উধাও হুঙ্কার, ‘পুষ্পা’ যেন নেতিয়ে যাওয়া পুষ্প! ২৪ দিনে কী ভাবে চুপসে গেলেন অভিষেক-ঘনিষ্ঠ ‘দাপুটে’ নেতা?
ফলতার ‘দাপুটে’ নেতা জাহাঙ্গিরের উত্থান কী ভাবে? কেমন ছিল রাজনৈতিক যাত্রা? অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান নাম হয়ে উঠেছিলেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগে ভোটের ময়দান ছাড়লেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। মঙ্গলবার ভোটপ্রচারের শেষ দিনে জাহাঙ্গিরের ঘোষণা, ‘‘আমি এই ভোটে লড়ছি না।’’
যদিও জাহাঙ্গিরের এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনও নির্দেশ রয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। তাঁর এই ঘোষণার পরেই তোলপাড় পড়েছে। অনেকে কটাক্ষও শুরু করেছেন ‘পুষ্পা’কে নিয়ে। কেউ মন্তব্য করেছেন, ‘গরমে পুষ্প পতন’, আবার অনেকে বলছেন, ‘পুষ্পা তো ঝুঁক গয়া।’
মঙ্গলবার সকালে সাংবাদিক বৈঠক করে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার কথা ঘোষণা করেন জাহাঙ্গির। বলেন, ‘‘ফলতার উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্যাকেজের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই জন্য ২১ মে যে পুনর্নির্বাচন আছে, সেই লড়াই থেকে আমি নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলাম।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি ফলতার ভূমিপুত্র। আমি চাইব ফলতা শান্তিতে থাকুক, সুস্থ থাকুক এবং ভাল থাকুক। ফলতায় আরও বেশি উন্নয়ন হোক।’’ গলা ধরে আসে সাদা শার্ট-কালো ট্রাউজার্স পরিহিত ‘পুষ্পা’র। তিনি বলেন, ‘‘আমার স্বপ্ন ছিল সোনার ফলতার। তাই আমাদের সম্মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ফলতার উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্যাকেজ দিচ্ছেন।’’
যদিও মনোনয়ন প্রত্যাহারের তারিখ পেরিয়ে গিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও ইভিএমে জাহাঙ্গিরের নামেই বোতাম থাকবে। প্রসঙ্গত, মঙ্গলবারই ফলতায় ‘রোড শো’ করছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। জাহাঙ্গিরের ঘোষণার পর গেরুয়া আবির নিয়ে উচ্ছ্বাসে মাতেন পদ্মশিবিরের কর্মী এবং সমর্থকেরা।
আরও পড়ুন:
ফলতার ‘দাপুটে’ নেতা জাহাঙ্গিরের উত্থান কী ভাবে? কেমন ছিল রাজনৈতিক যাত্রা? অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান নাম হয়ে উঠেছিলেন।
পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি থাকাকালীন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঘনিষ্ঠ’ জাহাঙ্গির ওয়াই ক্যাটেগরির নিরাপত্তা পেতেন। তবে ২০২২ সালে তা প্রত্যাহার করে নেয় নবান্ন। সেই সময় তাঁর নাম সংবাদের শিরোনামে আসে।
২০২২ সালে পুরসভা ভোটের আগে বজবজ পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে হাসিবা খাতুনের সমর্থনে প্রচার করেন জাহাঙ্গির। কিন্তু দলীয় নেতাদের স্বাক্ষর করা প্রার্থীতালিকায় নাম ছিল না হাসিবার। কী ভাবে বজবজে অনুমোদনহীন তালিকায় নাম থাকা প্রার্থীর হয়ে সমর্থনে প্রচার করতে পারেন জাহাঙ্গির? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সে সময়ে।
গত কয়েক বছর রাজ্য রাজনীতি, বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারের রাজনীতিতে রকেটগতিতে উত্থান হয়েছে জাহাঙ্গিরের। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে জাহাঙ্গিরকে ফলতার প্রার্থী করেছিলেন তৃণমূল নেতৃত্ব।
আরও পড়ুন:
এর পর বিধানসভা ভোটের আগে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মার নিয়োগের পর নতুন করে চর্চা শুরু হয় ‘পুষ্পা’কে নিয়ে। ফলতায় ভোটগ্রহণ ছিল ২৯ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফায়। কিন্তু ভোটের আগে থেকেই সংবাদের শিরোনামে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা।
ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা বনাম ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের মধ্যে ‘ঠান্ডা লড়াই’ শুরু হয়। আইপিএস অজয়পাল ‘বনাম’ তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের সেই ঠান্ডা লড়াই সে সময় প্রত্যক্ষ করেছিল রাজ্য। এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট অজয়পাল উত্তরপ্রদেশের আইপিএস। পুলিশকর্তা হিসাবে ভাবমূর্তির জন্য বড়পর্দার চরিত্র ‘সিংহম’-এর সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয় আদিত্যনাথের রাজ্যে। সেই অজয়পালের উদ্দেশে জাহাঙ্গির বলেছিলেন, ‘‘উনি সিংহম হলে আমিও পুষ্পা... ঝুঁকেগা নহি।’’
এর পরেই অজয়পাল বনাম জাহাঙ্গির তরজা নতুন মাত্রা পায়। খবরের শিরোনামে উঠে আসে ‘সিংহম’ এবং ‘পুষ্পা’র প্রতিটি পদক্ষেপ। এর পর দ্বিতীয় দফার ভোটের দিন আবার খবরে ভেসে ওঠে ফলতার নাম। ভোটের দিন ওই ফলতাতেই ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচন চেয়ে আবেদন যায় কমিশনের কাছে। কোন বুথে পুনর্নির্বাচন হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্ক্রুটিনি করে কমিশন।
শেষ পর্যন্ত গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হয় কমিশনকে। সিদ্ধান্ত হয়, ২১ মে ফলতার ২৮৫ ভোটকেন্দ্রে আবার ভোটগ্রহণ হবে। ভোটগণনা হবে ২৪ মে।
ভোট মিটতেই ফলতায় অশান্তি ছড়়িয়ে পড়ে। বিজেপি কর্মীদের উপর মারধরের অভিযোগে আবার উত্তপ্ত হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার ওই বিধানসভা এলাকা। উঠে আসে জাহাঙ্গিরের নাম।
এর পর ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৩ বিধানসভা আসনে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। ভূমিধস জয় হয় বিজেপির। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে গেরুয়া শিবির। সরকার গঠন করে বিজেপি। ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করেন শুভেন্দু অধিকারী।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে যে জাহাঙ্গিরকে ভোটপ্রচার করতে দেখা গিয়েছিল, এর পর থেকে তাঁকে আর ফলতা বিধানসভার প্রচারে দেখা যায়নি। অভিষেক শেষ দফা ভোটের আগে ‘পুষ্পা’র হয়ে প্রচার করেছিলেন। তবে বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর তিনি বা তৃণমূলের কোনও বড় নেতা জাহাঙ্গিরের হয়ে আর প্রচারে যাননি।
এমতাবস্থায় দিন কয়েক আগে ফলতার দলীয় কার্যালয়ে আসেন জাহাঙ্গির। বিধানসভা ভোটের আগে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পুলিশ পর্যবেক্ষক ‘সিংহম’ অজয়পাল শর্মাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজেদের ‘পুষ্পা’ বলা এই তৃণমূল নেতা জানান, তিনি মাথা নোয়াবেন না। লড়বেন।
এর মধ্যেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভায় পুনর্নির্বাচনের আগে শনিবার সেখানে সভা করেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডাকে এক লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জেতানোর আবেদনের পাশাপাশি, অভিষেক-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরকে তোপ দাগেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।’’
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ তোলেন, ২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসায় ১৯ জনকে ‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল’ ঘোষণা করেছিল মানবাধিকার কমিশন। তার মধ্যে জাহাঙ্গির এক জন। তিনি কটাক্ষ করে সভা থেকে বলেন, ‘‘ওই ডাকাতটা কোথায়, পুষ্পা না কী যেন নাম! যত অভিযোগ করেছে সাধারণ নির্বাচনের সময়, সবগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে। গুন্ডামি করতে দেব না। নিশ্চিন্ত থাকুন। সাদা থান বাড়িতে ফেলতে দেব না।’’
ফলতায় বিজেপি প্রার্থীর হয়ে প্রচার গিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। তাঁর মুখেও শোনা গিয়েছিল জাহাঙ্গিরের নাম। শমীক কটাক্ষ করে অভিষেককে তৃণমূল প্রার্থীর হয়ে প্রচার করতেও বলেন।
এর পর সোমবার কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন জাহাঙ্গির। গ্রেফতারি এড়াতে আদালতের কাছ থেকে রক্ষাকবচ নেন। মঙ্গলবার ভোটপ্রচারের শেষ দিনে ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির জানালেন তিনি আর এই ভোটের লড়াইয়ে নেই! অর্থাৎ, ঝুঁকেগা নহি বলে সেই ঝুঁকতেই হল ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গিরকে।