All need to know about Sharib Hashmi and his struggle for acting and family dgtl
Sharib Hashmi
একের পর এক ব্যর্থ অডিশন, বেচতে হয় বাড়ি, সাফল্য পাওয়ার পরেই ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রী! জেকে-ই বাস্তবের ‘ফ্যামিলি ম্যান’
১৯৭৬ সালে মুম্বইয়ের মালাডে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম শারিবের। বাবা ছিলেন বিনোদন দুনিয়ার সাংবাদিক। সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকে অনেক অভিনেতাকে বাড়িতে আসতে দেখেছেন তিনি। তাঁদের দেখেই মূলত অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৯
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২০
বস্তিবাসী, লন্ডনে কাজ করা পরিযায়ী শ্রমিক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী গায়ক, সিবিআই অফিসার কিংবা গুপ্তচর— সমস্ত চরিত্রই পর্দায় সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেতা শারিব হাসমি। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এর জেকে।
০২২০
‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ ওয়েব সিরিজ়ই শারিবকে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এর দৌলতে এখন ভারতের বহু সিনেপ্রেমী মানুষ তাঁকে চেনেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, একসময় কাজ না পেয়ে দেনায় জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন শারিব। ছোট থেকে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখা শারিবকে উচ্চতার জন্যও কেরিয়ারের প্রথম দিকে অনেক হোঁচট খেতে হয়েছিল।
০৩২০
ব্যক্তিগত জীবনেও অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে শারিবকে। তবে কখনও থেমে যাননি। ঢাল হয়ে রক্ষা করেছেন স্ত্রী-পরিবারকে। সিরিজ়ের ‘ফ্যামিলি ম্যান’ মনোজ বাজপেয়ী হলেও বাস্তবের ‘ফ্যামিলি ম্যান’ কিন্তু শারিবই।
০৪২০
১৯৭৬ সালে মুম্বইয়ের মালাডে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম শারিবের। বাবা ছিলেন বিনোদন দুনিয়ার সাংবাদিক। সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকে অনেক অভিনেতাকে বাড়িতে আসতে দেখেছেন তিনি। তাঁদের দেখেই মূলত অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর। তার উপর সাংবাদিক বাবাও চাইতেন ছেলে বড় অভিনেতা হন।
০৫২০
কিন্তু বাস্তব ছিল কঠিন। স্বপ্নের সিঁড়ির সন্ধান পাওয়াই হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে দুষ্কর। স্নাতক হওয়ার পর আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের মতো শারিবও চাকরির খোঁজ শুরু করেন। ছোটখাটো নানা কাজে যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি অভিনয়ে সুযোগ পাওয়ার চেষ্টাও করে যাচ্ছিলেন। ২০০৩ সালে অভিনয়ে আসার আগেই তাঁর বিয়ে হয়।
০৬২০
সময় যত এগোয় অভিনয়দক্ষতা নিয়ে নিজের প্রতি তাঁর বিশ্বাস কমতে শুরু করে। তার উপর ছোট থেকে উচ্চতা নিয়েও তিনি যথেষ্ট হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। সব মিলিয়ে নিজের স্বপ্ন, বাবার স্বপ্ন প্রায় ভুলতে বসেছিলেন।
০৭২০
২০০৩ সাল থেকে ২০০৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত এমটিভি-র একটি শো-এর জন্য চিত্রনাট্য লিখতেন তিনি। ২০০৭ সালের শেষের দিকে মূলত এক বন্ধুর সহযোগিতায় ‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’-এ অডিশন দিতে যান তিনি। তবে তখনও অভিনয়কে নিজের পেশা হিসাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা নতুন করে ভাবতে শুরু করেননি। ‘স্নামডগ মিলিয়নেয়ার’-এ একটি ছোট চরিত্র ছিল তাঁর। সেই ছবিই পরে অস্কার পায়। যদিও ‘স্নামডগ মিলিয়নেয়ার’ তাঁকে আলাদা কোনও পরিচিতি দেয়নি।
০৮২০
স্লামডগে অভিনয়ের পরেও হাতে খুব বেশি টাকা ছিল না শারিবের। টুকটাক যা অভিনয় করছিলেন তাতে নিজেকে তারকা বলে মনে হয়নি কোনও দিনই। ছোটবেলায় নিজেকে সুপারস্টার হিসাবে স্বপ্নে দেখতেন ঠিকই, কিন্তু বড় হয়ে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে নিজের অজান্তেই একটি সীমারেখা টেনে ফেলেছিলেন। কোথাও না কোথাও নিজের বাহ্যিক রূপটাকেই তারকা হওয়ার অন্তরায় ভেবে বসেছিলেন। কিন্তু জীবন তাঁর জন্য অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল।
০৯২০
‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’-এর পর চাকরি নিয়ে দুবাই চলে যান শারিব। কিন্তু সে কাজেও মন বসাতে পারছিলেন না। দুবাই যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই দেশে ফিরে আসেন তিনি। দুবাই থেকে যখন দেশে ফেরেন শারিব, তাঁর বয়স তখন ৩২ বছর। কিন্তু অভিনয় শুরুর কোনও বয়স নেই— সেই চিন্তাকে পাথেয় করেই সঙ্কল্প নেন, অভিনেতা তিনি হবেনই।
১০২০
নতুন করে অভিনয়ে সুযোগ পাওয়ার জন্য খোঁজখবর নেওয়া, অডিশন দেওয়া— সবই শুরু করেন শারিব। সে সময় ‘ধোবি ঘাট’ ছবির অডিশন চলছিল। অডিশনে ডাক পান। ছবিতে প্রতীক বব্বরের ভাইয়ের ভূমিকায় সুযোগও পেয়ে যান। তবে শেষমেশ পর্দায় দেখা যায়নি তাঁকে। কারণ অডিশনে বাছাইয়ের পরও তাঁকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। নির্মাতাদের যুক্তি ছিল, শারিবের ব্যক্তিত্ব ওই চরিত্রের সঙ্গে মানানসই ছিল না।
১১২০
এই ঘটনায় নাকি অত্যন্ত অপমানিত হয়েছিলেন শারিব। নিজেকে অভিনেতা করে তুলে যোগ্য জবাব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাস্তা সুগম ছিল না। এর পর তিন বছর প্রচুর অডিশন দেন তিনি।
১২২০
সে সময় অন্তত ১০০টি ছবির জন্য অডিশন দিয়েছিলেন শারিব। কিন্তু প্রতি বারেই তাঁকে নাকচ করে দেওয়া হয়। এ ভাবেই কেটে যায় পরের তিন বছর। তখন কিছু বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতে টুকটাক অভিনয় করছিলেন। তিন বছর পর তাঁর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। তত দিনে দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
১৩২০
তবে কঠিন সেই সময়ে স্ত্রী নাসরিন হাশমিকে সব সময় পাশে পেয়েছেন শারিব। এই অবস্থাতেও কখনও স্বামীকে উপার্জনের জন্য চাপ দেননি তিনি। কিন্তু মানসিক চাপ কি আর চেপে রাখা যায়! যত দিন যাচ্ছিল শারিব ততই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছিলেন। নামমাত্র উপার্জনে সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্য।
১৪২০
শেষমেশ নিরুপায় হয়ে একটি টিভি চ্যানেলের কাজে যোগ দিয়েছিলেন শারিব। এর তিন মাস পরেই স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি দেখতে পান শারিব। যশ রাজ ফিল্মের কাস্টিং পরিচালকের ফোন পান তিনি। শারিবের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি দেখে পছন্দ হয়েছিল ওই পরিচালকের। ‘জব তক হ্যায় জান’ ছবির অডিশনে তাই ডেকে পাঠান শারিবকে।
১৫২০
সেখানেও প্রথমে হোঁচট খেতে হয়েছিল তাঁকে। যে চরিত্রের জন্য প্রথমে তাঁর অডিশন নেওয়া হয়েছিল সেই চরিত্রের জন্য বেছে নেওয়া হয় অন্য এক জনকে। পরে ওই ফিল্মেরই অন্য এক চরিত্রের জন্য ফের অডিশনে ডাক পান এবং এক ঘণ্টার মধ্যে শুটিংও শুরু হয়ে যায়।
১৬২০
সব কিছুই যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল শারিবের। যশ রাজ ফিল্মসের সঙ্গে শুটিং শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে ‘ফিল্মিস্তান’ ছবির জন্যও প্রস্তাব আসে তাঁর কাছে। এর পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ২০১২-র ‘জব তক হ্যায় জান’-এর পর ‘ফিল্মিস্তান’, ‘বদমাশিয়াঁ’, ‘ভদকা ডায়েরিস’, ‘ফুল্লু’, ‘বাত্তি গুল মিটার চালু’, ‘বিক্রম ভেদা’, ‘ফাইটার’-এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
১৭২০
চাকরি ছেড়ে অভিনেতা হওয়ার সংগ্রাম করা থেকে সফল হওয়া পর্যন্ত— জীবনের প্রতিটি ধাপে শারিবের পাশেই ছিলেন স্ত্রী নাসরিন। অবশেষে যখন ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এর সাফল্য আসে, তখন মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন নাসরিন। তখন থেকে এক অন্য লড়াই শুরু হয় শারিবের।
১৮২০
নাসরিনকে সারিয়ে বাড়ি ফেরানোর কিছু দিন পর আবার ক্যানসার আক্রান্ত হন তিনি। আবার লড়াই শুরু হয় শারিবের। সেই সময় কেমন কেটেছিল অভিনেতার, তা পরে জানিয়েছিলেন খোদ নাসরিনই। এ-ও জানিয়েছিলে,ন কী ভাবে আর্থিক কষ্ট তাঁদের এক বার বাড়ি বিক্রি করতেও বাধ্য করেছিল এবং কী ভাবে তিনি পর পর পাঁচ বার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পরেও শারিব ঢালের মতো তাঁর পাশে ছিলেন।
১৯২০
এক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নাসরিন বলেছিলেন, “ওর একের পর এক ব্যর্থ অডিশন এবং আমার ক্যানসারের সঙ্গে পাঁচ বার লড়াইয়ের মধ্যেও আমরা একে অপরকে কখনও ছাড়িনি। ২২ বছর আগে আমি আমার কলেজের প্রেমিককে বিয়ে করি। সে তার অভিনয়ের স্বপ্নপূরণের জন্য ভাল বেতনের চাকরি ছেড়ে দেয়। আমাদের আর্থিক সংগ্রাম আরও বেড়ে যায়। এমনকি আমাদের বাড়িও বিক্রি করতে হয়েছিল। তবুও আমরা কখনও একে অপরকে ছাড়িনি। ধীরে ধীরে শারিবের কেরিয়ারে বদল আসে। ও সাফল্য পায়। তারকা হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সপ্তাহেই আমার ক্যানসার ধরা পড়ে।”
২০২০
নাসরিন আরও বলেন, ‘‘যখন শারিব অভিনয় দিয়ে সারা পৃথিবীকে হাসাতে শুরু করে, বাস্তবে তখন সে হাসপাতালের বারান্দায় কাঁদছিল। এক মিনিটের জন্যও আমার বিছানা ছেড়ে উঠত না। তার পর থেকে পাঁচ বার ক্যানসার ফিরেছে আমার জীবনে। কিন্তু যত বার আমি চোখ খুলেছি, শারিব পাশেই ছিল। ২২ বছর পরেও ও আমার জীবনের খুঁটি। আমাদের যাত্রা প্রমাণ করে যে, সত্যিকারের ভালবাসা কখনও হাল ছাড়ে না।’’