ট্রাম্পের ‘ঘাড়ে বন্দুক রেখে’ শত্রুদের খতম! পারস্যে শান্তি এলে আমেরিকার ‘বিশ্বাস’ ভাঙবেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী?
দেড় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে মরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি, লেবাননেও ইজ়রায়েল-হিজ়বুল্লা লড়াইয়ে সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের শান্তি আনার প্রক্রিয়ায় কি জল ঢালবে ইহুদিরা?
ইজ়রায়েল-লেবানন যুদ্ধে আপাতত ইতি। দুই প্রতিবেশীর লড়াইয়ে ১০ দিনের সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও দু’পক্ষের গোলা-গুলি কত ক্ষণ বন্ধ থাকবে, তা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মনে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। তাঁদের দাবি, এ ব্যাপারে ফের এক বার ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে ধোঁকা খেতে পারেন ট্রাম্প। কারণ, কোনও অবস্থাতেই হামলা বন্ধ রাখা তেল আভিভের জন্য স্বস্তিজনক নয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কথায়, চলতি বছরে ইরান যুদ্ধের গোড়া থেকেই আমেরিকাকে ‘তুরুপের তাস’ হিসাবে ব্যবহার করে আসছেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাঁধে বন্দুক’ রেখে এক এক করে আরব দুনিয়ার শত্রুদের চিরতরে সরিয়ে ফেলাই যেন তাঁর লক্ষ্য। অনেকের ধারণা, উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ‘বৃহত্তর ইজ়রায়েল’ (গ্রেটার ইজ়রায়েল) তৈরি করতে চাইছেন তিনি। অন্য দিকে তেহরানের রণক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা খুঁজে পেতে একরকম মরিয়া হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটন।
অতীতেও বহু বার ইহুদিদের ‘বিশ্বাসভঙ্গের’ জেরে আন্তর্জাতিক স্তরে মুখ পুড়েছে আমেরিকার। উদাহরণ হিসাবে, ২০২৩ সাল থেকে চলা গাজ়া যুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। গত বছরের (২০২৫ সাল) অক্টোবরে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হয় তেল আভিভ। কিন্তু, তার পরেও ভূমধ্যসাগরের কোলের ওই ভূখণ্ডে চোরাগোপ্তা বিমানহামলা চালানো বন্ধ করেনি নেতানিয়াহুর ফৌজ।
একই কথা ইরানের ক্ষেত্রেও সত্যি। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনে তেহরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ইজ়রায়েল। লড়াই চলাকালীন সাবেক পারস্যের একাধিক পরমাণুকেন্দ্রে হামলা চালায় ইহুদি বিমানবাহিনী। যদিও তাতে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি তেল আভিভ। কারণ, পাহাড়ের মধ্যে বিশেষ ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের কাজ চালাচ্ছিলেন সাবেক পারস্যের সেনা কমান্ডার ও প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। আর তাই সংঘাতের শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে রণাঙ্গনে টেনে আনেন নেতানিয়াহু।
ইরানের পরমাণু হাতিয়ার নির্মাণের স্বপ্ন চিরতরে শেষ করতে ওই সময় তাদের গুপ্তঘাঁটিতে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ফেলে মার্কিন বিমানবাহিনী। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘জিবিইউ-৫৭ এ/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ বা এমওপি। এর জন্য পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানকে লড়াইয়ের ময়দানে নামায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলার পর তেহরানের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ফলে সাবেক পারস্যের সঙ্গে আর কখনওই সরাসরি যুদ্ধ হবে না বলে মনে করেছিল বিশ্ব।
আরও পড়ুন:
কিন্তু, সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষবিরতিতে একেবারেই খুশি ছিলেন না নেতানিয়াহু। ফলে ক্রমাগত ইরান আক্রমণের জন্য আমেরিকাকে উস্কানি দিতে থাকেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, এ ব্যাপারে ট্রাম্পের সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে বার বার হোয়াইট হাউস সফর করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সূত্রের খবর, তাঁর প্রভাব এড়াতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে গত বছরের (২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে এ ব্যাপারে এক রকম সবুজ সঙ্কেত দিয়ে ফেলেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)।
ট্রাম্পের অনুমতি মিলতেই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ফৌজকে সঙ্গে নিয়ে ইরান আক্রমণ করে বসে নেতানিয়াহুর বিমানবাহিনী। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আরব দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাউনিগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরানের আধাসেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। এর জেরে গোটা পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধ। যদিও এখনও পর্যন্ত তাতে সরাসরি যোগ দেয়নি কোনও আরব রাষ্ট্র।
ইরান যুদ্ধ চলাকালীনই লেবাননের প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লাকে নিকেশ করার ছক কষেন নেতানিয়াহু। ইহুদি প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, পর্দার আড়ালে থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই তাদের মদত দিয়ে যাচ্ছে তেহরান। অতীতেও বেশ কয়েক বার তেল আভিভে রকেট হামলা চালাতে দেখা গিয়েছে তাদের। সাবেক পারস্যে যৌথ অভিযান শুরু হওয়ায় আইআরজিসির পক্ষে হিজ়বুল্লাকে সাহায্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি হননি নেতানিয়াহু, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবলে বসে যুযুধান তেহরান ও ওয়াশিংটন। ইসলামাবাদে চলা সেই শান্তিবৈঠক অবশ্য ব্যর্থ হতে বেশি সময় লাগেনি। আলোচনা চলাকালীনই লেবাননে আক্রমণের ঝাঁজ বৃদ্ধি করে ইহুদি বিমানবাহিনী। এ ব্যাপারে নেতানিয়াহু সরকারের যুক্তি হল, সাবেক পারস্যে লড়াই থামানোর জন্য শান্তিবৈঠক হচ্ছে। তার সঙ্গে বেইরুটের সংঘর্ষের কোনও সম্পর্ক নেই।
আরও পড়ুন:
পাকিস্তান অবশ্য ইজ়রায়েলের এই দাবি মানতে চায়নি। ইসলামাবাদের বক্তব্য হল, গোটা পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষ থামানোর জন্যই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে তারা। অন্য দিকে এ ব্যাপারে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ইহুদিরা। কারণ, শান্তিবৈঠক চলাকালীন তেল আভিভের ব্যাপারে আচমকাই সমাজমাধ্যমে ‘বিতর্কিত’ পোস্ট করে বসেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজ়া আসিফ। সেখানে ইজ়রায়েলকে ‘ক্যানসার রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
ফলে ‘ইসলামাবাদ টক্স’ চলাকালীন লেবাননে বিমানহামলা বন্ধ করেননি নেতানিয়াহু। ইহুদিদের ‘এয়ার স্ট্রাইকে’ সেখানে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে মৃতের সংখ্যা। গত ১৬ এপ্রিল দু’তরফে ১০ দিনের সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ফলে আপাতত বেইরুটের আকাশে থেমেছে ইজ়রায়েলি লড়াকু জেটের গর্জন। যদিও দীর্ঘ সময়ের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথা মেনে চলা তেল আভিভের পক্ষে বেশ কঠিন। এর নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া সংঘর্ষবিরতিতে ‘হাতে চাঁদ’ পাচ্ছে হিজ়বুল্লা। ইহুদি বিমানবাহিনীর হামলায় তাঁদের সামরিক পরিকাঠামো একরকম গুঁড়িয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া একাধিক শীর্ষ নেতৃত্বকে হারিয়েছে প্যালেস্টাইনপন্থী এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। লড়াই থামতেই পুরনো ক্ষত মেরামতির সুযোগ পাবে তারা। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই নতুন উদ্যমে ফের ইহুদিভূমিতে আক্রমণের ছক কষতে পারে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র সংগঠন। তাদের সেই সুযোগ কিছুতেই দিতে রাজি নন নেতানিয়াহু।
দ্বিতীয়ত, ইহুদিরাষ্ট্রের পক্ষে ইরান যুদ্ধ থামানোও বেশ কঠিন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধিতে ১০ দফা শর্ত রেখেছে তেহরান। এর মধ্যে একটি হল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি। নেতানিয়াহু ভাল করেই জানেন পরমাণু হাতিয়ার তৈরির লক্ষ্যে এই কাজ করতে চাইছে সাবেক পারস্যের আইআরজিসি। আর সংশ্লিষ্ট ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ হাতে চলে এলে তাঁদের প্রথম লক্ষ্য হবে তেল আভিভ, যা সমগ্র ইজ়রায়েলের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে।
অন্য দিকে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে সই করতে তিনি নিজেই যেতে পারেন ইসলামাবাদ। তাঁর দাবি, যাবতীয় ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়েছে তেহরান। যদিও তাঁর এই মন্তব্য পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে পারস্য উপসাগরের ওই শিয়া মুলুক। ফলে এই ধোঁয়াশা মেনে নিয়ে ইজ়রায়েলের পক্ষে চুপ করে থাকা অসম্ভব।
পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউরেনিয়ামের ব্যাপারে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহম্মদ বাকের কালিবাফের এক ঘনিষ্ঠ সূত্রকে উল্লেখ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম লিখেছে, ‘‘কোনও ধরনের পারমাণবিক উপাদান আমেরিকার হাতে দেওয়া হবে, এ ধরনের কোনও আলোচনাই হয়নি!’’ শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং’ ট্রাম্পের দাবিকে উপহাস করেছে। তাদের দাবি, ‘অলীক স্বপ্ন’ দেখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
পাকিস্তান সূত্রে আবার খবর, খুব দ্রুত ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হবে আমেরিকার। আগামী দু’মাসের মধ্যে দু’তরফে স্থায়ী চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা এবং অ্যারিজ়োনা সফরে যান ট্রাম্প। ওই সফরের আগে হোয়াইট হাউসের সাউথ লন দিয়ে ‘মেরিন ওয়ান’ (মার্কিন প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার)-এর দিকে যেতে যেতে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন তিনি। বলেন, ‘‘তেহরান চুক্তি চায়।’’ পাশাপাশি, সংঘর্ষবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি হলে যুদ্ধজয়ের কথা বলে প্রচারে নামতে পারে তেহরান। তা ছাড়া সে ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলিতে সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের উপর চাপ তৈরি করতে পারে আইআরজিসি। ফলে নতুন করে বিমানহামলা চালিয়ে পরিস্থিতি জটিল করা নেতানিয়াহুর পক্ষে অনেকটাই সহজ। পাশাপাশি, ট্রাম্পকে দলে টানার কৌশল বেশ ভালই জানা আছে তাঁর।
ইরান যুদ্ধের জেরে ইজ়রায়েলের অভ্যন্তরে বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উৎসাহ আছে ইহুদি দক্ষিণপন্থীদের। তাঁদের যুক্তি, এই সুযোগে লেবাননের একটা বড় অংশ কব্জা করতে পারে তেল আভিভ। ২০২০ সালে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় আরব দুনিয়ার বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তিতে সই করে ইহুদিরাষ্ট্র। তার পরেও যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো বিদেশনীতি যে তারা পরিচালনা করেছে, এমনটা নয়।