দ্বীপরাষ্ট্রে আক্রমণ চালাতে নিজেদের মাটিতেই হামলার ছক কষে আমেরিকা! কী ভাবে ভেস্তে যায় ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা?
‘অপারেশন নর্থউডস’-এর মাধ্যমে আমেরিকা যে ভাবে নিজেদের মাটিতেই হামলার পরিকল্পনা করেছিল, এক কথায় তা ছিল ভয়ঙ্কর। কী কী পরিকল্পনা ছিল মার্কিন বাহিনীর?
১৯৬২ সাল। ঠান্ডা যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। কিউবা এবং সে দেশের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা। কিউবা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং কাস্ত্রোর নীতি দ্বীপরাষ্ট্রটিকে আমেরিকার জন্য একটি কাঁটায় পরিণত করেছিল।
কিন্তু অনেকেই জানেন না, কিউবাকে পরাস্ত করতে সে সময় নিজেদের মাটিতেই হামলা চালানোর ছক কষেছিল আমেরিকা। অনেক চেষ্টা করেও আমেরিকা সে সময় কিউবাকে বাগে আনতে পারছিল না। তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একদল সামরিক কর্তা ফেঁদেছিলেন ‘অপারেশন নর্থউডস’-এর জাল।
আমেরিকা এবং কিউবার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘অপারেশন নর্থউডস’-এর মাধ্যমে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ যে পদক্ষেপ করার পরিকল্পনা করেছিল, তা ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এবং নৈতিক ভাবে নিন্দনীয় একটি গোপন অভিযান।
সেই অভিযানে আমেরিকারই সামরিক এবং অসামরিক এলাকায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন সেনা। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের মাটিতেই হামলা চালানো এবং সেই হামলার দায় কিউবার উপর চাপানো, যাতে কিউবাকে আক্রমণ করার অজুহাত পেয়ে যায় আমেরিকা।
পেন্টাগনের শীর্ষকর্তাদের তৈরি সেই প্রস্তাবিত অভিযানে ধারাবাহিক এবং ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। আমেরিকা সেই অভিযান সংগঠিত করলে সে দেশেরই প্রচুর সাধারণ মানুষের প্রাণ যেত। আর বিশ্ব জুড়ে মুখ পুড়ত কিউবার। সেই সুযোগে আমেরিকাও কিউবা আক্রমণ করার সুযোগ পেয়ে যেত।
আরও পড়ুন:
আমেরিকার মাটিতে ভয়াবহ আক্রমণ চালানোর জন্য পেন্টাগনের ‘জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ’ কর্তৃক তৈরি একটি নীলনকশা ছিল ‘অপারেশন নর্থউডস’। অভিযানের মূল নীতি ছিল সহজ। যদি বিশ্বের নজরে কিউবাকে আমেরিকায় আক্রমণকারী একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসাবে প্রমাণ করা যায়, তা হলে দ্বীপরাষ্ট্রে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালাতে পারবে আমেরিকা। বিশ্বের অন্য কোনও দেশ সেখানে বাধাও দেবে না।
‘অপারেশন নর্থউডস’-এর মাধ্যমে আমেরিকা যে ভাবে নিজেদের মাটিতেই হামলার পরিকল্পনা করেছিল, এক কথায় তা ছিল ভয়ঙ্কর। কী কী পরিকল্পনা ছিল মার্কিন বাহিনীর?
আমেরিকার বাহিনীর লক্ষ্য ছিল, দেশেরই অসামরিক বিমান ছিনতাই করা এবং গোপনে সেগুলি এমন ভাবে রং করা, যাতে দূর থেকে সেগুলি সামরিক বিমানের মতো দেখতে লাগে। এর পর দূর থেকে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার এবং মাঝ-আকাশে ধ্বংস করার পরিকল্পনা ছিল আমেরিকার। এমন ভাবেই হামলা করা হত, যাতে মনে হত যে, হামলা চালিয়েছে কিউবা।
‘অপারেশন নর্থউডস’-এ নিজেদের একটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার পরিকল্পনাও করেছিল আমেরিকা। ওই জাহাজ ডুবিয়ে দোষ চাপানো হত কিউবার বাহিনীর উপর।
আরও পড়ুন:
নিজেদের একাধিক শহরে বোমা হামলার ছকও আমেরিকা কষেছিল। সেই শহরগুলির মধ্যে ছিল রাজধানী ওয়াশিংটনও। হামলা এমন ভাবেই চালানো হত, যাতে সাধারণ মানুষের মনে হয় যে কিউবা আক্রমণ করেছে। এই মিথ্যা হামলার উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার জনগণকে কিউবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে উন্মত্ত করে তোলা।
কিউবার ‘ক্রমবর্ধমান হিংসা’র আখ্যানকে আরও জোরদার করে তোলার জন্য কিউবান অভিবাসীদের হত্যার পরিকল্পনাও করেছিল মার্কিন বাহিনী। সেই হত্যাকাণ্ডের দায়ও কিউবার উপর চাপানোর কথা ভেবেছিল আমেরিকা।
কিউবার শরণার্থীদের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও আমেরিকা করেছিল। লক্ষ্য ছিল, যুদ্ধের প্রতি সমর্থন আরও বাড়িয়ে তোলা এবং কিউবার সাধারণ মানুষের একাংশেরও সমর্থন আদায়।
‘অপারেশন নর্থউডস’-এর প্রস্তাবগুলির প্রতিটিই ছিল ভয়াবহ। সেই প্রস্তাবগুলি বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে সারা বিশ্বের কাছে কিউবার সরকারকে আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছিল মার্কিনবাহিনী। চেয়েছিল, কিউবা আক্রমণের ভিত তৈরি করতেও।
প্রস্তাবিত সেই ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার সঙ্গে গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার পরিকল্পনাও করেছিল আমেরিকা। উদ্দেশ্য ছিল, আমেরিকার তরফে কিউবা আক্রমণ করা হলে কেউ যেন কোনও প্রশ্ন তুলতে না পারে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তর থেকে বোনা হয়েছিল পরিকল্পনার জাল। জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ— যাদের দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারাই আমেরিকার মাটিতে হামলা চালানোর ছক কষেছিল।
জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের যুক্তি ছিল কিউবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ মার্কিন স্বার্থকে শক্তিশালী করবে। এমনকি, সেই যুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নকেও নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকান আধিপত্য পুনরুদ্ধার করবে। আর তার জন্য নিজেদের দেশের মানুষের রক্ত ঝরানোর কথা ভাবতেও দ্বিধা করেনি তারা।
১৯৬২ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব রবার্ট ম্যাকনামারার কাছে একটি গোপন প্রস্তাব হিসাবে জমা দেওয়া হয় ‘অপারেশন নর্থউডস’ অভিযানের পরিকল্পনা। আমেরিকার অনেক সামরিক কর্তাই সে সময় এই অভিযানকে ন্যায্য বলে দাবি করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন, দেশের স্বার্থে কিছু মানুষের প্রাণ গেলেও এই অভিযান চালানো যুক্তিসঙ্গত হবে।
‘অপারেশন নর্থউডস’-এর অনুমোদন দিয়েছিল পেন্টাগন। চেয়ারম্যান লাইম্যান লেমনিটজ়ারের নেতৃত্বে জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিয়ে যান। প্রতিক্রিয়া হিসাবে যাতে অতি সত্বর কিউবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানো যায়, সেই প্রস্তুতিও চলতে থাকে।
তবে মার্কিন সেনার সেই গোপন পরিকল্পনা এবং অভিযানের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান এক জন। তিনি আর কেউ নন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তখন এমনিতেই কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সঙ্কট নিয়ে সামরিক কর্তাদের সঙ্গে মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল কেনেডির।
কেনেডি নিজের সামরিক কর্তাদের একাংশের বিপজ্জনক পরিকল্পনা বুঝতে পেরে ‘অপারেশন নর্থউডস’কে সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি ছিল, এই ধরনের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নৈতিক ও রাজনৈতিক— উভয় দিক থেকেই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কেনেডি এই অভিযানকে সমর্থন না করার ফলে তাঁর এবং সেনাকর্তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদ তৈরি হয়েছিল, যা পরে আরও গভীর হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী কেনেডির প্রত্যাখ্যানকে ‘দুর্বলতার লক্ষণ’ হিসেবে দেখেছিল এবং কেউ কেউ কেনেডির দিকে কিউবার প্রতি ক্রমশ ‘নরম’ হয়ে ওঠার জন্য আঙুলও তুলেছিলেন।
পরবর্তী কালে লেমনিটজ়ারকে জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেন কেনেডি। ‘অপারেশন নর্থউডস’ কখনও পরিচালিত না হলেও, আমেরিকার ভয়ঙ্কর সেই পরিকল্পনার বিবরণী কয়েক দশক ধরে গোপন রাখা হয়েছিল।
১৯৯৭ সালের কেনেডি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত রিভিউ বোর্ড ‘অপারেশন নর্থউডস’-এর বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ করে, যা আমেরিকার সাধারণ মানুষ-সহ সারা বিশ্বকে হতবাক করেছিল। ২০০১ সালে জেমস ব্যামফোর্ডের ‘বডি অফ সিক্রেটস’ প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি জনসাধারণের কাছে আরও স্পষ্ট হয়।
‘অপারেশন নর্থউডস’-এর পরিকল্পনা আমেরিকার সামরিক ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত হয়। সেই অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকালে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, জাতীয় নিরাপত্তার নামে সরকার কত দূর যেতে পারে? নিজেদের দেশের মানুষের প্রাণও বিপন্ন করতে পারে কি?