জাপান তিনটি পরমাণু অস্ত্র-নিরস্ত্রীকরণ নীতিও মেনে চলে। ১৯৬৭ সালে প্রধানমন্ত্রী এইসাকু সাতো প্রথম এটি প্রকাশ করেন এবং ১৯৭১ সালে সংসদীয় প্রস্তাব হিসাবে আনুষ্ঠানিক ভাবে তা গৃহীত হয়। এই তিনটি নীতি হল— পরমাণু অস্ত্র না রাখা, পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করা এবং জাপানের ভূখণ্ডে পরমাণু অস্ত্র প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া।
সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, তাইওয়ানের উপর চিনের সশস্ত্র আক্রমণ জাপানের জন্যও ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘ড্রাগন যদি ওই দ্বীপরাষ্ট্র দখলের চেষ্টা করে তা হলে চুপ করে বসে থাকবে না টোকিয়ো। প্রয়োজনে তাইওয়ানকে সামরিক সাহায্য করা হবে।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই হুঁশিয়ারি দেয় ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সরকার। ফলে এই পরিস্থিতিতে জাপানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
তা হলে জাপান কি এ বার গোপনে এনপিটি এবং তিন পারমাণবিক নীতির বাইরে বেরিয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে? অন্তত তেমনটাই মনে করছে চিন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ৩০ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বেজিং। সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাপানের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে ‘মজবুত এবং শক্তিশালী ব্যবস্থা নেওয়ার’ আহ্বান জানানো হয়েছে।
‘চায়না আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড ডিজ়আর্মামেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিএসিডিএ)’ এবং ‘চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার কর্পোরেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘নিউক্লিয়ার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ যৌথ ভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ‘জাপানের ডানপন্থী বাহিনীর পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: বিশ্ব শান্তির জন্য একটি গুরুতর হুমকি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে সেই প্রতিবেদন।
বেজিঙের সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এনপিটি চুক্তির অধীনে জাপানের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গোপনে পরমাণু অস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়ন চালিয়ে আসছে টোকিয়ো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই একটি বিস্তৃত পরমাণু জ্বালানি চক্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং তারা শক্তিশালী পরমাণু শিল্পের অধিকারী।’’
জাপান পরমাণু অস্ত্রের জন্য ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে বলেও দাবি করা হয়েছে চিনা প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘‘জাপান হয়তো ইতিমধ্যেই গোপনে পরমাণু অস্ত্রের জন্য প্লুটোনিয়াম তৈরি করে ফেলেছে। অল্প সময়ের মধ্যে পরমাণু শক্তিধর হওয়ার এবং পরমাণু অস্ত্র অর্জনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে দেশটির।’’
প্রতিবেদনে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের একটি মন্তব্যও উদ্ধৃত করেছে চিন, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘‘রাতারাতি পরমাণু অস্ত্র রাখার ক্ষমতা রয়েছে জাপানের।’’ ২০১৬ সালের জুনে আমেরিকান পাবলিক ব্রডকাস্টার পিবিএসের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে প্রথম সেই তথ্য দিয়েছিলেন বাইডেন। চিনা প্রেসিডেন্ট জিনপিঙের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন স্মরণ করে বাইডেন বলেছিলেন, ‘‘জাপান যদি আগামী কাল পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারে তা হলে কী হবে? তাদের রাতারাতি সেই অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা রয়েছে।’’
বেজিঙের তরফে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনপিটি চুক্তির অধীনে থাকা দেশগুলির মধ্যে জাপানই একমাত্র অ-পরমাণু রাষ্ট্র যার কাছে পরমাণু জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি এবং অস্ত্রের জন্য ব্যবহৃত প্লুটোনিয়াম নিষ্কাশনের ক্ষমতা রয়েছে। প্লুটোনিয়াম উৎপাদন চুল্লিতে মাত্র দু’থেকে তিন মাস ধরে বিকিরণ করা ইউরেনিয়াম জ্বালানি থেকে প্লুটোনিয়াম পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে চিনের এই উদ্বেগ অহেতুক না-ও হতে পারে। কারণ, জাপানের পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘জাপান অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি’র জনসাধারণের কাছে উপলব্ধ তথ্য বলছে, ১৯৮৪ সালে পরীক্ষামূলক চুল্লি ‘জোয়ো’ থেকে ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে প্লুটোনিয়াম পুনরুদ্ধার করে। ১৯৭৮ সালে চুল্লিটির কার্যক্রম শুরু থেকে ১৯৯৪ সালে মূল নকশায় পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সেই চুল্লির প্রযুক্তিগত ভাবে অস্ত্র তৈরির প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল।
১৯৯৪ সালের একটি গবেষণাপত্রেও বলা হয়েছে, ‘‘মার্কিন বিশেষজ্ঞেরা বিশ্লেষণ করেছেন যে, জোয়ো পরীক্ষামূলক চুল্লির নকশা বদলের আগে জাপান সম্ভবত সেই চুল্লি ব্যবহার করে প্রায় ৪০ কেজি পরমাণু অস্ত্রে ব্যবহৃত প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করেছে।’’ অর্থাৎ, বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই দাবি, অসামরিক পরমাণু শক্তির জন্য যা চাহিদা, তার চেয়ে অনেক বেশি প্লুটোনিয়াম মজুত করেছে সামুরাইদের দেশটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’ এবং ‘ফ্যাট ম্যান’-এর হামলার কথা উল্লেখ করে চিনের এক জন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, “যদি ওরা পরমাণু অস্ত্র তৈরির সাহস দেখায়, তা হলে তাদের পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা দুই থেকে তিন বা চারটিতে বৃদ্ধি পেতে পারে। আর হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে যে বোমা পড়েছিল, তার থেকে এখনকার কৌশলগত পরমাণু বোমার ক্ষমতা ১০ গুণ বেশি।”
অন্য দিকে, চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, “জাপানে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি। প্রধানমন্ত্রী সানেই তাকাইচি এবং অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তিনটি অ-পারমাণবিক নীতি সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন, যার মধ্যে পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ প্রবর্তন অন্তর্ভুক্ত। জাপান খোলাখুলি ভাবেই এখন দাবি করেছে যে তাদের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকা উচিত।”
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানেই তাকাইচি এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই জাপানের পরমাণু নীতি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি পরামর্শ দিয়েছেন, আমেরিকার পরমাণু ছাতার উপর টোকিয়োর নির্ভরতা জাপানের মাটিতে পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করার নীতিকে ক্রমশ অবাস্তব করে তুলছে।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তাকাইচি পরমাণুচালিত ডুবোজাহাজ প্রবর্তনের বিষয়ে কথা বলার সময় বলেন, ‘‘আমরা পরমাণুচালিত ডুবোজাহাজ তৈরির সম্ভাবনা বাতিল করছি না এবং প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করব।’’ জাপানের মন্ত্রিপরিষদের কর্মকর্তারা অনেক আগেই পরমাণুচালিত ডুবোজাহাজ অর্জনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আনুষ্ঠানিক ভাবে তাকাইচির মুখে সেই কথা প্রথম বার শোনা গিয়েছিল। একই ভাবে, ২০২২ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আবে পরামর্শ দিয়েছিলেন, টোকিয়োর উচিত আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র ভাগ করে নেওয়া।
জাপান ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার পরমাণু ছাতার সুরক্ষায় রয়েছে। তবে জাপানি ভূখণ্ডে পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপর টোকিয়োর স্ব-আরোপিত বিধিনিষেধ কার্যকর ভাবে এই প্রতিরক্ষামূলক বোঝাপড়ায় সমস্যা তৈরি করবে। এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ তৈরিতে অনুমোদন দেওয়ার পর, জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘‘আমেরিকা এবং চিনের হাতে ইতিমধ্যেই পরমাণুচালিত ডুবোডাহাজ রয়েছে। এখন দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার হাতেও চলে আসবে।’’
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy