Armero Tragedy: কংক্রিটে কোমর পর্যন্ত আটকে, সাক্ষাৎকার দিতে দিতে সবার সামনেই মারা যায় ছোট্ট ওমায়রা
ওমায়রা ১৯৭২ সালের ২৮ অগস্ট জন্মগ্রহণ করে। তার বাবা আলভারো এনরিক এবং মা মারিয়া আলেদা। স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াশোনা করত ওমায়রা।
১৯৮৫ সালের ‘ আরমেরো ট্র্যাজেডি’ বিশ্ববাসীর মনে বিশেষ দাগ কেটেছিল। প্রকৃতির কোপে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় কলম্বিয়ার নেভাদো দেল রুইজ আগ্নেয়গিরির নিকটবর্তী একাধিক গ্রাম। তবে এর থেকেও মর্মান্তিক ছিল এই ঘটনায় ১৩ বছর বয়সি ওমায়রা সানচেজ গারজন নামে এক স্থানীয় কিশোরীর মৃত্যু। এই মৃত্যুতে নিজেদের সামলে রাখতে পারেননি প্রত্যক্ষদর্শীরা। এমনকি এই ঘটনা যাঁরা পড়েছেন বা শুনেছেন, চোখ ভিজে গিয়েছে তাঁদেরও।
৬৯ বছর শান্ত থাকার পরে ১৯৮৫ সালের ১৩ নভেম্বর কলম্বিয়ার নেভাদো দেল রুইজ আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হয়। দুর্যোগের দু’মাস আগে সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও, সে দেশের সরকার আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি বাসরত জনগণকে সরিয়ে নিতে এবং সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আশপাশের ১৩টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আরমেরো শহর। এই শহরের সেই সময় মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ হাজার। তার মধ্যে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ অগ্ন্যুৎপাতের কারণে মারা যান।
১৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় রাত ৯টা নাগাদ আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। পুরো এলাকা ঢেকে যায় আগ্নেয়গিরির গরম ছাই এবং লাভার পরতে। তবে শুধু মাত্র লাভার কারণে যে এত প্রাণ গিয়েছিল, তা নয়।
যখন নেভাদো দেল রুইজ আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে গরম লাভা বেরোনো শুরু হয়, তখন নিকটবর্তী হিমবাহ গলে জল সমতলের দিকে গড়িয়ে আসে। এই জল নদীর তীরের পাথর এবং মাটির সঙ্গে মিশে সমতল এলাকায় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। আগ্নেয়গিরির গরম লাভার সঙ্গে তুষারগলা জল এবং কাদার মিশ্রণ পরিচিত ‘লাহার’ নামে।
আরও পড়ুন:
রাস্তায় থাকা সব গাছ ও গাড়ি তুলে নিয়ে ঘণ্টায় ১৩ মাইল বেগে সমতলে আছড়ে পড়ে লাহার। লাহারের স্রোত প্রবেশ করে টলিমার আরমেরো শহরেও। আরমেরোর প্রায় ৭০ শতাংশ বাসিন্দা লাহারের কবলে পড়ে মারা যান। এই ঘটনাই ‘আরমেরো ট্র্যাজেডি’ হিসাবে পরিচিত।
কলম্বিয়ান মেয়ে ওমায়রা ১৯৭২ সালের ২৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করে। তার বাবা আলভারো এনরিক এবং মা মারিয়া আলেদা। স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াশোনা করত ওমায়রা। স্কুলে এক জন মেধাবী ছাত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিল ওমায়রা।
যে রাতে লাহার আরমেরোতে আঘাত হানে, সেই রাতে ওমায়রা তার বাবা, ভাই এবং পিসির সঙ্গে বাড়িতেই ছিল। মা ব্যবসার কারণে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাতে ছিলেন।
লাহারের স্রোত যখন তাদের বাড়িতে আঘাত হানে, তখন বাড়ির বাকি সদস্যদের সঙ্গে ওমায়রাও ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়ে।
আরও পড়ুন:
ঘটনার কয়েক ঘন্টা পরে উদ্ধারকারী এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওমায়রাদের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যা দেখে, তা দেখে তারাও মর্মাহত হয়ে পড়ে।
উদ্ধারকারীরা দেখেন, ওমায়রা কোনও রকমে তার হাত জলকাদার উপরে তুলে রয়েছে। উদ্ধারকারীদের দেখেই হাত তুলে সে জানান দেয় যে, সে তখনও জীবিত রয়েছে।
উদ্ধারকারীরা ওমায়রাকে সাহায্যের জন্য ছুটে এলেও খুব শীঘ্রই বুঝতে পারেন, তাকে উদ্ধার করা অত সহজ নয়।
উদ্ধারকারীরা বুঝতে পারেন, ওমায়রার কোমর থেকে নীচের অংশ জলের তলায় থাকা কংক্রিটের নীচে চাপা পড়েছে। স্বেচ্ছাসেবকরা অনেক চেষ্টার পর ওমায়রার শরীরের উপরের অংশকে যতটা সম্ভব কংক্রিটের বাঁধন থেকে মুক্ত করেন।
কংক্রিট থেকে ছোট্ট ওমায়রাকে মুক্ত করার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উদ্ধারকারীদের কাছে ছিল না। ওমায়রার শরীর জলের মধ্যে ভাসিয়ে রাখতে উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরা তার শরীরের চারপাশে কাঠের মঞ্চ তৈরি করেন। তার শরীরে একটি টায়ারও লাগানো হয়।
ডুবুরিরাও জলের তলায় গিয়ে ওমায়রার শরীর ধ্বংসস্তূপ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা দেখেন, ওমায়রার পা বেঁকে গিয়েছে এবং তার পা দু’টি ইটের দেয়ালের নীচে আটকা পড়েছে। তার পা না কেটে তাকে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত করা সম্ভব নয় বলেও বুঝতে পারেন উদ্ধারকারীরা।
ওমায়রাকে উদ্ধার করার পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন সে জার্মান সাংবাদিক সান্তা মারিয়া ব্যারাগানের সঙ্গে কথা বলে। মারিয়ার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি সে গান গেয়ে, লজেন্স খেয়ে এবং সোডা পান করে নিজেকে উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা করে।
তবে আটকা পড়ার দ্বিতীয় দিনে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে শুরু করে ওমায়রা। তৃতীয় দিনে ভুল বকতেও শুরু করে সে। বারংবার বলতে থাকে একটাই কথা— ‘‘আমি স্কুলে দেরি করে পৌঁছাতে চাই না।’’ এমনকি স্কুলে আসন্ন গণিত পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করে সে।
জল এবং ধ্বংসস্তূপের চাপে ওমায়রার চোখ প্রথমে লাল এবং ধীরে ধীরে কালো হতে থাকে। চিকিৎসকেরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে থাকেন।
ওমায়রার অঙ্গচ্ছেদ করে নিরাপদ ভাবে তাকে মুক্ত করার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সেই মুহূর্তে চিকিৎসকদের কাছেও ছিল না। সময় আরও গড়ালে যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করে ওমায়রা। অনেক চেষ্টার পরও যখন উদ্ধারকারী এবং চিকিৎসকেরা তাকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন, তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, ওমায়রাকে শান্ত রাখা এবং তাকে মরতে দেওয়াই হবে সব থেকে মানবিক কাজ।
উদ্ধারকারীরা মনে করেন, ওমায়রাকে উদ্ধারের জন্য আরও টানাহ্যাঁচড়া করলে তার কষ্ট বাড়বে বই কমবে না। তাই ওমায়রাকে আশ্বস্ত করতে শুরু করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনগণ।
৬০ ঘণ্টা জলের তলায় আটকে থাকার পর গ্যাংগ্রিন এবং হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ওমায়রা।
ওমায়রা মারা যাবার কয়েক ঘণ্টা আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফোটোগ্রাফার ফ্রাঙ্ক ফোর্নিয়ার। ওমায়রার বেশ কিছু ছবিও তোলেন তিনি। ছবিগুলি প্রকাশ্যে আসার পর এই ছবিগুলি পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন ফেলে।
ফ্রাঙ্কের তোলা ওমায়রার কিছু ছবি ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফোটো অব দ্য ইয়ার’-এর তালিকায় নাম তোলে। এই ছবিগুলির মাধ্যমে কলম্বিয়ার সরকারের ব্যর্থতার কথা সারা বিশ্বের কাছে উঠে আসে। দিকে দিকে কলম্বিয়া সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভও বাড়তে থাকে।