‘সবুজ দ্বীপটির’ মালিকানা আমেরিকার হাতে এলে গোল্ডেন ডোম বা সোনালি গম্বুজের ‘একটি অংশ’ গ্রিনল্যান্ডে থাকবে, স্পষ্ট জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সত্যিই কি গোল্ডেন ডোমের জন্য গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা প্রয়োজন রয়েছে আমেরিকার?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১০
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৭
মুখে যতই বলুন না কেন গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সেনা নামাবেন না। গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য তলে তলে একের পর এক পরিকল্পনা ছকে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের ‘বৃহত্তম সবুজ দ্বীপ’কে কুক্ষিগত করার জন্য মরিয়া হয়ে ‘অজুহাত’ খুঁজে চলেছেন তিনি। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য, এই তত্ত্বকে জোরালো করতে নতুন যুক্তি খাড়া করেছেন ট্রাম্প।
০২১৭
গ্রিনল্যান্ডের উপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে, এই ধারণার সঙ্গে ট্রাম্প তাঁর অন্যতম স্বপ্নের প্রকল্পকে জুড়ে দিতে চাইছেন। বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ঢাল প্রকল্প বা সোনালি গম্বুজ। ট্রাম্পের সেই ‘মহাপরিকল্পনা’ সফল করতে হলে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার মানচিত্রে ঢোকাতেই হবে এমনই তত্ত্ব বিশ্বের সামনে উপস্থিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
০৩১৭
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ তাঁর পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ বা সোনালি গম্বুজ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ‘অপরিহার্য’। ট্রাম্পের আশঙ্কা ভবিষ্যতে রাশিয়া এবং চিন থেকেই আমেরিকার মাটিতে আকাশপথে হামলা হতে পারে। আর অবস্থানগত কারণে গ্রিনল্যান্ডের মতো মেরুদ্বীপের দিকে নাকি শ্যেনদৃষ্টি দিয়ে বসে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই শত্রুদেশ।
০৪১৭
ট্রাম্প জমানায় তৈরি হতে চলা মার্কিন এই আকাশ প্রতিরক্ষা কবচের পোশাকি নাম ‘গোল্ডেন ডোম’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দাবি, এর সাহায্যে অনায়াসেই ঠেকানো যাবে হাইপারসোনিক (পড়ুন শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন) ক্ষেপণাস্ত্র। বর্তমানে রাশিয়া এবং চিনের মতো শত্রু রাষ্ট্রগুলির অস্ত্রাগারে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি থাকায় চিন্তায় ঘুম উড়েছে ওয়াশিংটনের।
০৫১৭
সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তৃতা দেওয়ার সময় ট্রাম্প জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডকে কেবল তাঁর এই ক্ষেপণাস্ত্র ঢালের জন্যই প্রয়োজন এমনটা নয়। ইউরোপে শান্তিবজায়কারী সংস্থা নেটোর ভবিষ্যতের জন্য গ্রিনল্যান্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
০৬১৭
শুধু তাই নয়, মেরু অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে এবং সুদূর উত্তরে আমেরিকার আধিপত্য বজায় রাখার জন্যও গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ বিষয়ে ট্রাম্প জোর গলায় জানান যে ‘গোল্ডেন ডোম’ গ্রিনল্যান্ডে রাখা হলেও হতে পারে। এ বিষয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্ক’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘সবুজ দ্বীপ’টির মালিকানা আমেরিকার হাতে এলে গোল্ডেন ডোম বা সোনালি গম্বুজের ‘একটি অংশ’ গ্রিনল্যান্ডে থাকবে।
০৭১৭
তবে দুই প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে সম্ভবত মার্কিন সেনা এবং আরও সামরিক ঘাঁটি যুক্ত করার কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে। অবশ্য ট্রাম্প আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি তুলেছেন, এই ব্যবস্থার ফলে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, কানাডাও এই প্রতিরক্ষা সুরক্ষাবর্মের মধ্যে মাথা গলিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। তাই ওয়াশিংটনের কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত অটোয়ারও।
০৮১৭
আমেরিকা যে ‘সোনালি গম্বুজ’ তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছে তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকার ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’-এর সময়কাল থেকেই। ১৯৮৩ সালে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ’ বা ‘স্টার ওয়ার্স’ চালু করেছিলেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি মহাকাশভিত্তিক ঢাল বা বর্ম দিয়ে আমেরিকাকে মুড়ে ফেলা।
০৯১৭
১৯৮৩ সালের ২৩ মার্চ, হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে রিগ্যান বলেছিলেন, ‘‘এমন একটি ব্যবস্থা কল্পনা করুন যা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের উপকূলে পৌঁছোনোর আগেই বাধা দিতে সক্ষম হবে। এমন একটি ব্যবস্থা কল্পনা করুন যা আমাদের শহর এবং আমাদের জনগণকে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।’’
১০১৭
‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ অবসানের পর প্রকল্পটি অবশ্য স্থগিত করা হয়েছিল। রোনাল্ড যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি ছিল বিশ্বের সেরা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হতে চলেছে ‘গোল্ডেন ডোম’। ইজ়রায়েলি আয়রন ডোমের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে আমেরিকার এই প্রতিরক্ষা বর্ম।
১১১৭
কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে শত্রুর ছোড়া ব্যালেস্টিক বা ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রকে চিহ্নিত করবে আমেরিকার ‘সোনালি গম্বুজ’। এর জন্য স্থলভিত্তিক রেডারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে এই ব্যবস্থা। তার পর লেজ়ার ব্যবহার করে হাইপারসনিক, ব্যালেস্টিক এবং ক্রুজ়— তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করবে গোল্ডেন ডোম। বিশ্বের যে কোনও প্রান্ত থেকে মার্কিন ভূখণ্ড বা সেনাঘাঁটির দিকে ধেয়ে আসা শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র (বা যুদ্ধবিমান) আকাশেই ধ্বংস করতে পারবে এই গম্বুজাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
১২১৭
গোল্ডেন ডোমের জন্য প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫ লক্ষ কোটি টাকা) খরচ করবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। প্রাথমিক ভাবে, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আড়াই হাজার কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২ লক্ষ ১৪ হাজার কোটি টাকা) বরাদ্দ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর সাহায্যে হাইপারসনিক, ব্যালেস্টিক এবং ক্রুজ়— তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করতে পারবে মার্কিন ফৌজ। যুক্তরাষ্ট্রের স্থল এবং নৌবাহিনীকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেবে ট্রাম্পের সাধের ‘গোল্ডেন ডোম’।
১৩১৭
সূত্রের খবর, সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যেই ‘গোল্ডেন ডোম’-এর প্রযুক্তিগত প্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। ২০২৯ সালের মধ্যে একে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মোতায়েন করবে মার্কিন ফৌজ। ‘জাতীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প’-এর (ন্যাশনাল মিসাইল ডিফেন্স প্রোগ্রাম) আওতায় এই কবচ তৈরি করতে বদ্ধপরিকর ট্রাম্প প্রশাসন।
১৪১৭
হোয়াইট হাউসের কর্তা ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, উত্তর মেরুবলয়ের ওই অঞ্চলে রুশ ও চিনা যু্দ্ধজাহাজের আনাগোনা ক্রমেই বাড়ছে। ট্রাম্প যে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তার নির্যাস হল গ্রিনল্যান্ড ইউরেশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযোগকারী সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক পথের ঘা ঘেঁষে অবস্থান করছে।
১৫১৭
দীর্ঘ দিন ধরে রুশ-মার্কিন সংঘর্ষের সময় আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলির করিডর ছিল এই সরু সমুদ্রপথ। তাই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রাথমিক শনাক্তকরণ এই মেরুপথগুলির কাছাকাছি স্থাপন করা সেন্সরের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘ দিন ধরে এই ভূমিকা পালন করে আসছে। এই দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘পিটুফিক স্পেস বেস’ কয়েক দশক ধরে পেন্টাগনকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা এবং মহাকাশে নজরদারি চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
১৬১৭
সত্যিই কি গোল্ডেন ডোমের জন্য গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা প্রয়োজন রয়েছে আমেরিকার? প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের উত্তর হল ‘না’। ১৯৫১ সালের মার্কিন-ডেনমার্ক প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে আমেরিকা ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে সামরিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ঘাঁটি তৈরি করেছে। তাই গোল্ডেন ডোম স্থাপনে দ্বীপের মালিকানার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত রেডার, যোগাযোগকারী অ্যান্টেনা, এমনকি ইন্টারসেপ্টর সাইটের মাধ্যমে গোল্ডন ডোমারে কার্যকারিতা বৃদ্ধি কর ৪০০০ হাজার কিলোমিটার দূরের দ্বীপটিকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন প্রাক্তন মার্কিন প্রতিরক্ষাকর্তাও।
১৭১৭
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ় ইনস্টিটিউটের এক অভিজ্ঞ প্রতিরক্ষা গবেষক টড হ্যারিসন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকোকে’ বলেন, ‘‘গোল্ডেন ডোমের জন্য আমাদের যা প্রয়োজন সেই নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে বিদ্যমান।” তিনি এ-ও জানান যে, এই অঞ্চলটি দখল করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ট্রাম্পের বক্তব্য বাস্তব থেকে বহু যোজন দূরে। পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থা ইতিমধ্যেই ‘ইন্টারসেপ্টর ফিল্ডের’ জন্য দেশের মাটিতে বেশ কয়েকটি জায়গা বাছাই করার কাজে হাত দিয়েছে। অবস্থানগত ভাবে সেই জায়গাগুলি গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে উন্নত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।