান, মদ্যপানে রাশ টানতে হবে।
· অতিরিক্ত ভাজাভুজি বাদ দিয়ে ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
· মন-মেজাজ ভাল রাখার আদর্শ উপায় প্রাণায়াম এবং যোগব্যায়াম অভ্যাস করা।
· সঠিক ঘুম এবং বিশ্রাম জরুরি।
সচেতনতা জরুরি কেন
বেশির ভাগ পুরুষই শরীর-মনের বদল কেন হয়, জানেন না। এই নিয়ে সচেতনতাও বেশ কম। ফলে যৌন ক্ষমতা কমে যাওয়া, সঙ্গীকে খুশি করতে না পারার জন্য হীনম্মন্যতায় ভোগেন অনেকে। এই নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার পরিসরও বেশ কম। ফলে, বিষয়গুলি মনোজগতেও প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া, শারীরিক সমস্যাগুলিকেও এড়িয়ে যান অনেকে, তার ফলে একাধিক রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।