অবরুদ্ধ হরমুজ়কে ছাড়াতে আরও যুদ্ধজাহাজ! আন্তর্জাতিক আইনের চাপে পিছু হটবে ইরান? তেল-গ্যাসে লাভের হিসাব কষছে ভারত
হরমুজ় প্রণালী দু’টি উন্মুক্ত সমুদ্র অঞ্চলের মধ্যে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের পথ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ইরান ও দেশটির মদতপুষ্ট সশস্ত্রবাহিনী কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে হরমুজ় বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল-সহ একাধিক দেশ। যুদ্ধকালীন সময়ে ইরান কি প্রণালীটি বন্ধ রাখতে পারে? কী বলছে সমুদ্র আইন?
বিশ্ব জুড়ে তেল সরবরাহ অবিচ্ছিন্ন রাখতে ইরানি ‘নাগপাশ’ থেকে মুক্ত করতে হবে হরমুজ়কে। হরমুজ় প্রণালী নিরাপদ এবং মুক্ত করতে পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে পাহারা দিয়ে পার করানোর দাবি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওমান এবং ইরানের মধ্যে সরু সমুদ্র প্রণালী ‘হরমুজ’ দিয়ে যাতায়াত করে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেলের ট্যাঙ্কার।
সৌদি আরব, ইরান, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো তৈল উৎপাদনকারী দেশগুলিকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে হরমুজের সঙ্কীর্ণ সমুদ্রপথই। হরমুজ় প্রণালী কোথাও কোথাও প্রায় ৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত চওড়া। যদিও হরমুজের উপর ইরান ও ওমানের যৌথ মালিকানা রয়েছে।
তবে হরমুজের উপর ইরানই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। এই প্রণালীটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সরু হওয়ার ফলে উত্তেজনার পরিস্থিতিতে ইরান সহজেই এই জলপথের উপর প্রভাব খাটাতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ইরান ও দেশটির মদতপুষ্ট সশস্ত্রবাহিনী কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে হরমুজ় বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল-সহ একাধিক দেশ।
হরমুজ় প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা বা জলপথে মাইন পুঁতে রাখার মতো সমরকৌশলে পণ্যবাহী জাহাজগুলির ক্ষতি করার চেষ্টা করছে তেহরান। তেলবাহী জাহাজে হামলার ফলে জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
এই অবস্থায় হরমুজ় প্রণালীতে আটকে থাকা পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে নিরাপদে যাতায়াত করার জন্য ও হরমুজ় প্রণালী সচল করতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে আবেদন-নিবেদন করতে শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট অফ ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা। ট্রাম্প লিখেছেন, যে সব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এই প্রণালীটি মুক্ত এবং নিরাপদ রাখার জন্য আমেরিকার সঙ্গে যৌথ ভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে তারা।
আরও পড়ুন:
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ-হেন দাবি প্রকাশ্যে আসার পরই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কি আইনসম্মত ভাবে প্রণালীটির মধ্য দিয়ে সামরিক কনভয় পাঠাতে পারে? এই ভাবে গোটা বিশ্বের অসুবিধা সৃষ্টি করে একটি জলপথ কি অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে একটি দেশ? কী বলা রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনে?
হরমুজ় প্রণালী দু’টি উন্মুক্ত সমুদ্র অঞ্চলের মধ্যে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের পথ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সেই হিসাবে, আন্তর্জাতিক আইনে সঙ্কীর্ণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই পথটিকে আন্তর্জাতিক প্রণালী হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যদিও এই ধরনের জলপথের উপর সংলগ্ন রাষ্ট্রগুলির (হরমুজ়ের ক্ষেত্রে ওমান ও ইরান) অধিকার বর্তায়। তা সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের জাহাজ বা নৌবহরের এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করার অধিকার রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যত ক্ষণ পর্যন্ত বিদেশি জাহাজ নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ও দ্রুত গতিতে প্রণালীটি অতিক্রম করবে, তত ক্ষণ পর্যন্ত উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলির তাদের চলাচলে বাধা দেওয়ার জন্য কোনও পদক্ষেপ করা উচিত নয়। যুদ্ধ শুরু হলে সেই নিয়ম পাল্টে যায় স্বাভাবিক নিয়মেই।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা সশস্ত্র সংঘাতের আইন হল আন্তর্জাতিক আইনের একটি শাখা। যুদ্ধকালীন ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে মানবিক কারণে তৈরি এই নিয়মাবলি। এটি সাধারণ নাগরিক অথবা অসামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং সামরিক লক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্য করার নিয়ম মেনে চলতে নির্দেশ দেয় যুযুধান পক্ষদের। আর সশস্ত্র সংঘাত আইনেরই আরও একটি অংশ নৌযুদ্ধ আইন।
আরও পড়ুন:
সমুদ্রে সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইনের একটি প্রামাণ্য নিয়ম হল সান রেমো ম্যানুয়াল। ১৯৮৮-১৯৯৪ সালের মধ্যে আইন ও নৌ-বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে গঠিত হয়েছে এই আইন। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন এবং ১৯৭৭ সালের প্রোটোকলের সঙ্গে প্রচলিত নৌ-আইনকে একত্রিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, পদ্ধতি এবং নিরপেক্ষ জাহাজ সংক্রান্ত নিয়মাবলি ঠিক করা হয়েছে।
নৌ-যুদ্ধ আইন অনুসারে, সমুদ্রপথে সংঘাতের সময় রাষ্ট্রগুলির অবস্থান সাধারণত দু’ধরনের হয়। এক যারা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছে, দুই যারা নিরপেক্ষ। যদিও যুদ্ধরত পক্ষ ও নিরপেক্ষের মধ্যে সীমারেখা টানা সব সময় সহজ নয় বলে মত অধিকাংশ সমরকুশলীর।
সান রেমো ম্যানুয়ালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ, তাদের যুদ্ধজাহাজ-সহ, কোনও যুদ্ধরত পক্ষের প্রণালীর মধ্য দিয়ে সাধারণ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের নৌচলাচলের অধিকার রয়েছে। নিরপেক্ষ দেশের জলসীমায় কোনও যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান চালানো যাবে না। নিরপেক্ষ দেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করতে পারবে। যদি না তারা কোনও নিষিদ্ধ সামরিক পণ্য বহন করে।
যুদ্ধজাহাজগুলি খুব সীমিত সময়ের (সাধারণত ২৪ ঘণ্টা) মেরামত বা জ্বালানির জন্য নিরপেক্ষ দেশের বন্দরে ভিড়তে পারে। তবে সেখানে তারা কোনও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে পারবে না। সমুদ্র আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ চললেও নিরপেক্ষ দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না জলপথের উপর কর্তৃত্ব রয়েছে এমন রাষ্ট্রটি।
আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে কোনও যুদ্ধরত পক্ষ লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে না নিরপেক্ষ জাহাজকে। এগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা হয় না এবং এগুলোর ওপর আক্রমণ চালানো যাবে না। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে নিরপেক্ষ যুদ্ধজাহাজগুলিকে তাদের যাত্রার বিষয়ে আগে থেকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
সান রেমো ম্যানুয়াল অনুসারে, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজের জন্য প্রণালীগুলি পণ্যবাহী এবং যুদ্ধ উভয় প্রকার জাহাজের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। যখন একটি রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়ে তখন দাবি করতে পারে যে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এই অধিকার তারা স্থগিত রাখতে পারে।
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষার জন্য আইনসম্মত ভাবে কনভয় ব্যবহার নিয়ে তেমন কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই আইনে। যাত্রাপথে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর আক্রমণ প্রতিহত করতে ও নিজেদের রক্ষা করার জন্য কনভয়গুলোতে সাধারণত বাণিজ্যিক জাহাজের একটি বহরের সঙ্গে যুদ্ধজাহাজও থাকে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যুদ্ধরত যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে কনভয়ে ভ্রমণ করলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধরত পক্ষের আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
সান রেমো ম্যানুয়ালে বলা আছে, যদি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলি নিরপেক্ষ দেশের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজকে সুরক্ষা দিয়ে নিয়ে যায় তবে এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসাবে গণ্য করা যাবে না। আমেরিকা প্রথম থেকেই দাবি করছে, তারা হরমুজ় মুক্ত করবেই। প্রয়োজনে নৌবাহিনী পাঠিয়ে জাহাজগুলিকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ় পার করাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ জন্য অন্যান্য দেশের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ইতিমধ্যেই।
চলমান সংঘাতের উত্তপ্ত আবহে, ইরান যদি নিজেকে ‘বিবদমান পক্ষ’ হিসাবে দাবি করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী মার্কিন বা মিত্রদেশগুলোর জাহাজ আটক করা শুরু করে, তবে তা সরাসরি নৌ-অবরোধ হিসাবে গণ্য হবে। এটি নিরসনের একমাত্র পথ সাধারণত সামরিক হস্তক্ষেপ, যা বড় ধরনের বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
ভারত ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরই ভরসা হরমুজ়ের বাইপাস। খনিজ তেলের থেকেও ভারতের জন্য বেশি চ্যালেঞ্জ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি। এত দিন তার সিংহভাগ নয়াদিল্লিকে সরবরাহ করছিল কাতার। হরমুজ় বন্ধ থাকায় তা একরকম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলির হস্তক্ষেপে ভারতের জ্বালানি সঙ্কটের মেঘ কাটবে বলে আশাবাদী দিল্লি। এর ফলে ভারতে এলপিজি সরবরাহ স্থিতিশীল হবে এবং ঘাটতির ব্যাপক আশঙ্কা কিছুটা দূর হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।