তিন অস্বস্তি, তবু ভারত-আতঙ্কেই কি ইসলামাবাদকে ‘সহ্য’ করছে ড্রাগন? অস্ত্র করছে আড়াই হাজার বছর আগের এক বইকে?
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় সরাসরি সামরিক সাহায্য থেকে শুরু করে পর্দার আড়ালে থেকে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন। মার্কিন-প্রীতি সত্ত্বেও কেন পাকিস্তানকে চটাতে পারছে না চিন?
কৌশলগত সড়ক প্রকল্প থমকে যাওয়া থেকে শুরু করে একের পর এক শ্রমিক খুন। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো হঠাৎ করেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নয়নের মণি’ হয়ে উঠেছেন সেনাসর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এক কথায় ‘লৌহবন্ধু’ পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে নাজেহাল চিন। কিন্তু, শত সমস্যাতেও ইসলামাবাদের হাত ছাড়তে নারাজ বেজিং। এর কারণ ব্যাখ্যায় একটি কথাই বলছেন বিশ্লেষকেরা। সেটা হল, ‘ভারতের ভয়’!
দুঁদে কূটনীতিক থেকে এ দেশের সাবেক সেনাকর্তাদের প্রায় সকলেই মনে করেন, এশিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম ‘সুপার পাওয়ার’ হয়ে উঠতে চাইছে চিন। বেজিঙের চোখে সেই রাস্তায় সবচেয়ে বড় কাঁটা হল ভারত। ড্রাগনের আশঙ্কা, একদিন তাদের আধিপত্যকে কড়া চ্যালেঞ্জ জানাবে নয়াদিল্লি। তখন পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর সঙ্গে এঁটে ওঠা কঠিন হতে পারে। আর তাই পাকিস্তানকে ‘বোড়ে’ হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন মান্দারিনভাষীরা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চিন মনে করে এক জঙ্গলে দুটো সিংহ কখনওই থাকতে পারে না। সেই কারণে ভারতের উন্নতি বেজিঙের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া জম্মু-কাশ্মীরে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদের সঙ্গে যুদ্ধে নয়াদিল্লি শক্তিক্ষয় করলে আখেরে লাভ হবে ড্রাগনের। আর তাই পর্দার আড়ালে থেকে পাকিস্তানকে লাগাতার মদত জুগিয়ে যাচ্ছেন সেখানকার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
কয়েকটি উদাহরণের সাহায্যে সেটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। গত বছর (২০২৫ সাল) পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি হামলায় জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে প্রাণ হারান পর্যটক-সহ ২৬ জন নিরীহ নাগরিক। এই ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় ইসলামাবাদের ভিতরে সামরিক অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের গুপ্তঘাঁটিগুলিকে গুঁড়িয়ে দেয় ভারতীয় ফৌজ, যার পোশাকি নাম রাখা হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। সংশ্লিষ্ট অভিযান চলাকালীন চুপ করে থাকেনি পাক ফৌজও।
‘অপারেশন সিঁদুর’কে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাক ‘যুদ্ধ’ বাধলে খোলাখুলি ভাবে বেজিংকে পাশে পায় ইসলামাবাদ। তার আঁচ পেতে অবশ্য এ দেশের সেনাকর্তাদের বেশি সময় লাগেনি। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী কালে মুখ খোলেন ভারতের উপ-সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহুল আর সিংহ। তাঁর কথায়, ‘‘লড়াই চলাকালীন রাওয়ালপিন্ডির হাত শক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল ড্রাগন।’’
আরও পড়ুন:
‘সিঁদুর’-এর বর্ষপূর্তিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে চিনা ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস করে ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। হংকঙের গণমাধ্যমটির দাবি, লড়াই চলাকালীন যুদ্ধবিমানের মেরামতি এবং প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইসলামাবাদে বেশ কয়েক জন ইঞ্জিনিয়ার পাঠায় বেজিং। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ‘চেংডু এয়ারক্রাফ্ট ডিজ়াইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর কর্মী। ড্রাগনের লড়াকু জেট নির্মাণকারী সংস্থাগুলির মধ্যে এটি অন্যতম।
ভারত-পাক সংঘর্ষের এক বছরের মাথায় বেজিঙের সরকারি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন ওই ইঞ্জিনিয়ারদের কয়েক জন। পরে ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ সেটা ফলাও করে প্রকাশ করলে গোটা বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পাক বিমানবাহিনীর বহরে রয়েছে চেংডুর তৈরি জে-১০সি লড়াকু জেট। ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন এর বেশ কয়েকটি ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও সাক্ষাৎকারে সে কথা অস্বীকার করেন চৈনিক ইঞ্জিনিয়ারেরা।
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসাবে অবশ্যই বলতে হবে হাতিয়ার সরবরাহ। বর্তমানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ৮১ শতাংশই চিন থেকে আমদানি করছে পাকিস্তান। জে-১০সি ছাড়াও সেখানে রয়েছে জেএফ-১৭ থান্ডারের মতো লড়াকু জেট, পিএল-১৭ বিয়ন্ড ভিস্যুয়াল রেঞ্জ এয়ার টু এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র, এইচকিউ-৯পি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ফ্রিগেট শ্রেণির রণতরী ও ডুবোজাহাজ। ইসলামাবাদের শক্তিবৃদ্ধি যে ভারতের উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
শুধু তা-ই নয়, পাক ফৌজ ও গুপ্তচরবাহিনী আইএসআইয়ের (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকেও নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চিন। ২০০৯ সালে কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী ‘জইশ-ই-মহম্মদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মৌলানা মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষণায় উদ্যোগী হয় রাষ্ট্রপুঞ্জ। কিন্তু, বেজিঙের আপত্তিতে সেই প্রস্তাব পাশ হয়নি। একই ভাবে ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে এই প্রচেষ্টায় বাধা দেয় ড্রাগন।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চিনের এই ধরনের পদক্ষেপগুলির নেপথ্যে রয়েছে প্রাচীন যুগের কুশলী সেনানায়ক সান জ়ুর চিন্তাভাবনা। ৭৭১-২৫৬ খ্রিস্টপূর্ব মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে জীবিত ছিলেন তিনি। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’ পরবর্তী কালে জগদ্বিখ্যাত হয়ে যায়। ২১ শতকেও সান জ়ুর তত্ত্ব মেনেই বেজিং এগোচ্ছে বলে মনে করে ওয়াকিবহাল মহল। ড্রাগনের বিদেশনীতিতেও তার সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ করা গিয়েছে।
সান জ়ু মনে করতেন, প্রতারণা ছাড়া যুদ্ধজয় সম্ভব নয়। আর তাই শত্রুর মনে ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকত তাঁর। ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’-এ তিনি লেখেন, ‘‘আক্রমণের সক্ষমতা থাকলে শত্রুকে বুঝতে দাও যে আমরা অক্ষম। তবেই ভুল করবে প্রতিপক্ষ, যার সুযোগ নিয়ে জয় ছিনিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে।’’ তাঁর এই দর্শনের উপর ভিত্তি করেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে আজকের চিন, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
এ দেশের দুঁদে কূটনীতিকদের কথায়, আপাতদৃষ্টিতে বেজিঙের আচরণকে সহযোগিতামূলক এবং শান্তিপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু, সর্বদাই তাদের সেই ভাবমূর্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকে কোনও না কোনও ধূর্ত খেলা। এক কথায় কূটনৈতিক ভাবে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার অদ্ভুত কৌশল আয়ত্ত করেছে ড্রাগন। গোড়া থেকেই পাকিস্তানকে সামনে রেখে ভারতের ক্ষেত্রে তার সর্বাধিক প্রয়োগ করতে দেখা যাচ্ছে মান্দারিনভাষীদের।
তবে ইসলামাবাদকে দাবার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহারের খেসারতও বেজিংকে কম দিতে হচ্ছে, এমনটা নয়। দীর্ঘ দিন ধরেই শিনজ়িয়ান প্রদেশ থেকে শুরু করে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে দিয়ে বালোচিস্তানের গ্বদর বন্দর পর্যন্ত কৌশলগত সড়ক নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বেজিং। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পোশাকি নাম ‘চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর’ বা সিপিইসি, যাতে ইতিমধ্যেই কয়েক কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছে জিনপিং সরকার।
চিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের অন্তর্গত সিপিইসির কাজ শেষ করা দিন দিন বেজিঙের কাছে কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ, পাকিস্তানের বালোচিস্তানে মাথাচাড়া দিয়েছে বিদ্রোহ। ফলে প্রায়ই সেখানে আক্রমণের শিকার হচ্ছে ইসলামাবাদের সেনা কনভয়, পুলিশচৌকি বা সরকারি দফতর। পাশাপাশি, বেজিঙের শ্রমিকদেরও নিশানা করছে তারা।
দ্বিতীয়ত, ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী সময় থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাক সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল মুনিরের ‘গলায় গলায়’ বন্ধুত্বকেও যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখছে চিন। এ ব্যাপারে বেজিঙের উষ্মাও কূটনৈতিক মহলের চোখ এ়ড়ায়নি। অন্য দিকে সন্দেহ দূর করতে গত কয়েক মাসে ঘন ঘন ড্রাগনভূমিতে সফর করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বিদেশমন্ত্রীর মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
চিনের তৃতীয় অস্বস্তির জায়গায় রয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে লাগাতার পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসলামাবাদ। ফলে কখনও সীমান্তে পঠান যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়তে হয়েছে রাওয়ালপিন্ডিকে। কখনও আবার কাবুলে বোমাবর্ষণ করেছে পাক বাহিনী। পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়ে ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে জবাব দিয়েছেন সেখানকার তালিবান শাসকেরা।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তান। এর জেরে ইসলামাবাদকে ব্যবহার করে ভারতের শক্তি ক্ষয় করার চিনা ষড়যন্ত্র ভোঁতা হতে শুরু করে। ফলে তড়িঘড়ি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে দু’পক্ষের অশান্তি মেটানোর চেষ্টা চালায় বেজিং। যদিও তাতে সাফল্য পায়নি জিনপিং প্রশাসন।
প্রতিরক্ষা বাজেটের নিরিখে ভারতের থেকে চার গুণ এগিয়ে আছে চিন। পাশাপাশি, বিশ্বের বৃহত্তম নৌবহরের অধিকারী হল বেজিং। এ-হেন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির উন্নতি আটকাতে পাকিস্তানের মতো সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া রাষ্ট্রকে নিরন্তর ব্যবহার করে যাচ্ছে বেজিং। তাদের এই চালই ভবিষ্যতে বুমেরাং হবে না তো? উঠছে সেই প্রশ্নও।