China gives interest on digital currency E-CNY, is it a big concern for US Dollar dgtl
China’s Digital Currency
সুদ মিলবে ফোনের ওয়ালেটে ডিজিটাল মুদ্রা থাকলেই! ডলারের ‘দাদাগিরি’ শেষ করতে অভিনব অস্ত্রে শান দিচ্ছে ‘মুদ্রারাক্ষস’ ড্রাগন
নতুন বছরের ১ তারিখ থেকে ডিজিটাল মুদ্রায় সুদ দেওয়া শুরু করেছে চিন। এই পদ্ধতিতে ডলারের আধিপত্য শেষ করতে চাইছে বেজিং? না কি নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও আর্থিক ষড়যন্ত্রের ছক?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১১
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
ডিজিটাল মুদ্রায় ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’! এ বার তাতে সুদও দেবে চিন। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে (১ জানুয়ারি, ২০২৬) এই ব্যবস্থা চালু করেছে বেজিঙের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। দুনিয়ার তাবড় আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, হংকং-ভিত্তিক এই ব্যবস্থায় ডলারের সাড়ে সর্বনাশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ষোলো আনা। তবে এতে সাফল্য এলে বিশ্ব জুড়ে ডিজিটাল মুদ্রার সংজ্ঞা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা।
০২১৮
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ডিজিটাল ইউয়ানে সুদ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন ড্রাগনভূমির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পিবিসির (পিপল্স ব্যাঙ্ক অফ চায়না) ভাইস গভর্নর লু লেই। তাঁর কথায়, চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না বা সিপিসি) ১৫তম আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আপাতত পাঁচ বছরের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ডিজিটাল ইউয়ান ধারাবাহিক ভাবে আরও বেশি শক্তিশালী হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
০৩১৮
২০১৯ সালে ডিজিটাল ইউয়ানকে (ই-সিএনওয়াই) বাজারে আনে পিবিসি। তার আগে পর্যন্ত এর নগদ সংস্করণটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুচরো লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু ডিজিটাল মুদ্রা চালু হতেই স্মার্টফোনের ওয়ালেট অ্যাপের মাধ্যমে তার ব্যবহার শুরু করেন মান্দারিনভাষীরা। এর মাধ্যমে যে কোনও ধরনের অর্থপ্রদান করতে পারেন তাঁরা।
০৪১৮
চিনা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের দাবি, ই-সিএনওয়াইয়ের উপর সুদ ঘোষণার জেরে ডিজিটাল ইউয়ানের পেমেন্ট অ্যাপগুলির রাতারাতি চরিত্র বদল হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে এগুলি ব্যাঙ্ক ডিপোজ়িটের মতো কাজ করবে। এর সঙ্গে সেভিংস অ্যাকাউন্টের তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, নতুন নিয়মে বেজিঙের ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিটের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে ই-সিএনওয়াই। শুধু তা-ই নয়, এটিকে দায় (লায়বিলিটি) হিসাবে দেখা শুরু করেছে ড্রাগনভূমির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। যেমনটা গ্রাহকদের অন্যান্য ডিপোজ়িটের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
০৫১৮
ডিজিটাল ইউয়ানের এ-হেন উত্তরণ নিয়ে অবশ্য বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে পিপল্স ব্যাঙ্ক অফ চায়না। সেগুলি হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের মতো ই-সিএনওয়ান কোনও ক্রিপ্টো মুদ্রা নয়। ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিটের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এর উপর এক দিকে যেমন সুদ পাবেন গ্রাহক, অন্য দিকে তেমন এর উপর থাকবে বিমা। অর্থাৎ, ডিজিটাল মুদ্রা খোয়া গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে লোকসানের মুখে পড়বেন না ব্যবহারকারীরা।
০৬১৮
পিবিসির ভাইস গভর্নর লু লেই জানিয়েছেন, ই-সিএনওয়াই সার্বভৌম ইউয়ানেরই ডিজিটাল রূপ। দু’টি মুদ্রার মধ্যে মূলগত কোনও পার্থক্য নেই। শুধুমাত্র ই-সিএনওয়ান চলবে তথ্যপ্রযুক্তির একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে। তা ছাড়া এর উপর বাড়তি সুদ পাবেন গ্রাহক। এর আর একটা বড় বদল হল ডিজিটাল ইউয়ানের পেমেন্ট এখন আর আলিপে বা উইচ্যাট পে-র মতো শুধুমাত্র অ্যাপ-নির্ভর থাকছে না। আর এটাকেই বেজিঙের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করা হচ্ছে।
০৭১৮
বিশেষজ্ঞদের দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পিবিসি এবং দেশের যাবতীয় সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিকে নিয়ে ডিজিটাল মুদ্রার একটি হাইওয়ে তৈরি করছে ড্রাগন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছরের নভেম্বরে ই-সিএনওয়াইয়ের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৪৮ কোটির বেশি। এতে প্রায় ১৭ লক্ষ কোটি ইউয়ানের হাতবদল হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই কারণেই ডলারের বিকল্প হিসাবে ই-সিএনওয়াইকে চিন তুলে ধরতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।
০৮১৮
ডিজিটাল ইউয়ানের কয়েক লক্ষ ওয়ালেট রয়েছে। তবে সেখানকার অর্থ সব জায়গায় ব্যবহার করতে পারেন না মান্দারিনভাষীরা। এত দিন পর্যন্ত এর সাহায্যে শুধুমাত্র সরকারি বিল বা মেট্রো রেলের ভাড়া মেটাতে পারছিলেন তাঁরা। আবার বেজিং প্রশাসনের দেওয়া ভর্তুকির অর্থও ই-সিএনওয়াইয়ের মাধ্যমে মিলছিল। সেই নিয়মেও বড় বদল এনেছেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
০৯১৮
পিপল্স ব্যাঙ্ক অফ চায়নার জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন নিয়মে ঋণ, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং স্মার্ট কন্ট্রাক্ট সেটেলমেন্টের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহার করতে পারবেন গ্রাহক। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এটিকে চালু রেখেছে বেজিং। হংকংকে কেন্দ্র করে সেই ব্যবস্থাটি গড়ে তুলেছে ড্রাগন সরকার। সেখানকার বাসিন্দারা নিজেদের মোবাইল ফোনে ডিজিটাল ওয়ালেট ডাউনলোড করে তার মাধ্যমে ই-সিএনওয়াই দেওয়া-নেওয়া করতে পারবেন।
১০১৮
কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে মিলে ‘প্রজেক্ট এমব্রিজ়’ শুরু করে চিন। বর্তমানে তাতে ঢালাও ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহার করছে বেজিং। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটিতে ড্রাগন ছাড়াও আছে হংকং, তাইল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। এই দেশগুলির সঙ্গে দেশীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করছেন মান্দারিনভাষীরা। এর জেরে এশিয়ার বাজারে বেশ শক্তিশালী হয়েছে ই-সিএনওয়াই।
১১১৮
পিপল্স ব্যাঙ্ক অফ চায়নার ভাইস গভর্নর লু লেই জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ‘প্রজেক্ট এমব্রিজ়’-এ লেনদেন হয়েছে মোট ৩,৮৭২ কোটি মূল্যের ইউয়ান। এর ৯৫ শতাংশই ছিল ডিজিটাল মুদ্রা। চলতি বছরে এই সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে বেজিংকে বিশ্বব্যাপী ই-সিএনওয়াইয়ের ব্যাপক প্রচার করতে দেখা গিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে সাংহাইয়ে ডিজিটাল ইউয়ানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপারেশন সেন্টার খোলে জিনপিং প্রশাসন।
১২১৮
সূত্রের খবর, সুদ প্রদানকারী ডিজিটাল ইউয়ানের মাধ্যমে নগদ এবং ডিপোজ়িটের মধ্যে পার্থক্য মুছে ফেলতে চাইছে চিন। সেই কারণেই সেভিংস অ্যাকাউন্টের মতো এটিকে ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিটের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে বেজিঙের কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান। মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ড্রাগনভূমিতে আমানতের উপর খুব কম সুদ পান গ্রাহক, যেটা বর্তমানে ০.০৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
১৩১৮
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ডলারের মতো স্থিতিশীল মুদ্রার বিপরীতে একটি ডিজিটাল মুদ্রার বিকল্প গড়ে তুলতে চাইছে চিন। সেই কারণেই ই-সিএনওয়াইকে এ ভাবে বাজারে তুলে ধরছে বেজিং। তবে এখনও আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় অংশই নিয়ন্ত্রিত হয় ডলারে। আমেরিকার মুদ্রার উপর সারা বিশ্বের যে রকম ভরসা রয়েছে রাতারাতি ড্রাগনের পক্ষে সেটা ভেঙে ফেলা বেশ কঠিন।
১৪১৮
ভারত ও চিনের মতো দেশগুলির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা আমেরিকার ডলার নিয়ে একচ্ছত্র অধিকার বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মত আমেরিকার অর্থনৈতিক বিশারদদের একাংশের। তাঁদেরই এক জন হলেন জেরাল্ড সেলেন্ট। আগামী দিনে বিশ্বের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি কোন খাতে বইবে তার আগাম সম্ভাবনা বা পূর্বাভাস দিয়েছেন তিনি।
১৫১৮
গত বছরের অগস্টে একটি পডকাস্টে এসে ডলারের দাপাদাপি শেষ হওয়ার বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেন জেরাল্ড। তাঁর মতে, ‘ব্রিকস’ভুক্ত দেশগুলি, বিশেষ করে ব্রাজ়িল, রাশিয়া, ভারত, চিন এবং সাউথ আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ছে মার্কিন সরকার। আমেরিকার বিদেশনীতির বিরুদ্ধে ‘ব্রিকস’ভুক্ত দেশগুলি যে ভাবে জোট বাঁধছে তাতে ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্য কায়েম রাখতে বেগ পেতে হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
১৬১৮
‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীর দেশগুলি নিজেদের মধ্যে লেনদেনে ডলারের বদলে অন্য মুদ্রাকে বাছলে বা নতুন মুদ্রা তৈরি করলে অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের হুমকি দিয়েই রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ১০। সংশ্লিষ্ট দেশগুলির একাংশ ডলারের বদলে অন্য মুদ্রায় লেনদেনের দাবি করছে। বিশেষত রাশিয়া, চিন ‘ব্রিকস’ গোষ্ঠীর মধ্যে লেনদেনের জন্যই আলাদা মুদ্রা তৈরির পক্ষপাতী। তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে ব্রাজ়িলও।
১৭১৮
২০২৪ সালে কাজ়ান শহরে হওয়া সম্মেলনে প্রথম বার ‘ব্রিকস’-এর মুদ্রা তৈরির বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আমেরিকার ‘চিরশত্রু’ রাশিয়ার এই ঘোষণার পরেই ওয়াশিংটনের মাথাব্যথা শুরু হয়। বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) অনেকটাই দখলে রয়েছে ‘ব্রিকস’-ভুক্ত দেশগুলির কাছে। সেই কারণে এই গোষ্ঠীর মুদ্রা তৈরি নিয়ে আতঙ্কে ভুগছে আমেরিকা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যেই এই মুদ্রা-যুদ্ধকে বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১৮১৮
এ বছর ভারতের সভাপতিত্বে ‘ব্রিকস’ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যবৃদ্ধির উপর জোর দিতে পারে নয়াদিল্লি। ফলে ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহারের আরও বেশি করে সুযোগ যে চিনের সামনে খুলে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সীমান্ত সংঘাত থাকার কারণে আর্থিক দিক থেকে বেজিঙের উন্নতি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্য একেবারেই স্বস্তিজনক নয়। সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা নয়াদিল্লি কী ভাবে করে, সেটাই এখন দেখার।