একটি ট্যাবলেটেই মানুষ বনে অতিমানুষ, দূর হয় খিদে, ক্লান্তি, ভয়, যন্ত্রণাও! কী এই ক্যাপ্টাগন? কতটা ভয়ঙ্কর এই ‘জিহাদি ড্রাগ’?
গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দর এবং দিল্লির নেব সরাই এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে মোট ২২৭.৭ কেজি ওজনের মাদক উদ্ধার করা হয়। সরকারি সূত্রে খবর, এই বিপুল পরিমাণ মাদক সিরিয়া থেকে আনা হয়েছিল এবং ভারতের মাটি ব্যবহার করে তা সৌদি আরব-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
শরীরে এক বার প্রবেশ করালেই মানুষ হয়ে যায় যন্ত্রবৎ। মুহূর্তে উধাও হয় ঘুম এবং খিদে। এর প্রভাবে দীর্ঘ সময় চোখের পাতা এক করার প্রয়োজন পড়ে না। শরীরে শক্তি যেন টগবগ করতে থাকে। মাদকটির পোশাকি নাম ক্যাপ্টাগন। এই মারাত্মক মাদক ব্যবহারে দূর হয় ক্লান্তি, খিদে, ভয়, যন্ত্রণাও।
পশ্চিম এশিয়ায় চরমপন্থী গোষ্ঠী, সশস্ত্র সংগঠনগুলিতে এই মাদকের ব্যবহার ব্যাপক। সদস্যদের ব্যবহারের পাশাপাশি দুনিয়া জুড়ে এর পাচার করে বিপুল অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে। সিরিয়া, ইরাকের সশস্ত্র সংগঠন ও আইসিসের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলির যোদ্ধাদের মধ্যে এর ব্যাপক ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলি একে ‘জিহাদি মাদক’ বলে উল্লেখ করে।
এ বার সেই মাদকের সন্ধান মিলল ভারতেও। ভারতে প্রথম উদ্ধার হয়েছে ‘জিহাদি ড্রাগ’ নামে পরিচিত ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেট। ‘অপারেশন রেজপিল’-এর মাধ্যমে ১৮২ কোটি টাকার মাদক বাজেয়াপ্ত করেছে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি)। এমনটাই দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘‘আমাদের তদন্তকারী সংস্থাগুলি বিশেষ একটি অভিযানের মাধ্যমে ১৮২ কোটি টাকার ক্যাপ্টাগন বা জিহাদি ড্রাগ বাজেয়াপ্ত করেছে। পশ্চিম এশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে এই মাদক আনার অভিযোগে এক বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতির এটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’’
প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, এই বিপুল পরিমাণ মাদক সিরিয়া থেকে আনা হয়েছিল এবং ভারতের মাটি ব্যবহার করে তা সৌদি আরব-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কন্টেনার এবং চায়ের প্যাকেটের ভিতরে এই মাদক লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দর এবং দিল্লির নেব সরাই এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে মোট ২২৭.৭ কেজি ওজনের এই মাদক উদ্ধার করা হয়।
আরও পড়ুন:
ভারতে ঢোকা প্রতি গ্রাম মাদক এবং ট্রানজ়িট রুট হিসাবে ভারতকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার, এমনটাই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে এনসিবির (নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো) সাহসী পদক্ষেপের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।
ক্যাপ্টাগন হল ফেনেটিলিনের প্রচলিত নাম। এটি একটি কৃত্রিম উদ্দীপক। মূলত ৬০-এর দশকে অতিসক্রিয়তা (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজ়অর্ডার বা এডিএইচডি), বিষণ্ণতা এবং নারকোলেপ্সির মতো রোগের চিকিৎসার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। আসক্তি ও অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কারণে ১৯৮০ সালে ওষুধটি আন্তর্জাতিক ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী কালে এটিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাইকোট্রপিক পদার্থ বিষয়ক কনভেনশনের দ্বিতীয় তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তুলনামূলক ভাবে উৎপাদনের খরচ কম হওয়ায় এবং ব্যাপক অবৈধ চাহিদার কারণে ক্যাপ্টাগনকে কখনও কখনও ‘গরিবের কোকেন’ও বলা হয়। এটি একটি অ্যাম্ফিটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট (উদ্দীপক)। এটি মূলত ফেন ইথাইলাইন নামের একটি রাসায়নিক উপাদানে তৈরি। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে প্রচণ্ড উত্তেজিত করে তোলে।
এই মাদক সেবনের ফলে বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। যন্ত্রের মতো আচরণ করতে শুরু করে মানুষ। তাই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যে কোনও ভয়ঙ্কর কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেন না মাদকাসক্ত ব্যক্তি। এই কারণেই সশস্ত্র সংগঠনগুলির মধ্যে এই মাদক বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই মাদক সেবন করে হাতে মাথা কাটতেও হাত কাঁপে না জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের।
আরও পড়ুন:
ক্যাপ্টাগন সেবনের পর তীব্র উত্তেজনা ও শক্তির অনুভূতি তৈরি হয়। ভয়, ক্লান্তি, ঘুম এবং ক্ষুধা ভুলিয়ে দেয় এটি। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধারা দীর্ঘ সময় ধরে কোনও রকম মানসিক বা শারীরিক ক্লান্তি ছাড়াই লড়াই করতে পারেন।
এটি মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়, যা থেকে পরবর্তী কালে তীব্র আসক্তি তৈরি হয়। দীর্ঘ দিন ব্যবহারের ফলে হৃদ্রোগ, তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। যেহেতু এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে তীব্র ভাবে উদ্দীপিত করতে পারে, তাই চিকিৎসকেরা শুরুতে এটিকে একটি নিরাপদ বিকল্প মনে করেছিলেন। পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়।
বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম এশিয়ায়, বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়, ক্যাপ্টাগনের বাড়বা়ড়ন্ত শুরু হয়। সেখানে আইএসআইএস-সহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি যোদ্ধাদের শক্তি, সহনশীলতা বাড়াতে এবং ভয় কমাতে এই উত্তেজকটি যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ।
আইনি ভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এটি পরবর্তী দশকে পশ্চিম এশিয়ার অবৈধ গবেষণাগারগুলিতে কৃত্রিম ভাবে উৎপাদিত হতে শুরু করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে এর অপব্যবহারের ফলে বিপদ বাড়ছে বই কমছে না। আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে সংগঠনের সদস্যেরা। মাদকপাচারে কোটি কোটি ডলারে ফুলেফেঁপে উঠছে অস্ত্রভান্ডার।
ক্যাপ্টাগন তৈরির খরচ অত্যন্ত কম। সিরিয়া বা লেবাননের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিটি ট্যাবলেট তৈরি করতে মাত্র কয়েক টাকা খরচ হয়। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার ধনী দেশগুলি বা আন্তর্জাতিক মাদক কালোবাজারে এই ট্যাবলেটগুলির প্রতিটি ১০ থেকে ২০ ডলারে বিক্রি হয়। এই বিশাল লাভের অংশ সরাসরি সশস্ত্র গোষ্ঠী, স্থানীয় সশস্ত্র সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। অস্ত্র কেনা এবং নিজেদের নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখার কাজ করে তারা।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ক্যাপ্টাগন পাচার একটি অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোকেন বা হেরোইনের বদলে পশ্চিম এশিয়ার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এই বিশেষ মাদক পাচারের ষড়যন্ত্র চলছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞেরা ‘নার্কো টেররিজ়ম’ বা মাদক সন্ত্রাসবাদ হিসাবে বিষয়টিকে উল্লেখ করছেন।
একসময় উত্তর ভারতে, বিশেষত পঞ্জাব, কাশ্মীর, রাজস্থান, গুজরাত ও মহারাষ্ট্রে ‘মাদক সন্ত্রাসবাদ’ শুরু করে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। কিন্তু প্রশাসন শক্ত হাতে ব্যবস্থা নেওয়ায় বর্তমানে সেখানে মাদক পাচারের সূচক অনেকটাই নিম্নগামী। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই পরিস্থিতিতে ভারতের রাজধানী ও গুজরাত উপকূল দিয়ে সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোতে চাইছে মাদকপাচারকারী সংগঠনগুলি।
সিরিয়া যে এই মাদকচক্রের আঁতুড়ঘর তা প্রমাণ হয়ে যায় বাশার আল-আসাদ সরকারের আকস্মিক পতনের পর। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে এই মাদক বাণিজ্যের ভয়াবহ রূপটি স্পষ্ট ভাবে উন্মোচিত হয়। সিরিয়ার অন্তর্বর্তিকালীন প্রশাসন এবং স্থানীয় নাগরিকেরা দেশটির বিভিন্ন অংশ থেকে প্রায় ২০ কোটিরও বেশি ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেট এবং বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল উদ্ধার করে।
দীর্ঘ দিন ধরে পশ্চিমি বিশ্ব এবং আরব দেশগুলির অভিযোগ ছিল, আসাদ সরকার নিজে এই মাদক সিন্ডিকেটের পিছনে রয়েছে। যদিও দামাস্কাস সব সময় তা অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতনের পর যখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি (বিশেষ করে হাইয়াত তাহরির আল-শাম) রাজধানী শহর এবং এর আশপাশের সামরিক ঘাঁটি ও সদর দফতরগুলির নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তারা কোটি কোটি ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেটের বিশাল মজুত এবং অত্যাধুনিক গবেষণাগার আবিষ্কার করে।
একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ, জঙ্গি এবং অপরাধী চক্রগুলি জর্ডন, লেবানন এবং ইরাকের সীমান্ত ব্যবহার করে এই মাদক সৌদি আরব এবং অন্য উপসাগরীয় দেশগুলিতে পাচার করে। এমনকি সমুদ্র ও আকাশপথ ব্যবহার করে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু অংশেও এর চালান পৌঁছোনোর চেষ্টা করা হয়েছে। জর্ডনের মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলিকে এখন এই মাদক চোরাচালান রুখতে নিয়মিত তাদের সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হচ্ছে এবং সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনা অব্যাহত।