‘অপারেশন লোটাস’-এর পর ‘অপারেশন টাইগার’! এ বার ঘর ভাঙছে উদ্ধব-সেনার? দল পাল্টাতে তৈরি ১৬ বিধায়ক, ৬ সাংসদ?
উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন দল থেকে সাংসদদের ভাঙানোর প্রচেষ্টা চলছে— এমন ইঙ্গিত দিয়ে ‘অপারেশন টাইগার’ নামে একটি অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-য় ভাঙন ধরার জল্পনা জোরদার হয়েছে।
তৃণমূলের পরে এ বার ভাঙন ধরতে পারে শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) শিবিরে! আশঙ্কা, ভাঙন ধরাতে পারে সেই বিজেপিই। সেই আবহে রবিবার দলের লোকসভার সাংসদদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন উদ্ধব ঠাকরে। ঠাকরে পরিবারের বাসভবন, মুম্বইয়ের ‘মাতোশ্রী’-তে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। জানা গিয়েছে, সেই বৈঠকে দলের ভাঙন জল্পনা নিয়ে মুখও খুলেছেন শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) প্রধান।
উল্লেখ্য, উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন দল থেকে সাংসদদের ভাঙানোর প্রচেষ্টা চলছে— এমন ইঙ্গিত দিয়ে ‘অপারেশন টাইগার’ নামে একটি অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-য় ভাঙন ধরার জল্পনা জোরদার হয়েছে।
তবে দলের কয়েক জন সাংসদের আনুগত্য নিয়ে চলা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে উদ্ধব স্পষ্ট জানিয়েছেন, কেউ যদি দল ছেড়ে যেতে চান, তবে তাঁকে থাকার জন্য তিনি কোনও ভাবেই বাধ্য করবেন না।
সূত্রের খবর, রবিবার দলের সাংসদদের বৈঠকে কথা বলার সময় ২০২২ সালে শিবসেনায় হওয়া ভাঙনের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন উদ্ধব। মন্তব্য করেন, বিদ্রোহ প্রকাশ্যে আসার অনেক আগেই তিনি এর আঁচ পেয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে দলে ধরে রাখার জন্য কোনও চাপ সৃষ্টি করেননি।
ঠাকরে নাকি বলেন, ‘‘আজকের দিন হয়তো আমার নয়, কিন্তু আগামী দিনটা নিশ্চিত ভাবেই আমার। সেই সময় আসা পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সহ্য করতে হবে।’’ মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে হওয়া ভাঙনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ঠাকরে এ-ও বলেন, ‘‘যাঁরা বালাসাহেবের শিবসেনা ছেড়ে চলে গিয়েছেন, তাঁরা এক সময় এর জন্য অনুশোচনা করবেন। কিন্তু তত ক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।’’
আরও পড়ুন:
অবিভক্ত শিবসেনা থেকে ৪০ জন বিধায়কের দলত্যাগের সেই বিদ্রোহের কথা স্মরণ করে ঠাকরে জানান, বিদ্রোহী নেতাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না করলেও সেই সময় কী ঘটছিল, সে সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অবগত ছিলেন।
উদ্ধব বলেন, ‘‘আমি তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলাম। মানুষ কী সত্যিই ভেবেছিল যে, বাকিরা যা স্পষ্ট দেখতে ও বুঝতে পারছিল, তা আমি জানতাম না? কী ঘটতে চলেছে, তার আঁচ আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি কাউকে একটি কথাও বলিনি, তাঁদের ওপর কোনও চাপ সৃষ্টি করিনি এবং তাঁদের দুর্নীতির বিষয়ে কোনও তদন্তও শুরু করিনি।’’
উদ্ধবের কথায়, ‘‘কেউ যদি চলে যেতে চান, তবে তাঁকে জোর করে আটকে রাখার কী অর্থ? কেউ যদি যেতে চান, তবে তিনি যেতেই পারেন। আমি কেবল তাঁদের মঙ্গলই কামনা করব।’’
রবিবার মুম্বইয়ে আয়োজিত বৈঠকে শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র ন’জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে মাত্র চার জন সশরীরে উপস্থিত হওয়ার পর দলটির সাংসদদের ভাঙানোর সম্ভাব্য প্রচেষ্টা চলছে বলে যে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই ওই মন্তব্য করেছেন উদ্ধব।
আরও পড়ুন:
শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র নেতা সঞ্জয় রাউতের তথ্য অনুযায়ী, সাংসদ অরবিন্দ সবন্ত, অনিল দেশাই, রাজাউ ভাজে এবং সঞ্জয় পাতিল বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। অন্য দিকে ওমপ্রকাশ রাজে নিম্বলকর, ভাউসাহেব ওয়াকচৌরে, নাগেশ বাপুরাও পাতিল অষ্ঠিকার এবং সঞ্জয় দেশমুখ যোগ দিয়েছিলেন ভার্চুয়াল মাধ্যমে। আবার সাংসদ সঞ্জয় যাদব ফোনে উদ্ধবের সঙ্গে কথা বলেন। আগামী দিনে মুম্বইয়ে তিনি উদ্ধবের সঙ্গে দেখা করবেন বলেও আশা করা হচ্ছে।
যদিও দল ভাঙার জল্পনাকে গুরুত্বহীন হিসাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে উদ্ধব-পুত্র আদিত্য ঠাকরে এবং সঞ্জয় রাউত সোমবার জোর দিয়ে জানিয়েছেন, শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) গোষ্ঠীর ন’জন সাংসদই দলের সঙ্গে রয়েছেন।
পুণেয় সাংবাদিকদের আদিত্য বলেন, ‘‘গুজবে কান দেবেন না। বাবা এবং আমি নিশ্চিত করেছি যে, যাঁরা আমাদের সঙ্গে আছেন, তাঁদের উপর আমরা অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করতে পারি।’’ তিনি মন্তব্য করেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় উদ্ধব ঠাকরে এবং এনসিপি (এসপি) প্রধান শরদ পওয়ার ওই সাংসদদের হয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন এবং তাঁদের জয়ী হতে সহায়তা করেছিলেন। ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে বৈঠকে সাংসদদের যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে আদিত্য বলেন, ‘‘অনলাইনে বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই।’’
রাউতও দলের সাংসদদের অবস্থান নিয়ে ওঠা উদ্বেগ দূর করার চেষ্টা করে মন্তব্য করেন, দলের সব সাংসদই শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র পাশে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘শিবসেনা যখন ভেঙে গিয়েছিল, তখন তাঁরাই দল ছেড়েছিলেন যাঁদের আনুগত্য নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। আমরা আমাদের সাংসদদের উপর আস্থা রাখি এবং সেই আস্থা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। সব সাংসদই আমাদের সঙ্গে আছেন।’’ অপারেশন টাইগার সংক্রান্ত জল্পনা নিয়ে প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করে রাউত মন্তব্য করেছেন, ‘‘ওরা (বিজেপি) আমাদের ভাঙতে এলে আমারাও ‘অপারেশন উলফ’ শুরু করে ওদের (বিজেপি) ভেঙে দেব।’’
আদিত্য এবং রাউত দলীয় সাংসদদের দলের সঙ্গে থাকা নিয়ে জোর গলায় কথা বললেও শিবসেনার শিন্ডে শিবিরের দাবি, উদ্ধব শিবিরের উপর অসন্তুষ্ট দলের সাংসদেরা। জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা শিন্ডের শিবসেনার সাংসদ প্রতাপরাও যাদব দাবি করেছেন, শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র বেশ কয়েক জন সাংসদ দলের নেতৃত্বের ওপর অসন্তুষ্ট এবং শিন্ডে নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘‘শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র সব সাংসদই আমার বন্ধু। অতীতে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি।’’
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দলবদলের ঘটনার সঙ্গে তুলনা টেনে যাদব আরও বলেন, ‘‘তৃণমূলের সাংসদেরা যেমন দলের নেতৃত্বের ওপর অসন্তুষ্ট, ঠিক তেমনই উদ্ধব গোষ্ঠীর অনেক সাংসদ দলের নেতৃত্বের ওপর অসন্তুষ্ট।’’ যাদব জোর দিয়ে এ-ও মন্তব্য করেন যে শিন্ডের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীই শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের উত্তরাধিকার বহন করছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমরাই প্রকৃত শিবসেনা এবং বালাসাহেব ঠাকরের আদর্শ মেনে কাজ করছি।’’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-র সাংসদদের শিন্ডে শিবিরে যোগ দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বানও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘উদ্ধব সেনার সব সাংসদকেই আমাদের দলে স্বাগত। কয়েক জন সাংসদ একনাথ শিন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।’’
পশ্চিমবঙ্গে ‘অপারেশন লোটাস’-এর পরে এ বার মহারাষ্ট্রে ‘অপারেশন টাইগার’! বিরোধী শিবির মনে করছে, লোকসভা ও রাজ্যসভায় মোদী সরকার এখন দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন জোগাড় করতে মরিয়া। সেই জন্যই তৃণমূলের পরে এ বার শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-তে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। এর পরে এনসিপি (শরদ পওয়ার)-এও ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হতে পারে। কারণ, গত এপ্রিলে মোদী সরকার মহিলাদের সংরক্ষণের নামে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস বিল পাশ করানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন না থাকায় তা পাশ হয়নি।
কংগ্রেসের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একের পর এক আঞ্চলিক দল ভাঙানোর কর্মসূচি নিয়েছেন। কারণ, শুধু তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের সমর্থন নিয়েও লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ জোগাড় হচ্ছে না। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে হলে লোকসভার ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে হবে। অর্থাৎ অন্তত ৩৬২ জনের ভোটের দরকার। তৃণমূলের ২০ জনের সমর্থন পেলে এনডিএ-র পক্ষে সাংসদ সংখ্যা ২৯৪ থেকে বেড়ে ৩১৪ হবে। এর সঙ্গে যদি কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্বের কারণে ডিএমকে-র ২২ জন সরকারের পক্ষে ভোট দেবেন বলে ধরা যায়, তা হলেও এনডিএ-র পক্ষে ভোট ৩৩৬-এ আটকে যাবে। তাই বিজেপি এ বার উদ্ধব ঠাকরে, শরদ পওয়ারের দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছে।
শিবসেনায় আগেই ভাঙন ধরেছিল। একনাথ শিন্ডেই দল ভেঙে শিবসেনার নাম-প্রতীক নিয়ে নেওয়ায় উদ্ধব ঠাকরেকে ‘শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)’ নাম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। উদ্ধবের দলে আরও ভাঙনের জন্য শিন্দেকেই কাজে লাগানো হচ্ছে বলে বিরোধী শিবিরের দাবি। উল্টো দিকে শিন্ডে শিবিরের দাবি, উদ্ধব ঠাকরের দলের অন্তত সাত জন লোকসভার সাংসদ দলবদল করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। দলত্যাগ-বিরোধী আইনে যাতে তাঁরা না পড়েন, তার জন্য ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি শিবির বদলাতে চেয়েছেন ১৪-১৬ জন বিধায়কও।