হরমুজ়ের তলায় ‘পূর্ণিমা’র আলো! জলের নীচের ঘাতকদের ‘খুন’ করার উপায় কী? কতটা ক্ষমতাবান ইরানি মাহাম?
বর্তমান সংঘাতে ইরান তাদের ‘মাহাম’ (ফারসি ভাষায় যার অর্থ পূর্ণিমা) সিরিজ়ের নৌ মাইন ব্যবহার করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মাহাম-১ এবং মাহাম-২ হল প্রচলিত কন্ট্যাক্ট মাইন।
হরমুজ় প্রণালীর সরু জলপথের মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ হয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পরে হরমুজ় অবরুদ্ধ করেছিল ইরান। কিন্তু ইরানের সঙ্গে আমেরিকার মধ্যে সংঘাত এখন স্থগিত হওয়ার পরেও এর নীচে কী থাকতে পারে তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই মাইনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে হরমুজ়ের জলপথ।
হরমুজ় নিয়ে যে গভীর সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা যুদ্ধপরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সহজে মেটার নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। আর সেই সমস্যা হল হরমুজ়ের অন্দরে ইরানের পাতা ‘বারুদ-সুড়ঙ্গ’ (ওয়াটার মাইন বা নাভাল মাইন)। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পরে পরেই হরমুজ় প্রণালী জুড়ে মাইন পেতে রেখেছিল ইরান। আর সেই মাইনই এখন তাদের গলার কাঁটা।
মার্কিন আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইম্স জানিয়েছিল, কোথায় কোথায় মাইন পাতা হয়েছিল, এখন আর তা চিহ্নিত করতে পারছে না তেহরান। আর সে কারণেই আমেরিকার শর্ত মেনে সব জাহাজের জন্য হরমুজ় খুলে দিতেও পারছে না।
মনে করা হচ্ছে, গত এক মাসে হরমুজ় প্রণালীতে প্রচুর মাইন পেতে রেখেছে ইরান। এর উদ্দেশ্য ছিল জাহাজ চলাচলকে প্রায় অসম্ভব করে তোলা এবং শত্রুপক্ষের জাহাজ ধ্বংস করে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযানের ব্যয়ভার বাড়ানো।
কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও হরমুজ় নিয়ে জটিলতা কাটছে না। এখনও তা পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়া থেকে অনেক দূরে। প্রাথমিক শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায়, আমেরিকার তরফে এখন ইরানের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর উপর একটি অবরোধ চাপানো হয়েছে। হরমুজ় প্রণালী পরিষ্কার করা এবং বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ তৈরির দায়িত্বও গ্রহণ করেছে আমেরিকা। কিন্তু তা ঘোষণা করা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ নয়। কারণ সেই ওয়াটার মাইন বা নাভাল মাইন।
আরও পড়ুন:
নাভাল মাইন জলের নীচে ব্যবহৃত বিস্ফোরক, যা জাহাজ এবং ডুবোজাহাজের ক্ষতিসাধন করা এবং সেগুলিকে ডুবিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। সমুদ্রযুদ্ধের অন্যতম পুরনো অস্ত্র এটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাভাল মাইন আরও উন্নত এবং ঘাতক হয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের নাভাল মাইন রয়েছে। সবচেয়ে সাধারণ হল কন্ট্যাক্ট মাইন, যা জাহাজের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এলেই বিস্ফোরিত হয়। এর পর রয়েছে ইনফ্লুয়েন্স মাইন, যা সংস্পর্শে নয়, বরং জাহাজের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে সক্রিয় হয়, যেমন— জাহাজের ইঞ্জিন থেকে নির্গত শব্দতরঙ্গ, জাহাজের কাঠামোর কারণে চৌম্বকক্ষেত্রে সৃষ্ট বিকৃতি, অথবা জলের মধ্য দিয়ে চলার সময় জাহাজের ওজনের কারণে সৃষ্ট চাপের পরিবর্তন।
মাইনগুলিকে জলে তাদের অবস্থানের ভিত্তিতেও বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। নোঙর করা মাইন সমুদ্রতলে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় ভেসে থাকে, যা সেগুলিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের জাহাজ এবং কখনও কখনও ডুবোজাহাজের জন্য বিপজ্জনক করে তোলে।
বটম মাইন সমুদ্রের তলদেশে থাকে। ফলে এগুলি শনাক্ত করা কঠিন। অগভীর জলের জন্য বিশেষ ভাবে উপযুক্ত সেই মাইন। আবার ভাসমান মাইনগুলির গতিবিধি সহজে অনুমানযোগ্য নয় এবং অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ, স্রোতের উপর নির্ভর করে এগুলি বার বার স্থান পরিবর্তন করতে পারে।
আরও পড়ুন:
বর্তমান সংঘাতে ইরান তাদের ‘মাহাম’ (ফারসি ভাষায় যার অর্থ পূর্ণিমা) সিরিজ়ের নৌ মাইন ব্যবহার করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মাহাম-১ এবং মাহাম-২ হল প্রচলিত কন্ট্যাক্ট মাইন। গোলাকার মাইনগুলি শিকল দিয়ে সমুদ্রতলে নোঙর করা থাকে অথবা একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় ভাসতে থাকে। মাইনগুলিতে পাঁচটি কন্ট্যাক্ট হর্ন বা ‘হার্ৎজ় হর্ন’ থাকে, যা বেঁকে গেলে বা স্থানচ্যুত হলে মাইনটি বিস্ফোরিত হয়। মাইনগুলি ১২০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম।
এ ছাড়া হরমুজ়ে মাহাম-৩-এর মতো বড় মাইনও ইরান বসিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। মাহাম-৩ প্রায় ৩৮০ কেজি ওজনের একটি মাইন। সমুদ্রের তলায় নোঙর করা হয় এই বিস্ফোরক। পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে মাহাম-৭-ও।
মাহাম-৭ একটি ‘লিম্পেট মাইন’, যা চুম্বক ব্যবহার করে জাহাজের খোলের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করে এবং বিস্ফোরিত হয়। মাহাম-৭ মাইনটির ওজন প্রায় ২২০ কেজি। জলের গভীরে ৩৫ মিটার পর্যন্ত স্থাপন করা যায় এই বিস্ফোরক। ফলে খুঁজে পাওয়া বা চিহ্নিত করা অতটা সহজ নয়।
নাভাল মাইন মোকাবিলা করা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। আগে এই বিস্ফোরকগুলি মোকাবিলা করা হত কাঠের খোলের ‘মাইনসুইপার’ দিয়ে, যা জলের মধ্যে মাইনকে আটকে রাখা তারগুলো কেটে দিত। তার কেটে গেলে মাইন জলের উপরে ভেসে উঠত এবং গুলিবর্ষণ করে সেগুলিকে ধ্বংস করা হত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলের তলার মাইনগুলি আরও জটিল হয়ে ওঠায় সেগুলি ধ্বংস করার পদ্ধতিও অত্যাধুনিক হয়ে ওঠেছে। তার কাটার পরিবর্তে শত্রুপক্ষ এমন যন্ত্র টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে যা জাহাজের শব্দ বা চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অনুকরণ করে, ফলে মাইনগুলি সময়ের আগে এবং নিরাপদ দূরত্বে বিস্ফোরিত হতে বাধ্য হয়। যে জাহাজগুলি এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করত, সেগুলিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক হয়েছে।
আধুনিক মাইন যুদ্ধও অনেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন দেশের নৌবহরে বিশেষ মাইন-সন্ধানী জাহাজ, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং সেন্সর ব্যবহার করা হয় জলের তলার ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা ঘাতকদের ধ্বংস করার জন্য। শব্দতরঙ্গ এবং লেজ়ার সিস্টেমও ব্যবহার করা হয় লুকোনো মাইন শনাক্ত করতে। শনাক্ত হয়ে গেলে ডুবোযান এবং চালকবিহীন পৃষ্ঠযানের সাহায্যে মাইনগুলো পরিদর্শন করা হয় এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ধ্বংস করা হয়।
তবে খবর, সংঘাতের আবহে হরমুজ়ে যে বিপজ্জনক মাইনের ফাঁদ ইরান পেতেছিল, তা তারা এখন নিজেরাই খুঁজে পাচ্ছে না। যদিও আমেরিকার তরফে জানানো হয়েছে, জলের তলার ওই বিস্ফোরক খুঁজে বার করবে তারা। নিয়ন্ত্রিত ভাবে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ করবে ওই জলপথ। গত ১১ এপ্রিল মাইন অপসারণ অভিযান শুরুর ঘোষণা করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার বলেন, ‘‘আজ আমরা একটি নতুন পথ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। অবাধ বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে শীঘ্রই এই নিরাপদ পথটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’’
আমেরিকার তরফে হরমুজ়ে মাইন অপসারণ অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর লিটোরাল কমব্যাট শিপ, যা মাইন শনাক্ত করে ধ্বংস করার মতো অভিযানের জন্যই তৈরি। এমএইচ-৬০ রোমিয়োর মতো হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হবে, যা লেজ়ার ব্যবহার করে মাইন চিহ্নিত করতে সক্ষম।
এই হেলিকপ্টারগুলি একটি বিস্তৃত এলাকা জুড়ে মাইন শনাক্ত করতে পারে। মাইনক্ষেত্রের একটি প্রাথমিক মানচিত্র তৈরির জন্যও উপযোগী কপ্টারগুলি। মাইনগুলি একবার শনাক্ত এবং চিহ্নিত হয়ে গেলে তা বিভিন্ন উপায়ে নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু হবে।
তবে হরমুজ় নিয়ে ক্রমশ আরও জট পাকছে পশ্চিম এশিয়ায়। প্রণালীটি আমেরিকা অবরুদ্ধ করেছে, তাই আপাতত কোনও জাহাজ ইরান থেকে বার হতে পারছে না। আবার ইরানের বন্দরেও কোনও জাহাজকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, হরমুজ় প্রণালীর দু’পাশ এমন ভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছে যে, পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে। যদিও ইরান হরমুজ়ের একাংশ খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু আমেরিকা স্পষ্ট জানিয়েছে যে, ইরানের বন্দরে কোনও জাহাজকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। দুই বিবদমান দেশ আলাদা আলাদা ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে অবরুদ্ধ করায় উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জটিলতা আরও বেড়েছে।