‘তাজা’ নেতা থেকে সন্তান হারানো মা! বিধানসভা ভোটে কেমন ফল করলেন বিতর্ককে সঙ্গী করা বিভিন্ন প্রার্থীরা?
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে একাধিক কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন নির্যাতিতা পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়া অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক। তাঁদের কে, কেমন ফল করলেন, খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম।
রাজ্যজুড়ে গেরুয়া ঝড়। প্রথম বারের জন্য সরকার গঠন করতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী-শমীক ভট্টাচার্যেরা। ভোট পূর্ববর্তী বেশ কিছু ঘটনায় উত্তাল হয় বাংলার রাজনীতি। যার অন্যতম কুশীলবদের বেশ কয়েক জন প্রার্থী ছিলেন এ বারের নির্বাচনে। কেমন ফল করলেন তাঁরা? খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম।
এই তালিকায় প্রথমেই আসবে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ধর্ষণ ও খুন হওয়া তরুণী চিকিৎসকের মা। উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি থেকে ২৮ হাজারের বেশি ভোটে জিতে প্রথমবার বিধানসভায় যাচ্ছেন তিনি। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৮৭,৯৭৭।
২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর হাসপাতালের ভিতরে ঘটে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ধর্ষণ ও খুন হন সেখানে কর্তব্যরত এক মহিলা চিকিৎসক। তদন্তে নেমে সঞ্জয় রায় নামের এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ। কিন্তু, রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল ও উর্দিধারীদের বিরুদ্ধে ওঠে আসল অভিযুক্তদের আড়াল করার অভিযোগ। ফলে উত্তাল হয়ে ওঠে বঙ্গ রাজনীতি। নির্যাতিতার বিচারের দাবিতে পথে নামেন নাগরিক সমাজের একাংশ।
এই পরিস্থিতিতে আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের প্রতি ক্ষোভ উগরে দেয় নিহতের পরিবার। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিজেপি নেতাদের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন তাঁরা। পরে অবশ্য মত বদলে পদ্মফুল চিহ্নে ভোটে লড়তে রাজি হন নির্যাতিতার মা। আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম বড় মুখ ছিলেন কলতান দাশগুপ্ত। পানিহাটিতে তাঁকেই প্রার্থী করে সিপিএম।
এই তালিকায় দ্বিতীয় নাম হল সাবিনা ইয়াসমিন। নদিয়ার কালিগঞ্জ থেকে সিপিএমের টিকিটে লড়ে হেরে গিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ২২,৮০৬। এই কেন্দ্র থেকে ১০,১৭২ ভোটে জিতে বিধায়ক হলেন আলিফা আহমেদ। মোট ৮৯,২৯২টি ভোট পেয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
গত বছর (২০২৫ সাল) কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিনে বোমার আঘাতে প্রাণ হারায় সাবিনার ১০ বছরের কন্যা তামান্না শেখ। সেই ঘটনায় তৃণমূলের বুথ সভাপতি-সহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। গ্রেফতার হন ১১ জন। মাত্র আট মাসের মাথায় সেই কালীগঞ্জ কেন্দ্রেই বামেদের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন তামান্নার মা।
উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। এ বারের ভোটে হেরে যাওয়ায় ষষ্ঠ বারের জন্য বিধানসভায় যাওয়া হচ্ছে না তাঁর। তৃণমূলের থেকে হাবড়া ছিনিয়ে নিয়ে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের জয়ের ব্যবধান ৩১,৪৬২। জ্যোতিপ্রিয় পেয়েছেন ৭৩,১৮৩ ভোট।
দলের দাপুটে নেতা বালুর (জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ডাক নাম) হাত ধরেই উত্তর ২৪ পরগনায় সংগঠন গড়ে তোলে তৃণমূল। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের ক্ষমতায় এলে মন্ত্রী হন তিনি। কিন্তু, পরে রেশন দুর্নীতির সঙ্গে নাম জড়ায় তাঁর। ২০২৩ সালে ২০ ঘণ্টার বেশি জিজ্ঞাসাবাদের পর জ্যোতিপ্রিয়কে গ্রেফতার করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। প্রায় ১৪ মাস জেলে থাকার পর শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পান বালু।
কলকাতার বেলেঘাটা থেকে জিতে প্রথম বারের জন্য বিধানসভায় যাচ্ছেন কুণাল ঘোষ। ২৮,৫৭৬ ভোটে জিতেছেন তিনি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপি প্রার্থীর পেয়েছেন ৬৫ হাজারের কিছু বেশি ভোট। অন্য দিকে কুণালের পকেটে এসেছে ৯৩,৭৫৭টি ভোট।
আরও পড়ুন:
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের মতো জেল খাটতে হয়েছে কুণাল ঘোষকেও। ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূলের সরকার তৈরি হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১২ সালে জোড়া ফুল চিহ্নিত রাজ্যসভার সাংসদ হন সাংবাদিক কুণাল। এর পরই সারদা চিটফান্ড মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে আর্থিক তছরুপের অভিযোগ। ২০১৩ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে বিধাননগর পুলিশ।
এ বারের ভোটের হলফনামায় তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন কুণাল। সারদা কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় দল থেকে সাসপেন্ড হন তিনি। কিন্তু, ২০১৬ সালে জামিনে মুক্তি পেতেই ফের তাঁকে ঘরে ফেরায় ঘাসফুল শিবির। দায়িত্ব পান মুখপাত্রের।
এ বছরের বিধানসভা ভোটে অন্যতম চর্চিত নাম হুমায়ুন কবীর। তৃণমূল ছেড়ে নতুন দল তৈরি করে নির্বাচন লড়ছেন তিনি। দলের নাম ‘আমজনতা উন্নয়ন পার্টি’ (এজেইউপি)। মুর্শিদাবাদের নওদা ও রেজিনগর, দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন হুমায়ুন। দু’টিতেই জিতেছেন তিনি। নওদায় তাঁর জয়ের ব্যবধান ২৭,৯৪৩। অন্য দিকে রেজিনগরে ৫৮,৮৭৬ ভোটে জিতেছেন তিনি।
বাংলার রাজনীতিতে হুমায়ুনকে ‘দলবদলু’ বললে অত্যুক্তি হবে না। গত ১৫ বছরে কংগ্রেস, তৃণমূল এবং বিজেপি তিনটি দলেই ঘুরেছেন তিনি। ২০১২ সালে দেশের শতাব্দীপ্রাচীন দল ছে়ড়ে তৃণমূলে যোগ দেন হুমায়ুন। কিন্তু প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করার জন্য ২০১৫ সালে তাঁকে ছ’বছরের জন্য বহিষ্কার করে ঘাসফুল শিবির। ২০১৮ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে ২০২১ সালে ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন হুমায়ুন।
তৃণমূলে থাকাকালীন একাধিক বার শোকজ় ও সাসপেন্ড হন হুমায়ুন কবীর। ফলে দলের সঙ্গে বাড়তে থাকে দূরত্ব। গত বছরের (২০২৫ সাল) একেবারে শেষের দিকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নতুন দল করেন হুমায়ুন। তার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিতে শোনা যায় তাঁকে।
মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে ৩৪,২৬০ ভোটে জিতেছেন তৃণমূল প্রার্থী বাইরন বিশ্বাস। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৯০,৭৮১। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপি প্রার্থী তাপস চক্রবর্তী পেয়েছেন ৫৬,৫২১ ভোট। এই কেন্দ্রে চার নম্বরে চলে গিয়েছেন কংগ্রেসের মনোজ চক্রবর্তী।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে বাম ও কংগ্রেসের। ভোটে এক জন প্রার্থীও জিততে পারেনি তাঁদের। কিন্তু, সাগরদিঘির বিধায়ক সুব্রত সাহার মৃত্যু হলে, ২০২৩ সালে উপনির্বাচন হয় সেখানে। তাতে কংগ্রেসের টিকিটে জেতেন বাইরন। কয়েক দিনের মধ্যেই তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। ফলে বিধানসভায় ফের শূন্য হয়ে যায় বাম-কংগ্রেস। এ বারের ভোটের সময় অবশ্য দলবদলকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে উল্লেখ করে ‘অনুতাপ’ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে ২৯,৫৮৪ ভোটে হেরে গিয়েছেন নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নাম জড়ানো পরেশচন্দ্র অধিকারী। ৮৯,৫২৫ ভোট পেয়েছেন তিনি। এই কেন্দ্রের বিজয়ী বিজেপি প্রার্থী দধিরাম রায়ের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ১০৯।
১৯৯১ সালে ফরওয়ার্ড ব্লকের টিকিটে জিতে প্রথম বার রাজ্য বিধানসভায় পা রাখেন পরেশচন্দ্র। বাম আমলে ২০০৬-’১১ সাল পর্যন্ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তিনি। কিন্তু, রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূলে যোগ দেন পরেশ। এতে অবশ্য তাঁর জনপ্রিয়তায় কোনও ভাটা পড়েনি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে হারলেও ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জিততে কোনও সমস্যা হয়নি তাঁর।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় স্কুল শিক্ষা দফতরের মন্ত্রী হন পরেশচন্দ্র। এর পরই নিয়োগ দুর্নীতিতে নাম জড়ায় তাঁর। এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসাবে মেয়ে অঙ্কিতার নিয়োগ নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। পরে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে চাকরি খোয়ান পরেশ-কন্যা। কিন্তু, দলে গুরুত্ব বাড়ে তাঁর। ২০২৪ সালে অঙ্কিতাকে কোচবিহারের জেলা সম্পাদক করে ঘাসফুল শিবির।
জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী স্বপ্না বর্মণকে নিয়ে ভোটের মুখে কম জলঘোলা হয়নি। বিজেপির দীনেশ সরকারের কাছে ২১,৪৭৭ ভোটে হেরে গিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৯৩,১৮০।
২০১৮ সালের এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণ এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যোগ দেন তৃণমূলে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন তিনি। ফেব্রুয়ারিতে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ছুটি নেন স্বপ্না। সেই সময় সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয় রেল। ১৬ মার্চ পদত্যাগ করেন স্বপ্না। তার পরেও তিনি ভোট লড়তে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল।
এ-হেন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সোনাজয়ী অ্যাথলিট প্রার্থীকে স্বস্তি দেয় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। তারা জানায়, ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধি আইনের অনুচ্ছেদ ৯ অনুযায়ী, স্বপ্নার নির্বাচনী লড়াইয়ে কোনও বাধা নেই। মার্চে অবশ্য পিতৃহারা হান স্বপ্না। ভোটের মুখে বাবা পঞ্চানন বর্মণকে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন স্বপ্না। তার পরও প্রচার চালিয়ে যান তিনি।
৯১,৯৫৪ ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্বে হেরে গিয়েছেন তৃণমূল ছেড়ে আইএসএফে যোগ দেওয়া আরাবুল ইসলাম। ৫৬,৭৩৩টি ভোট পান তিনি। এই কেন্দ্রের বিজয়ী তৃণমূল প্রার্থী মহম্মদ বাহারুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৬৮৭ ভোট।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের ভূমিপুত্র আরাবুল গোড়ায় ছিলেন তৃণমূল নেতা। ২০০৬ সালে সেখানকার বিধায়ক হন তিনি। পরবর্তী কালে একাধিক অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়ায় তাঁর নাম। জোটে ‘তাজা নেতা’র তকমাও। ফলে গ্রেফতার হতে হয় তাঁকে। এর জেরে দলের সঙ্গেও বাড়ে দূরত্ব। এ বার ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে যোগ দেন ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’ বা আইএসএফে।
বাম তারকা প্রার্থীদের তালিকায় নাম আছে আফরিন বেগমের (শিল্পী)। কলকাতার বালিগঞ্জ কেন্দ্রে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছেন তিনি। এখানকার বিজয়ী প্রার্থী হলেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৬১,৪৭৬। আফরিন পেয়েছেন মাত্র ৭,১৮৫টি ভোট।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি স্কলার আফরিন এ বারের ভোটে কম বয়সি প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম। প্রচার চলাকালীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানোর অভিযোগ করেন তিনি। ওয়াকার আজ়ম নামের এক ব্যক্তির নাম করে তিনি বলেন, আমার বয়স নিয়ে ব্যক্তি আক্রমণ করা হচ্ছে। পরে ভাইরাল হয় তাঁর ভিডিয়ো। সেখানে ওয়াকারকে ‘সুন্দরী যুবতী হলে বিয়ে দিয়ে দিন’ এ কথা বলতে শোনা গিয়েছে। এই নিয়ে কমিশনেও অভিযোগ দায়ের হয়েছিল।