সংসদের জটিল সমীকরণে এক ভোটে ক্ষমতা হারায় বাজপেয়ী সরকার! ফিরে দেখা ১৯৯৯ সালের সেই বিরল রাজনৈতিক দিন
অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সাফল্য প্রশ্নাতীত। তবে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বাজপেয়ীকে এমন এক প্রধানমন্ত্রী হিসাবেও মানুষ মনে রেখেছেন, যিনি মাত্র এক ভোটে সংসদের আস্থা হারিয়েছিলেন।
অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী। তিন বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। আপাদমস্তক ভদ্র এবং নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন বাজপেয়ী।
বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সাফল্য প্রশ্নাতীত। তবে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বাজপেয়ীকে এমন এক প্রধানমন্ত্রী হিসাবেও মানুষ মনে রেখেছেন যিনি মাত্র এক ভোটে সংসদের আস্থা হারিয়েছিলেন।
রাজনীতির দুনিয়ায় বিরল এই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৯ সালে। মাত্র এক ভোটে আস্থা প্রস্তাবে হেরে যান প্রয়াত বিজেপি নেতা তথা দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী। ২৭ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট লোকসভায় আস্থা প্রস্তাবের সম্মুখীন হয়ে কী ভাবে মাত্র এক ভোটে হেরেছিল? নেপথ্যে ছিল কোন রহস্য?
নথি অনুযায়ী ১৯৯৯ সালের ১৭ এপ্রিল অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকার মাত্র এক ভোটে (২৬৯-২৭০) সংসদের আস্থা হারিয়েছিল। প্রথম বার ক্ষমতাগ্রহণের ১৩ দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বাজপেয়ী। তবে তিনি ভাল করেই জানতেন, লোকসভায় তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকার টিকিয়ে রাখতে জোটসঙ্গীদের সমর্থন দরকার। সমর্থন সরলে গদিচ্যুত হতে হবে তাঁকে।
১৯৯৮ সাল। জনতা দল সরকারের পতনের পর ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগাম লোকসভা নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের জন্য এনডিএ গঠন করে বিজেপি, যা ছিল এআইএডিএমকে, এসএপি, বিজেডি এবং এসএডি-সহ বিভিন্ন দলের একটি নির্বাচন-পূর্ব জোট।
আরও পড়ুন:
জোটটি ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৫৯টি আসনে জয়লাভ করে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি হলেও যথেষ্ট ছিল না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য, তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি), ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোক দল (আইএনএলডি), অরুণাচল কংগ্রেস (এসি) এবং ৩ জন নির্দল প্রার্থীকে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এনডিএ-তে যোগ দিতে রাজি করায় বিজেপি।
দু’জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সাংসদকে মনোনীত করে বিজেপি। এনডিএ-র তখন ৫৪৫টি আসনের মধ্যে ২৮২ জন সাংসদ ছিল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭৩ আসনের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ ভাবেই তারা প্রাথমিক আস্থা ভোটে টিকে যায়।
বিজেপি লোকসভার স্পিকারের মর্যাদাপূর্ণ পদের প্রস্তাব দিয়ে টিডিপি-কে নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়। অমলাপুরম থেকে টিডিপির সাংসদ গান্তি মোহনা চন্দ্র বালাযোগী স্পিকার নির্বাচিত হন এবং এনডিএতে যোগ দেয় টিডিপি।
এআইএডিএমকে-র ‘ক্যারিশম্যাটিক’ দাপুটে নেত্রী জয়ললিতা বুঝতে পেরেছিলেন যে এনডিএ সরকারের টিকে থাকা তাঁর দলের ১৮ জন সাংসদের উপর নির্ভর করছে। তিনি ‘কিংমেকার’ হিসাবে তাঁর অবস্থানকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে তাঁর দলের জন্য ছ’টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা আদায় করে নেন।
আরও পড়ুন:
একই সময়ে জম্মু এবং কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স (জেকেএনসি)-এর অন্তর্ভুক্তিতে এনডিএ অন্যত্রও শক্তিশালী হয়। জেকেএনসি-র অন্তর্ভুক্তি একটি বড় সাফল্য ছিল এনডিএ জোটের জন্য। কারণ ৩৭০ ধারা বাতিলের জন্য বিজেপির দীর্ঘ দিনের দাবি একটি বিবাদের বিষয় ছিল।
১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গম, চাল, চিনি, ইউরিয়া এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপের প্রতিবাদে এনডিএ জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায় আইএনএলডি। টালমাটাল অবস্থা হয় এনডিএ-র।
এনডিএ-র মোট আসনসংখ্যা ২৮০-তে নেমে আসে এবং জোটে এআইএডিএমকের জয়ললিতার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এর মধ্যে শোনা যায়, এআইএডিএমকে-র সাধারণ সম্পাদক জয়ললিতা ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছিলেন যে, যদি তামিলনাড়ু সরকারকে বরখাস্ত করার দাবি পূরণ না করা হয়, তা হলে তিনি এনডিএ জোট থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবেন।
বিজেপিও জয়ললিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তিনি একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে বিচার এড়ানোর জন্যই এই দাবিগুলো করছেন। শেষমেশ কোনও সমঝোতায় পৌঁছোনো সম্ভব হয়নি।
রাজনীতিবিদদের অনেকে বলেন, এআইএডিএমকে-এর নেত্রী জয়ললিতা সেই বছরের ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত দলীয় সভায় তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর মুখোমুখি হন এনডিএ সরকার পতনের জন্য হাত মেলাতে।
ঠিক ১৫ দিন পর বাজপেয়ী সরকারের পতন ঘটাতে নয়াদিল্লিতে ফিরে আসেন জয়ললিতা। ১৪ এপ্রিল, তামিল নববর্ষের দিনে, জয়ললিতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কেআর নারায়ণনের সঙ্গে দেখা করে বাজপেয়ী সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের একটি চিঠি দেন। জয়ললিতা জোট থেকে সমর্থন সরিয়ে নেওয়ার পর সংসদে আস্থা ভোটের সম্মুখীন হতে হয় বাজপেয়ী সরকারকে।
তবে ১৯৯৯ সালের ১৭ এপ্রিল ভোটাভুটিতে পরিস্থতি এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছোয় যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জোট সরকারের প্রয়োজন ছিল মাত্র একটি ভোট। লোকসভার নিয়ম অনুযায়ী, স্পিকার কোনও প্রস্তাবে ভোট দিতে পারেন না, যদি না ভোটের ব্যবধান সমান হয়। সে ক্ষেত্রে তিনি ‘টাই-ব্রেকিং’ ভোট দিতে পারেন।
বাজপেয়ীর জয়ী হওয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল। বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) তাদের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে আশ্বাস দিয়েছিল যে বাজপেয়ীর পক্ষে ভোট দেবে তারা। কিন্তু আস্থা ভোটের ঠিক আগে, লোকসভায় বিএসপি নেত্রী মায়াবতী উঠে দাঁড়িয়ে বলেন যে তাঁর দল বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেবে।
ভোটগ্রহণের শেষ মুহূর্তে, অরুণাচল পূর্বের এসি দলের সাংসদ ওয়াংচা রাজকুমার, বারামুল্লার জেকেএনসি সাংসদ সইফুদ্দিন সোজ এবং পেরিয়াকুলামের এডিএমকে সাংসদ এসআর মুথিয়াও সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে ক্রস-ভোটিং করেন।
বিতর্কের মূল বিষয় ছিল কোরাপুট লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সাংসদ গিরিধর গামাং-এর ভোটাধিকার। সেই সময় তিনি লোকসভার আসনটি ধরে রেখেই ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেছিলেন।
এনডিএ দাবি করেছিল যে, গামাংকে ভোটদানের অযোগ্য ঘোষণা করা হোক। এক উত্তপ্ত বিতর্কের পর স্পিকার রায় দেন যে, গামাং ভোট দেওয়ার যোগ্য। কারণ, তিনি তখনও ওড়িশা বিধানসভায় কোনও আসন জেতেননি এবং সে কারণে আপাতত তাঁর লোকসভার আসনটি ধরে রাখার অধিকার রয়েছে। গিরিধর গামাং-এর ভোটও এনডিএ-র বিরুদ্ধে পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।
ভোটগ্রহণের জন্য যে ইলেকট্রনিক সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছিল সেখানেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। বোর্ডে দেখানো হচ্ছিল যে বাজপেয়ী আস্থা ভোটে হেরে গিয়েছেন। কিন্তু প্রথমে সংখ্যার হিসাব মিলছিল না। এর পর সদনের স্পিকারকে সেই সব সাংসদদের দেওয়া চিরকুটের ভোটও অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছিল, যাঁদের সিস্টেম কাজ করছিল না। চূড়ান্ত ভোটগণনায় সব সংখ্যা মিলে গেলে দেখা যায় এনডিএ ২৬৯ এবং বিরোধী শিবির ২৭০টি ভোট পেয়েছে। মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে বাজপেয়ী সরকারের পতন ঘটে।
তবে তৎকালীন বৃহত্তম বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সনিয়া গান্ধী লোকসভায় কার্যকরী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট বড় কোনও জোট গঠন করতে পারেননি। মুলায়ম সিং বা জয়ললিতা কেউই তাঁকে সমর্থন করেননি। বরং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসার জন্য নামপ্রস্তাব করা হয়। কিন্তু তিনিও এই পদ প্রত্যাখ্যান করেন।
তাই অনাস্থা প্রস্তাবের পর পরই রাষ্ট্রপতি কেআর নারায়ণন সংসদ ভেঙে দেন এবং নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানান। সে বছরের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অটলবিহারী বাজপেয়ী তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
১৯৯৯ সালের ১৩ অক্টোবর এনডিএ জোট সরকারের প্রধান হিসাবে দ্বিতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বাজপেয়ী। ১৯৯৬ সালে অল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। জওহরলাল নেহরুর পর তিনিই পর পর দু’বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।