ইজ়রায়েল-আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতে প্রথম বার ‘ডান্সিং মিসাইল’ হানা ইরানের! কেন বিপজ্জনক ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’? ক্ষমতাই বা কী?
ইরানের দেশীয় প্রযুক্তিতে নকশা করা এবং তৈরি করা দ্বিপর্যায়ের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হল সেজ্জিল, যা চলে কঠিন জ্বালানির সাহায্যে। ‘ডান্সিং মিসাইল’ ছাড়াও সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র পরিচিত সাজ্জিল, আশৌরা এবং আশুরা ক্ষেপণাস্ত্র নামেও।
রবিবার পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ১৬তম দিনে প্রবেশ করতেই ইজ়রায়েল-আমেরিকার ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রে হামলা চালিয়েছে ইরান। তেমনটাই জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেসটিভি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার ইজ়রায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ওই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি উৎক্ষেপণ করেছে ইরান, যার মধ্যে রয়েছে সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রও।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শত্রুদের লক্ষ্য করে এই প্রথম বারের জন্য সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করল ইরান। ইরানি এই শক্তিশালী ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচিত ‘ডান্সিং মিসাইল’ নামেও।
সেজ্জিল ইরানের সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও নকশায় তৈরি দ্বিপর্যায়ের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা চলে কঠিন জ্বালানির সাহায্যে। ‘ডান্সিং মিসাইল’ ছাড়াও সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র পরিচিত সাজ্জিল, আশৌরা এবং আশুরা ক্ষেপণাস্ত্র নামেও।
কিন্তু কী এই সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র? ইরানের হাতে ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ়, দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের হাতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি।
ইহুদিদের ধ্বংস করতে ইরানের কাজে লাগতে পারে দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। ৩০০ কিলোমিটার থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার এই সব ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একাধিক ধরন রয়েছে। এর মধ্যে ছোট পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান থেকে সরাসরি ইহুদি ভূখণ্ডে হামলা করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন:
স্বল্পপাল্লার অস্ত্রের মধ্যে শাহাব-১ (৩৫০ কিমি) এবং শাহাব-২ (৭৫০ কিমি) ব্যবহার করে ইরান। এ ছাড়াও রয়েছে কিয়াম-১, যার পাল্লা ৭৫০ কিমি। সব ক’টিই তরল জ্বালানি দিয়ে চলে। কঠিন জ্বালানি চালিত ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্র ফতেহ পরিবারের মধ্যে রয়েছে ফতেহ-১১০ (৩০০ কিমি), ফতেহ-৩১৩ (৫০০ কিমি) এবং জ়োলফা (৭৫০ কিমি)।
ইরানের হাতে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, সেজ্জিল, গদর ১১০-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির পাল্লা ১,২০০ থেকে ৩,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে।
ইজ়রায়েল এবং পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপর রবিবার সেই সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে ২,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও ইহুদিদের এলাকায় আক্রমণ চালাতে পারে সাবেক পারস্য মুলুকটি।
তেহরানের সেজ্জিল-২ একটি দ্বিস্তরীয় কঠিন জ্বালানি চালিত মাঝারি-পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ক্ষেপণাস্ত্রটির আনুমানিক পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটার এবং পেলোড বা বিস্ফোরক বহণের ক্ষমতা প্রায় ৭০০ কিলোগ্রাম।
আরও পড়ুন:
লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণের পর সোজা অনেকটা উঁচুতে উঠে গিয়ে নিখুঁত নিশানায় হামলা চালাতে পারে সেজ্জিল। সেই কারণে একে ‘ডান্সিং মিসাইল’ বা ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ও বলা হয়। ইজ়রায়েলের আয়রন ডোমের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে হামলা চালাতেও সক্ষম সেজ্জিল।
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ় (সিএসআইএস)’ অনুযায়ী, সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ১৮ মিটার লম্বা। ব্যাস প্রায় ১.২৫ মিটার। আনুমানিক ওজন ২৩,৬০০ কিলোগ্রাম।
সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রে কঠিন জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। কঠিন জ্বালানি ক্ষেপণাস্ত্রটিকে একটি কৌশলগত সুবিধাও দেয়। তরল জ্বালানি চালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণে সক্ষম সেজ্জিল।
সূত্রের খবর, সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা তৈরির কাজ ’৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে শুরু করে ইরান। সিএসআইএস-এর মতে, ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের বছরটি ছিল ২০০৮।
জানা গিয়েছে, প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের সময় ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিল। তবে উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম মূল্যায়নের জন্য ২০০৯ সালের মে মাসে দ্বিতীয় বারের জন্য উৎক্ষেপণ করা হয় সেজ্জিলকে।
২০০৯ সাল থেকে সেজ্জিলের আরও চারটি উড়ান পরীক্ষা করা হয়েছে। ষষ্ঠ পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটি ভারত মহাসাগরে প্রায় ১,৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। ওয়াশিংটন-তেল আভিভের সঙ্গে সংঘাতের ১৬তম দিনে প্রবেশের পর রবিবার শত্রুদের লক্ষ্য করে সেই সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালাল তেহরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের তরফে ইরানে যৌথ হামলা চালানোর পর দু’পক্ষের সংঘর্ষ বাধে। এর মধ্যেই আমেরিকার হামলায় ইরানের ৮৬ বছর বয়সি সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
প্রতিশোধ নিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। ইজ়রায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা শুরু করেছে দেশটি। অন্য দিকে ইজ়রায়েল এবং মার্কিন ফৌজও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার ১৭তম দিনে পা দিয়েছে সেই সংঘাত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই ২০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, তবে নিহতদের বেশির ভাগই ইরানীয়। মার্কিন যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন জানিয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলি বাহিনী ইরান জুড়ে ১৫,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।