Advertisement
E-Paper

আকাশ-বাতাসে ধর্ম-বিলাসে

বারাণসী কোনও এক ধর্মের শহর নয়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর, প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি পর্যটক, অনতিদূরের বৌদ্ধ পীঠস্থান। এবং বহু বিধর্মীরবারাণসী কোনও এক ধর্মের শহর নয়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর, প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি পর্যটক, অনতিদূরের বৌদ্ধ পীঠস্থান। এবং বহু বিধর্মীর

সুচন্দ্রা ঘটক

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০১৮ ০০:৩৮
দশাশ্বমেধ ঘাট

দশাশ্বমেধ ঘাট

কাশী/ বারাণসী/ বেনারস/ বনারস/ ভরানসি!

কেউ বলবেন, নামে কী বা আসে যায়? সকলে যে যাচ্ছি একই জায়গায়।

কিন্তু নামেও আসে যায়। যে যেই নামে ডাকেন, সে যে সেই নামেই দেখেন অতি প্রাচীন এই শহরটিকে! বারাণসীর অলি-গলি-পাকস্থলি তেমনই সব কথা বলে।

নানা রূপ নয়, একই রূপের নানা স্তর। নানা রং। অবলীলায় একই গুণের কারণে এ শহর কখনও কোনও ভিটে থেকে উৎখাত হওয়া একাকিনীর কাছে প্রাণেশ্বর কাশী, তো কখনও ঘরছাড়া শ্বেতাঙ্গিনী মানবীর কাছে অতি আদরের ভরানসি। ধর্ম এখানে চোখ রাঙিয়ে সেবা কাড়ে, আদর করে আগলে রাখে, প্রাচুর্যে নজর ভরায়, দারিদ্রের শোকেসও সাজায়। তাই বলে এ শহর শুধুই ধর্মের নয়। এ শহর ধর্মের স্ত্রী, পুত্র, বান্ধবীর। এবং অবশ্যই বহু বিধর্মীর।

রাজার বাড়ি

কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরকে ঘিরেই হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসীদের বেশি আনাগোনা এখানে। কাছেই দশাশ্বমেধ ঘাটের আরতি, মাঝরাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোরে বিশ্বনাথের দর্শন, পুজো। কে জানে এ সব রীতি কত জন্মের! বংশ পরম্পরায় রক্ষা করা আছে এই ঐতিহ্য। এই মন্দির ঘিরে বহু জনের সংসার। এই মন্দিরের সেবার দায়িত্ব পাওয়া সম্মানের শেষ কথা তাঁদের অধিকাংশের কাছেই। ধর্মের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা তাঁরা। পরম সম্ভ্রমে আগলে রেখেছেন সব রীতি-রেওয়াজ। আজ পর্যন্ত অযত্ন হয়নি তাঁদের হাতে। দিন-রাত এক করে চলে যজ্ঞের প্রস্তুতি, আরতির আয়োজন। কাশী বিশ্বনাথের গলি, দশাশ্বমেধ ঘাট এখনও কোনও রাতে ঘুমোয়নি তাই।

ঘুমোয়নি কখনও দশাশ্বমেধের অনতিদূরের মণিকর্ণিকা ঘাটও!

সেখানে নেভেনি কখনও কাঠের চুল্লির আগুন। নিভলেই বা চলে কী করে? কত মরণাপন্ন আশা নিয়ে দিনের পর দিন মৃত্যুর অপেক্ষা করেন এ শহরে এসে, শুধু মণিকর্ণিকার কোনও এক চুল্লিতে তাঁর স্বর্গারোহণের ব্যবস্থাপনা হবে বলে। কাশী যে তাঁদেরও একান্ত আপন। সে কাশী পুজোর নয়। কত গলির কত গেস্ট হাউস তৈরি হয়েছে শুধু মরণাপন্নদের জন্যই।

গানের গলি

ধর্মের যে গাম্ভীর্যে গমগম করে কাশী বিশ্বনাথের গলি, সেই গাম্ভীর্যের আগুন রাত-দিন জ্বালিয়ে রাখে মণিকর্ণিকা। কোনও এক বিকেল-সন্ধেয় আরতির আগে নৌকো চেপে গঙ্গাবিহারের ফাঁকে যখন চোখে পড়বে সেই ঘাট ও তার ধোঁয়া, তখন দূষণের কথা না ভেবে, পুণ্যলাভকেই প্রাধান্য দিতে হবে। কাশী দর্শনের সময়ে আধুনিক জীবনের ভাবনাচিন্তাকে গুরুত্ব দিলে মাঠে মারা যাবে ভ্রমণ!

সারনাথ

বরং কাশীর ঘাটে ঘাটে যে ভাবে গম্ভীর প্রাচীনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গালগল্প করে যে ভাবে বেঁচে আছে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অতি পরিচিত, আলোচিত সমীকরণ, তা-ই উপভোগ করার এখানে। বারাণসী যে সেই মিলমিশের আহ্লাদেই গোটা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠেছে ‘ভরানসি’। সাবেক মেজাজের রীতি-রেওয়াজ নিয়ে মশগুল সব গলিতেই শ্বেতাঙ্গিনী সেই মুগ্ধতার চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কেউ থেকে গিয়েছেন এখানকার কোনও যুবক বা যুবতীকে বিয়ে করে, কেউ বা দূর দেশের সংসার ফেলে কাজের ফাঁকে ফিরে ফিরে আসেন এ শহরে। ভারতীয় পোশাক-গয়না-টিপে সেজে তাঁরাই সাজিয়ে তোলেন ভরানসিকে। এক চিলতে বারাণসী শহরটির বিশ্বের দরবারে বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা অনেকটা তাঁদের জন্যই। বিলিতি গল্প-উপন্যাসের ‘হিপি’ বা ‘হরে কৃষ্ণ ক্রাউড’ তাঁরা। সেই বান্ধবীদের দৌলতেই ডাল-ভাতের নিরামিষ রান্নাঘরের পাশে ব্যবসা জমে জার্মান বেকারি, লেমনেড স্টোরের। বাঙালিটোলার গলি যত না বাঙালি, তার চেয়ে বেশি যেন হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক। জাপানি বৌদির কেবিন, নেপালি কাকিমার দোকান তো আছেই, সঙ্গে ফরাসি-ইতালীয়-মার্কিন দাদা-কাকা, দিদির সংসার যে কম নেই এ তল্লাটে।

সকলেই কি ধর্মমুগ্ধ তাঁরা? শুধু ধর্মের টানেই কি তাঁরা ঘুরে ঘুরে আসেন এ চত্বরে? বারাণসী চেনা এবং বোঝা যে অত সহজ নয়। বারাণসীর অলিগলির সংসার দেখতে গেলে বাদ দেওয়া চলে না বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রাজকীয় বারাণসীর রাজাদের বাসস্থান রামনগর কেল্লা, বারাণসীর মুসলিম পাড়া এবং কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বৌদ্ধ ধর্মের পিঠস্থান সারনাথ।

মন্দিরের অন্দরে

এতেই শেষ নয়। বারাণসী যার হাতে হয়েছে বনারস— সেই উচ্চাঙ্গ বেনারস ঘরানার কথাও মাথায় রাখতে হবে। খেয়াল, ঠুমরি, বেনারসি শাড়ি, মশলার গন্ধে ম ম করা বারাণসী মেজাজ কম মানুষকে টানেনি এ শহরে। আজও দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী সঙ্গীতের তালিম নিতে হাজির হন এখানে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রভাবও এই শহরের গলিতে গলিতে।

বাঙালিটোলার কোনও এক জার্মান বেকারিতে বসে গাজরের কেকে কামড় দিয়ে চোখ তুলতেই হয়তো নজরে পড়বে শনিবারের এমনই কোনও সঙ্গীত-সন্ধের পোস্টার। গঙ্গার ধারের আরতি ফেলে সে সন্ধে যেন অবশ্যই হয় সঙ্গীতের। কোনও এক গুরুর উঠোনে কাঠের বেঞ্চে বসে গুরু-শিষ্যদের বাদ্যে-কণ্ঠে রাগের স্পর্শ সঙ্গী হয়ে রয়ে যাবে আজীবন। এমন এক সন্ধে ছাড়া বারাণসী ভ্রমণ যে খানিক অসম্পূর্ণই!

কীভাবে যাবেন

কলকাতার বিভিন্ন স্টেশন থেকে ট্রেন যায় বারাণসী পর্যন্ত। দমদম বিমানবন্দর থেকে প্লেনেও যাওয়া যায় বারাণসী

Varanasi Travel and Tourism Travel Guide বারাণসী
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy