ভারতের মহার্ঘতম বিচ্ছেদ মামলা! স্ত্রীকে দিতে হতে পারে ১৫০০০ কোটি, খোরপোশের প্যাঁচে ভারতীয় শিল্পপতি
২০২৪ সালে শ্রীধরের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮৫ কোটি ডলার। কিন্তু খবর, বিচ্ছেদের মামলায় মোট সম্পত্তির মধ্যে ১৭০ কোটি ডলার জমা দিতে বলা হয়েছে জ়োহোর মালিককে।
মনোমালিন্য হলে বা বনিবনা না হলে একসঙ্গে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন অনেক দম্পতিই। অনেক ক্ষেত্রে দিতে হয় মোটা খোরপোশও। কোনও দম্পতির ক্ষেত্রে খোরপোশের পরিমাণ এতটাই বেশি থাকে, যা চমকে দেয় সারা বিশ্বকে।
বিশ্বের মহার্ঘ বিবাহবিচ্ছেদের তালিকা লম্বা। সেই তালিকায় এ বার যুক্ত হল এক ভারতীয়ের নাম। কথা হচ্ছে ভারতের অন্যতম প্রযুক্তি সংস্থা জ়োহোর প্রতিষ্ঠাতা তথা শিল্পপতি শ্রীধর ভেম্বুর বিবাহবিচ্ছেদের। বিশ্বের অন্যতম মহার্ঘ বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় পরিণত হয়েছে শ্রীধরের বিচ্ছেদ। মনোযোগ আকর্ষণ করছে সারা বিশ্বের।
জ়োহোর প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইওকে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় ১৭০ কোটি ডলারের বন্ড (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আদালতের তরফে।
মামলাটি গত বছরের হলেও খোরপোশের অঙ্ক এত দিন জনসাধারণের অজানা ছিল। সম্প্রতি তা প্রকাশ্যে এসেছে। আর তার পরেই বিষয়টি সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
বন্ডের অঙ্ক প্রকাশ্যে আসার পর এ-ও স্পষ্ট হয়েছে, শ্রীধরের বিচ্ছেদ ভারতের মহার্ঘতম বিবাহবিচ্ছেদের মামলা। সারা বিশ্বের নিরিখে চতুর্থ ব্যয়বহুল বিবাহবিচ্ছেদের মামলা এটি।
আরও পড়ুন:
জ়োহো হল একটি দেশীয় সফ্টঅয়্যার সংস্থা, যার প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর। মাদ্রাজ আইআইটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে তিনি চলে যান আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে পিএইচডি করে দেশে ফেরেন তিনি।
১৯৯৬ সালে তৈরি করেন অ্যাডভেন্টনেট নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সেটি থেকেই পরবর্তী সময়ে তৈরি হয় জ়োহো কর্পোরেশন। ২০০৮ সালে জ়োহো মেল বাজারে আনে ওই সংস্থা।
গুগ্লের জিমেল, মাইক্রোসফ্টের আউটলুক বা ইয়াহুর ইয়াহুমেলের মতো এটিও একটি ইমেল প্ল্যাটফর্ম। কাজও প্রায় একই রকমের। তবে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি সে ভাবে প্রচারের আলোয় ছিল না।
সম্প্রতি বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েনের মাঝে স্বদেশি পণ্য ব্যবহারের উপর বেশি জোর দিচ্ছে ভারত। কেন্দ্রের এই স্বদেশিয়ানার প্রচারের আলোয় ভেসে ওঠে জ়োহো মেলও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ়োহো মেলেও বিভিন্ন পরিবর্তন এবং নতুন সংস্করণ (আপডেট) এসেছে।
আরও পড়ুন:
বর্তমানে ক্যালেন্ডার, নোট্স, যোগাযোগের তালিকা (কনট্যাক্ট্স)-সহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে জ়োহো মেলে। সংস্থার দাবি, তাদের অ্যাপে ব্যবহারকারীদের তথ্যও নিরাপদ থাকে।
জ়োহো মেল ছাড়াও এই সংস্থার ৪০টিরও বেশি অ্যাপ রয়েছে। জ়োহো রাইটার, জোহো শিট্স, জ়োহো বুক্স-সহ এমন প্রচুর অ্যাপ রয়েছে এই সংস্থার যা অফিসে নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার হয়। হোয়াট্সঅ্যাপের মতো একটি অ্যাপ রয়েছে তাদের— নাম আরাত্তাই। মোদী সরকারের স্বদেশিয়ানার প্রচারের হাওয়ায় সম্প্রতি ভারতীয় বাজারে তা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সফ্টঅয়্যারের ব্যবহার বৃদ্ধির পর শ্রীধরের সম্পত্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফোর্বস পত্রিকার মতে, ২০২৪ সালে শ্রীধরের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮৫ কোটি ডলার, যা তাঁকে ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় ৩৯তম স্থান দিয়েছিল। কিন্তু খবর, বিচ্ছেদের মামলায় এখন মোট সম্পত্তির মধ্যে ১৭০ কোটি ডলার জমা দিতে বলা হয়েছে জ়োহোর মালিককে।
শ্রীধরের বিয়ের পরিণতি তিক্ত হলেও তার সূত্রপাত হয়েছিল নিখাদ এবং মিষ্টি প্রেমের গল্প দিয়ে। ১৯৮৯ সালে প্রিন্সটন থেকে পিএইচডি করার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন শ্রীধর। আমেরিকারই পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন মেধাবী ছাত্রী হিসাবে পরিচিত প্রমীলা শ্রীনিবাসন।
প্রমীলার জন্ম এবং বড় হওয়া আমেরিকাতেই। সেখানেই একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় শ্রীধর এবং প্রমীলার। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে। ১৯৯৩ সালে বিয়ে করেন যুগল। ক্যালিফোর্নিয়ায় সংসার শুরু করেন। এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন প্রমীলা।
১৯৯৬ সালে দুই ভাই এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু টনি টমাসের সঙ্গে প্রযুক্তি সংস্থা অ্যাডভেন্টনেট (পরে সেটিই জ়োহো হয়) চালু করেন শ্রীধর। অন্য দিকে, প্রমীলা কাজ করতেন মেডিকেলমাইন নামে স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি সংক্রান্ত একটি সংস্থায়।
এর মধ্যেই শ্রীধর এবং প্রমীলার পুত্রের অটিজ়ম ধরা পড়ে। ভেঙে পড়েন ভেম্বু দম্পতি। অটিজ়ম গবেষণার জন্য ‘দ্য ব্রেন ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন প্রমীলা। ২০১৯ সালে পরিবারকে রেখে আমেরিকা ছেড়ে তামিলনাড়ুতে তাঁর জন্মস্থানে ফিরে আসেন শ্রীধর।
দু’জনেই নিজেদের কাজ নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ায় ২০২০ সালের শেষ দিকে তাঁদের দাম্পত্যে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রমীলাকে হোয়াট্সঅ্যাপে মেসেজ করে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়েছিলেন শ্রীধর। ২০২১ সালের অগস্টে বিচ্ছেদ সংক্রান্ত কাগজপত্রও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এর পর আমেরিকার আদালতে বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেন শ্রীধর এবং প্রমীলা। তত দিনে তাঁদের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। সম্পর্কে তিক্ততাও এসেছে।
আদালতে প্রমীলা অভিযোগ করেন, তাঁকে এবং তাঁদের অটিস্টিক পুত্রকে আমেরিকায় ফেলে ভারতে চলে আসেন শ্রীধর। তাঁর সম্মতি ছাড়াই গোপনে জ়োহোর শেয়ার ভাইবোনদের নামে করে দেন, যা ক্যালিফোর্নিয়ার সম্প্রদায় সম্পত্তি আইন লঙ্ঘন করে।
যদিও প্রমীলার আনা সমস্ত অভিযোগ আদালতে অস্বীকার করেন শ্রীধর। ২০২৩ সালে তা নিয়ে এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘আমাকে নিয়ে যা বলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ কল্পকাহিনি। আমার স্ত্রী এবং সন্তান আমার চেয়েও সমৃদ্ধ জীবন উপভোগ করে।’’
আদালতে শ্রীধরের দাবি ছিল, ভারতে আসার পরেও স্ত্রী এবং সন্তানকে সম্পূর্ণ আর্থিক সহায়তা তিনি দিয়েছেন। আমেরিকার বাড়িও স্ত্রী এবং সন্তানকে দিয়ে দিয়েছেন তিনি। এমনকি তাঁর সংস্থা জ়োহো বিপদে-আপদে সব সময় প্রমীলার সংস্থার পাশে দাঁড়ায়। শ্রীধরের আইনজীবী ক্রিস্টোফার সি মেলচার অভিযোগগুলিকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ বলে দাবি করেন আদালতে।
এর পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রমীলার একপক্ষীয় আবেদনের ফলে ১৭০ কোটি ডলারের বন্ড অর্ডার শুরু হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবার আদালতের দ্বারস্থ হন শ্রীধর। মামলাটি চলছে। জ়োহোর মালিকানাও তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের মূল বিরোধ হিসাবে রয়ে গিয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মহার্ঘতম বিচ্ছেদের মামলা ছিল পৃথিবীর অন্যতম ধনকুবের তথা তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা মাইক্রোসফ্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের। বিচ্ছেদের পর তাঁর কাছ থকে আনুমানিক ৭৩০০ কোটি ডলার পেয়েছিলেন প্রাক্তন স্ত্রী মেলিন্ডা। খোরপোশ হিসাবে এই পরিমাণ টাকা দেওয়ার নজির নেই পৃথিবীর ইতিহাসে। তালিকায় এর পরেই রয়েছে অ্যামাজ়নের মালিক জেফ বেজোসের বিচ্ছেদ মামলা। বিচ্ছেদের পর আনুমানিক প্রায় ৪০০০ কোটি ডলার প্রাক্তন সঙ্গী ম্যাকেঞ্জিকে দিয়েছিলেন জেফ।