ইরানের শেষ ‘সম্রাজ্ঞী’ আজ নির্বাসিত রাজার বিধবা! ইরানের রাজবংশের ডাকসাইটে সুন্দরী ফরাহ পহলভী এখন কোথায়?
১৯৩৮ সালের ১৪ অক্টোবর তেহরানে একটি উচ্চবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফরাহ দিবা। অসাধারণ সুন্দরী এবং প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন তিনি। ২১ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ সালে শাহ রেজ়া পহলভীকে যখন ফরাহ বিয়ে করেন তখন তাঁর মাত্র ২১ বছর বয়স।
আধুনিক ইরানের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র নারী, আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘সম্রাজ্ঞী’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল তাঁকে। ইরানের রাজপরিবারের কোনও বধূর মুকুটে জোড়েনি এই পালক। ইরানের রাজতন্ত্রে আর কোনও শাহ বা রাজার স্ত্রীকে বিশেষ এই মর্যাদা দেওয়া হয়নি।
প্রায় ৬০ বছর আগে, ফরাহ পহলভীর মাথায় উঠেছিল রানির মুকুট। ইরানের শেষ রাজা শাহ মহম্মদ রেজা পহলভী তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ফরাহ পহলভীকে (ফরাহ দিবা) মুকুট পরিয়ে দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। ১৯৬৭ সালে ফরাহকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘শাহবানু’র মুকুটটি পরানো হয়। এটি আধুনিক ইরানের ইতিহাসে প্রথম, যেখানে রানিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্রাজ্ঞী হিসাবে মুকুট পরানো হয়।
রাজা শাহ তাঁর তরুণী ভার্যাকে একটি বিরল সাংবিধানিক ভূমিকায় নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁকে সরকারি শাসকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ ছিল যদি যুবরাজ ২১ বছর বয়স হওয়ার আগে মারা যান তবে রাজ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন রানি ফরাহ।
আমেরিকা, ইজ়রায়েল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে আবার ইরানের রাজপরিবারের ইতিহাসের দিকে নজর ঘুরেছে কৌতূহলীদের। ১৯৭৮-৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবের সাক্ষী হন ইরানের মানুষ। এই বিপ্লবের ফলে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানি রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। রাতারাতি শিয়া কট্টরপন্থী ধর্মীয় একটি দেশে পরিণত হয় পারস্য উপসাগরের কোলের রাষ্ট্র। পহলভী রাজবংশের শাসক শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভীকে সরিয়ে খোমেইনির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে ইসলামিক রিপাবলিক সরকার।
শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভীর বাবা রেজ়া শাহের হাত ধরে ইরানে ক্ষমতায় আসে পহলভী রাজবংশ। সেই সময় ব্রিটিশেরা তাঁকে প্রচুর সাহায্য করেছিল। ১৯৪১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন রেজ়া শাহ। আবার ইরানের ক্ষমতা যায় ব্রিটেনের হাতে। কিন্তু ইরানের শাসনভার কার হাতে দেওয়া যায়, তা নিয়ে সেই সময় মিত্রবাহিনীর মধ্যেই টানাপড়েন ছিল। শেষ পর্যন্ত রেজ়া শাহের পুত্র রেজ়া পহলভিকে সিংহাসনে বসানো হয়। দেশছাড়া হতে হয় রেজ়া শাহকে।
আরও পড়ুন:
রেজ়া পহলভী যখন সিংহাসনে বসেন তখন তাঁর বয়স ২২। ইরানে তখন সমান্তরাল দুই শক্তির শাসন চলত। রাজবংশ থাকলেও নির্বাচিত সরকারের কাঁধে ইরানের শাসনভারের দায়িত্ব ছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় শাহ পরিবার ইরান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। প্রাণ বাঁচাতে তড়িঘড়ি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আশ্রয় নেয় রেজ়া পহলভী ও তাঁর পরিবার। ফরাহ ছিলেন ইরানের পহলভী বংশের শেষ রাজবধূ।
১৯৩৮ সালের ১৪ অক্টোবর তেহরানে একটি উচ্চবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফরাহ দিবা। তেহরানের বেশ কয়েকটি সুপরিচিত স্কুলে তিনি পড়াশোনা করেন। যেমন ইটালীয় স্কুল, ফরাসি জিন ডি’আর্ক স্কুল এবং পরে লাইসি রাজি। পড়াশোনায় আগ্রহের কারণে তিনি বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি প্যারিসের ইকোল স্পেসিয়াল ডি’আর্কিটেকচারে স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। অসাধারণ সুন্দরী এবং প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন ফরাহ।
প্যারিসে থাকাকালীন তাঁর জীবন নাটকীয় ভাবে পরিবর্তিত হয়। ১৯৫৯ সালে প্যারিসে পড়াকালীন ইরানি শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইরানি দূতাবাসে রেজ়া পহলভীর সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। এই সাক্ষাতের ফলে একই বছরের শেষের দিকে তাঁদের বিয়ে হয়। ২১ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ সালে শাহ রেজ়া পহলভীকে যখন ফরাহ বিয়ে করেন তখন তাঁর মাত্র ২১ বছর বয়স।
এই রাজকীয় বিবাহ আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। অনুষ্ঠানের জন্য রেজ়া তাঁর স্ত্রীকে বিখ্যাত গোলাপি হিরে বসানো ‘নূর-উল-আইন’ নামের মুকুটটি উপহার দিয়েছিলেন। মুকুটটির ওজন ২ কেজি। ভারতের গোলকোন্ডা খনি থেকে পাওয়া ৬০ ক্যারেটের হিরে বসানো এই টায়রাটি নজর কেড়েছিল বিশ্ববাসীর। ১৯৬৭ সালে যখন সম্রাজ্ঞী হিসাবে ফরাহের অভিষেক করা হয়, তখন ১,৪৬৯টিরও বেশি হিরেখচিত একটি মুকুট গোপনে তৈরি করা হয়েছিল। পারস্যের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মিশেলে নকশা করা মুকুটটি পারস্যের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।
আরও পড়ুন:
অসামান্য সৌন্দর্য এবং মার্জিত উপস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলিতে প্রায়শই তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি জ্যাকলিন কেনেডির সঙ্গে তুলনা করা হত। কেনেডির মতোই ফরাহ তাঁর নিজস্ব ফ্যাশন সচেতনতা এবং রুচিশীলতার মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত হয়েছিলেন। ফরাহ এমন এক নারী ছিলেন যিনি তাঁর রাজকীয় ভাবমূর্তি এবং আধুনিক মনস্কতা দিয়ে ইরানের ঐতিহ্য ও প্রগতিশীলতা মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
ইরানের আধুনিক ইতিহাসে ফরাহ শুধুমাত্র সম্রাজ্ঞীর ভূমিকাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। রেজ়ার তৃতীয় স্ত্রীকে ইরানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অন্যতম হোতা বলে মনে করেন অনেকে। সম্রাজ্ঞী হিসাবে তিনি ইরানের প্রগতিশীল ভাবমূর্তি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ইরানকে একটি আধুনিক ও উদার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে সাহায্য করেছিল। তিনি কেবল রাজপ্রাসাদে আবদ্ধ না থেকে ইরানের সাংস্কৃতিক দূত হিসাবে দেশের শিক্ষা, শিল্প এবং নারীদের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালের ২৫ অক্টোবর রাজ্যাভিষেক হয় তাঁর। কুর্সিতে থাকাকালীন তেহরানে পশ্চিমি সংস্কৃতি আমদানি করে আমেরিকার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। মহম্মদ রেজ়া শাহ পহলভীর সময় ইরানি তরুণীদের কখনও পর্দার আড়ালে থাকতে হয়নি। বরং যথেষ্ট স্বাধীন ভাবে ঘোরাফেরা করতে পারতেন তাঁরা। এর পিছনে বড় ভূমিকা ছিল সম্রাজ্ঞী ফরাহের, এমনটা মনে করেন অনেকেই।
তেহরান মিউজ়িয়াম অফ কনটেম্পোরারি আর্ট নামের শিল্পসংস্থাটি প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রধান ভূমিকা ছিল। তিনি পাবলো পিকাসো ও অ্যান্ডি ওয়ারহলের মতো শিল্পীদের বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকলা সংগ্রহ করেছিলেন ইরানে।
রাজবধূ হয়েও সক্রিয় ভাবে স্বাস্থ্যসেবা, নারীর অধিকার এবং সমাজকল্যাণ কর্মসূচি প্রচার করেছিলেন ফরাহ। তাঁর প্রভাবে সাক্ষরতার উন্নতি, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জনস্বাস্থ্য বৃদ্ধির মতো সামাজিক পরিকল্পনাগুলি গতি লাভ করে। তাঁর প্রচারের ফলে ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অটুট রেখে আধুনিক সামাজিক সংস্কারের ধারণা পাল্টে দিয়েছিলেন শাহবানু ফরাহ।
ফরাহ এবং রেজ়া পহলভীর পরিবার যেমন আভিজাত্যে ঘেরা ছিল, তেমনই তাঁদের সন্তানদের জীবনে ছিল উত্থান-পতন, ব্যক্তিগত টানাপড়েন। রেজ়া পহলভী ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর এক কন্যাসন্তান রয়েছে। ফরাহের গর্ভে চার সন্তান জন্মায়। এই দম্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজ়া পহলভী ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। পরে ইরানের যুবরাজ বলে পরিচিত হন তিনি। বর্তমানে তাঁকে পহলভী পরিবারের প্রধান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আপাতত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন যুবরাজ রেজ়া।
শাহ রেজ়া ও ফরাহের জ্যেষ্ঠা কন্যা ফরাহনাজ় পহলভী। রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো জনসমক্ষে খুব একটা উপস্থিত না থেকে তিনি বরাবরই নিজেকে অন্তরালে রাখতে পছন্দ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে নিভৃতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। আলি রেজ়া পহলভী ছিলেন শাহ ও ফরাহের কনিষ্ঠ পুত্র। মেধাবী আলি রেজ়া প্রাচীন ইরানি ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ২০১১ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে বস্টনে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, পহলভীর পরিবারের জন্য যা এক অপূরণীয় ক্ষতি।
পহলভী পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান রাজকুমারী লায়লা তাঁর রূপ ও গুণের জন্য পরিচিত ছিলেন। নির্বাসন এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপড়েনের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকাল লড়াই করেছিলেন বলে জানা যায়। ২০০১ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে লন্ডনের একটি হোটেলের কক্ষে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবনের কারণে তাঁর অকালমৃত্যু ঘটে। পুত্র-কন্যার অকালমৃত্যু রাজপরিবারে ধাক্কা দিলেও আজও পরিবারের কথা, ইরানের শাসনব্যবস্থা নিয়ে কলম থামেনি অশীতিপর বিস্মৃত রানির।
ইরান ত্যাগ করার পর, নির্বাসনকালে মিশর, মরক্কো, বাহামা, মেক্সিকো এবং পানামার মতো বেশ কয়েকটি দেশে বসবাস করেছিলেন রানি। ১৯৮০ সালে শাহ রেজ়া মিশরে মারা যান। মাতৃভূমি ত্যাগের কয়েক দশক পরেও ফরাহ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন রাজকীয় সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করে চলেছেন। পশ্চিম এশিয়া জুড়ে চলা সংঘাতের মাঝেও নিয়মিত ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে চলেছেন এবং ‘মুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের’ ধারণার প্রতি তাঁর সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করে চলেছেন ইরানের শেষ সম্রা়জ্ঞী।