লক্ষ লক্ষ সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে আত্মীয়দের নামে জমি! আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অপসারিত কেন্দ্রীয় আমলা কে এই পদ্মা?
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দায়ের করা একটি অভিযোগে আইএএস আধিকারিক পদ্মা জয়সওয়ালের বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ এবং সরকারি পদের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। জনগণের জন্য বরাদ্দ সরকারি তহবিল অন্যায় ভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ পদস্থ আমলা। ২৩ বছর প্রশাসনিক উচ্চ পদে থাকার পর অপসারিত আইএএস আধিকারিক পদ্মা জয়সওয়াল। তাঁকে বরখাস্ত করার আদেশনামায় সই করেছেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তার পরেই দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৩ ব্যাচের এজিএমইউটি ক্যাডার পদ্মাকে বরখাস্ত করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কর্মী ও প্রশিক্ষণ বিভাগ (ডিওপিটি)-এর সুপারিশে রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর চলতি বছরের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে আইএএস আধিকারিক অপসারণের আদেশ জারি করে প্রশাসন। ২০০৭-০৮ সালে অরুণাচল প্রদেশের পশ্চিম কামেং জেলার ডেপুটি কমিশনার থাকাকালীন সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগের জেরে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে খবর।
এজিএমইউটি (অরুণাচল প্রদেশ-গোয়া-মিজ়োরাম ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) আইএএস ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষে সেই মন্ত্রকের সুপারিশে বরখাস্ত করা হয়েছে পদ্মাকে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে গুরুতর অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে সরকারি সূত্রের খবর।
২০০৩ সালে আইএএস ক্যাডার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন পদ্মা। টানা ২৩ বছর ধরে দিল্লি, গোয়া, পুদুচেরি ও অরুণাচল প্রদেশে প্রশাসনিক দায়িত্বভার সামলেছেন তিনি। বরখাস্ত হওয়ার আদেশ জারি হওয়ার আগে তিনি দিল্লি সরকারের একটি শীর্ষ পদে ছিলেন। প্রশাসনিক সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।
কাগজে-কলমে, এই আধিকারিকের সফল কর্মজীবন। কিন্তু প্রায় ২০ বছর আগের একটি ঘটনার জন্য কর্মরত আইএএস আধিকারিকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের শাস্তির আরও একটি নজির তৈরি হল এ দেশে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তদন্ত চলার পর রাষ্ট্রপতির কলমের এক খোঁচায় দীর্ঘ কর্মজীবনে ছেদ পড়ল পদ্মার।
আরও পড়ুন:
২০০৭ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পদ্মা অরুণাচল প্রদেশের পশ্চিম কামেংয়ের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন, যেটা জেলা প্রশাসনের বেশ উঁচু পদ। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সেখানে থাকাকালীন ক্ষমতার জোরে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন কেন্দ্রীয় সরকারি এই আমলা।
জনগণের জন্য বরাদ্দ সরকারি তহবিল অন্যায় ভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সিবিআই-এর একটি চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি দায়িত্বে থাকার সময় প্রায় ২৮ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছিল। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছিল পদ্মার মতো প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমন তহবিলে হাত দিয়েছেন যা স্পর্শ করার অধিকার তাঁর এক্তিয়ারে ছিল না।
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দায়ের করা একটি অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ এবং সরকারি পদের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই বছরের এপ্রিলে তাঁকে সাময়িক ভাবে নিলম্বিত করা হয়। ২০১০ সালের অক্টোবরে সেই আদেশ প্রত্যাহার করে সরকার। ফলে ফের কর্মজীবনে ফেরেন পদ্মা।
অভিযুক্ত আমলার বিরুদ্ধে চলা তদন্তে তিনটি সরকারি ডিপোজ়িট অ্যাট কল রিসিট (ডিসিআর) ভাঙিয়ে ২৮ লক্ষ টাকার একাধিক ডিমান্ড ড্রাফ্ট তৈরি করার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, আত্মসাৎ করা সরকারি অর্থ পরবর্তী কালে পদ্মা তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে ব্যবহার করেছিলেন।
আরও পড়ুন:
পরবর্তী কালে এই মামলার ভার তুলে দেওয়া হয় সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর হাতে। রহস্যভেদে নেমে সিবিআই জানায়, পদ্মার সঙ্গে জড়িতে রয়েছেন তাঁর তৎকালীন আর্থিক উপদেষ্টা ও অফিসের ক্যাশিয়ার-সহ বেশ কয়েক জন অধস্তন কর্মচারী। এককথায় একটি গভীর অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের হদিস পান কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা।
পদ্মার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির মামলাটি ২০০৯ সালে দায়ের করা হয়েছিল। প্রায় ১৭ বছর ধরে এই মামলাটি আদালত ও আইনি জটে আটকে ছিল। কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল (ক্যাট) এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিল। সরকারি ট্রাইব্যুনাল প্রথমে জানিয়ে দেয় যে পদ্মার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নেই। কারণ হিসাবে ক্যাট জানায় এজিএমইউটি ক্যাডারের আধিকারিকদের বিষয়ের উপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
ক্যাট-এর এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্র। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল দিল্লি হাই কোর্ট সেই সিদ্ধান্তটি বাতিল করে দেয়। পদ্মার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে সবুজ সঙ্কেত দেন বিচারপতিরা।
এই মামলায় দিল্লি হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ক্যাট তার সিদ্ধান্তে ভুল করেছে। বিভাগীয় কার্যক্রমকে যে পর্যায়ে তা স্থগিত রাখা হয়েছিল সেখান থেকে পুনরায় তদন্ত চালু করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
আদালতের সম্মতি পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। হাই কোর্টের রায়ের পর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বিভাগীয় তদন্ত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে আইএএস আধিকারিককে অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তির সুপারিশ করেছে।
ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি) পদ্মার অপসারণের সুপারিশ করার পর এবং রাষ্ট্রপতি তাতে চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়ায়, আর্থিক তছরুপ মামলায় অভিযুক্ত পদ্মাকে ‘চাকরি থেকে বরখাস্ত’ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। এই আদেশ জারি হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে পদ্মার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে পদ্মা জানিয়েছেন, এই ধরনের কোনও ঘটনা বা বরখাস্তের কোনও আদেশ জারি হওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন।
২০০৮ সালের মূল অভিযোগ এবং ২০০৯ সালের অভিযোগপত্র থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত এই মামলার দীর্ঘসূত্রিতা আইন ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আইএএস কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর অকাল অবসর বা বরখাস্তের ঘটনা নজিরবিহীন হলেও বিরল নয়।
কর্মদক্ষতায় ঘাটতির অভিযোগে অভিজ্ঞ আইএএস অফিসারের বরখাস্তের নজির রয়েছে অতীতে। ২০১৭ সালে এজিএমইউটি ক্যাডারের ১৯৯৮ সালের আইএএস আধিকারিক ময়াঙ্ক শীল চহ্বান এবং ১৯৯২ সালের ছত্তীসগঢ়ের ক্যাডারের আইপিএস আধিকারিক রাজ কুমার দেওয়ানগানকেও অকাল অবসরের নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
এর আগে ২০১৪ সালে, মধ্যপ্রদেশের দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ আইএএস দম্পতি অরবিন্দ ও টিনু জোশীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এর চার বছর আগে তাঁদের বাড়িতে আয়কর বিভাগের তল্লাশির ফলে ৩৫০ কোটি টাকার আয়-বহির্ভূত সম্পদ এবং তিন কোটি টাকা নগদ উদ্ধার হয়েছিল।