How Venezuela’s President Nicolás Maduro Became a Devotee of Sathya Sai Baba and How It Shaped His personal Life dgtl
Maduro's Spiritual connection with India
ছিলেন ক্যাথলিক, স্ত্রীর প্রভাবে সনাতন ধর্মের দিকে ঝোঁকেন! কোন ধর্মগুরুর টানে ভারতে এসেছিলেন বন্দি মাদুরো?
আমেরিকা যে ব্যক্তিকে মাদকসন্ত্রাসী বলে অভিযোগ করেছে, সেই মাদুরো ছিলেন প্রয়াত ভারতীয় ধর্মগুরুর একনিষ্ঠ ভক্ত। নিজে ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী হলেও স্ত্রী ফ্লোরেসের ধর্মভাবনায় প্রভাবিত হয়েছিলেন ভেনেজ়ুয়েলার বিতর্কিত রাষ্ট্রপ্রধান।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩২
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২১
বাদামি চামড়ায় মোড়া বেশ উঁচু চেয়ার। তাতে গেরুয়া আলখাল্লা পরে বসে আছেন ভারতীয় স্বঘোষিত ধর্মগুরু। তাঁর পায়ের কাছে বসে রয়েছেন ভেনেজ়ুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ছবিটি তোলা হয়েছিল ভারতে। কয়েক দশক আগে। প্রেসিডন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই ভারতের সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগ তৈরি হয়েছিল মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর।
০২২১
‘আন্তর্জাতিক ধর্মগুরু’ সত্য সাই বাবার পুট্টপর্থীর আশ্রমে তোলা এই ছবি নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমে। ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে দেশছা়ড়া করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছাড় পাননি মাদুরোর স্ত্রী ফ্লোরেসও। শনিবার রাতে তাঁদের দু’জনকে প্রাসাদের শোয়ার ঘর থেকে তুলে আনা হয়। দু’জনকে আটক করে ভেনেজ়ুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে আমেরিকায় উড়িয়ে আনা হয়।
০৩২১
পরনে কালো জ্যাকেট। মাথায় টুপি। হাতে পরানো হাতকড়া। ধীর গতিতে হেঁটে যাচ্ছেন ভেনেজ়ুয়েলার ‘অপহৃত’ প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। এই ছবি প্রকাশিত হতেই স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা বিশ্ব। ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে আমেরিকা। মাদকসন্ত্রাস থেকে শুরু করে কোকেনপাচারের মতো অভিযোগ তো রয়েইছে, তার সঙ্গে মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্ত করা হবে অস্ত্র অপরাধের অভিযোগও।
০৪২১
প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি ফ্লোরেসের বিরুদ্ধেও সরকারি কর্তাদের প্রভাবিত করা, কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া থেকে শুরু করে মাদকপাচারে মদত দেওয়ার মতো নানা গুরুতর অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। মার্কিন বিচার বিভাগ সূত্রে খবর, মাদুরোর বিরুদ্ধে দুর্নীতিগ্রস্ত, অবৈধ সরকার পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে। ভেনেজ়ুয়েলার ‘অপহৃত’ প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এখন ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি।
০৫২১
আমেরিকার দণ্ডমু্ণ্ডের কর্তা ট্রাম্প যে ব্যক্তিকে মাদকসন্ত্রাসী বলে অভিযোগ করেছেন, সেই মাদুরো ছিলেন প্রয়াত ভারতীয় স্বঘোষিত ধর্মগুরু সত্য সাই বাবার একনিষ্ঠ ভক্ত। ক্যাথলিক অনুসারী হলেও স্ত্রী ফ্লোরেসের ধর্মভাবনায় প্রভাবিত হয়েছিলেন ভেনেজ়ুয়েলার এই বিতর্কিত রাষ্ট্রপ্রধান।
০৬২১
কয়েক দশকের ক্ষমতাসীন নেতার নাটকীয় পতনের দিকে বিশ্ব যখন মনোযোগ দিচ্ছে, তখন মাদুরোর অতীতের একটি স্বল্প আলোচিত অধ্যায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং ফৌজদারি অভিযোগে অভিযুক্ত মাদুরোর অনেক আগে থেকেই ভারতের সঙ্গে নীরব একটি আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল।
০৭২১
কূটনীতির অলিন্দ থেকে ভেনেজ়ুয়েলার সর্বোচ্চ পদে আসীন এবং তাঁর ক্ষমতার শীর্ষেও দৃশ্যমান হয়েছিল ভারতের সঙ্গে ধর্মীয় যোগ। প্রায় দু’দশক আগে ২০০৫ সালে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার কয়েক বছর আগেই মাদুরো ভারতে এসেছিলেন ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরুর সঙ্গে দেখা করতে। সেই সময় তিনি ভেনেজ়ুয়েলার বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কোনও রাষ্ট্রীয় আলোচনার জন্য নয়, বরং সত্য সাই বাবার প্রতি ভক্তির টানে ছিল সেই ব্যক্তিগত সফর।
০৮২১
মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া অন্ধ্রপ্রদেশের পুট্টপর্থীতে আসেন। তাঁরা সত্য সাই বাবার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ‘প্রশান্তি নিলয়ম’ আশ্রম পরিদর্শন করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ‘হাই প্রোফাইল’ দম্পতি গুরুর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করেন। সেই সফরের বিরল ছবিতে দেখা যায় সস্ত্রীক তরুণ মাদুরো মেঝেয় বসে ভারতীয় ধর্মগুরুর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মগ্ন।
০৯২১
ক্ষমতায় আসার পরেও ভারতীয় ধর্মের প্রতি টান অটুট ছিল অপহৃত প্রেসিডেন্টের। ভারতসফরের অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি যত্ন করে মনের মণিকোঠায় সযত্নে লালন করতেন মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী। সেই আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ঝলক ফুটে উঠত তাঁর ব্যক্তিজীবনে। মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে আসা দর্শনার্থীরা প্রায়শই তাঁর ব্যক্তিগত অফিসের ভিতরে একটি আকর্ষণীয় বিষয় লক্ষ করতেন।
১০২১
সাইমন বলিভার এবং উগো চাভেজ়ের মতো বিপ্লবী ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতির পাশে জ্বলজ্বল করত ফ্রেমে বাঁধানো সত্য সাই বাবার বিশাল এক প্রতিকৃতি। ভেনেজ়ুয়েলার ভবিষ্যৎ গঠনের সিদ্ধান্তগুলি সেই প্রতিকৃতির সামনেই নেওয়া হয়েছিল।
১১২১
২০০৫ সালে সাই বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় অবশ্য ফ্লোরেসের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি মাদুরো। তাঁদের বিয়ের অনেক আগে ফ্লোরেসই মাদুরোকে ভারতে নিয়ে এসেছিলেন। সেই সময়ে ফ্লোরেস প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজ়ের আইনজীবী ছিলেন এবং মাদুরো ছিলেন সংসদের স্পিকার। পরে মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত হন ফ্লোরেস। আর মাদুরো বিদেশমন্ত্রীর পদে উন্নীত হন।
১২২১
ভেনেজ়ুয়েলার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষমতার অলিন্দে ‘আয়রন লেডি’ হিসাবে খ্যাত ফ্লোরেস আগে থেকেই সত্য সাইয়ের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। মাদুরোর সঙ্গে সনাতন ধর্মের সংযোগের নেপথ্যে ফ্লোরেসই অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। ২০১১ সালের এপ্রিলে ‘আন্তর্জাতিক ধর্মগুরু’র প্রয়াণের পর মাদুরো বিদেশমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভেনেজ়ুয়েলার জাতীয় পরিষদে একটি আনুষ্ঠানিক শোক প্রস্তাব পাশ করান।
১৩২১
স্বয়ং প্রেসিডেন্টের হাত মাথায় থাকার কারণে সে দেশে সত্য সাইয়ের সংগঠনগুলি অবাধে কাজ করার ছাড়পত্রও পেয়েছিল। যেখানে অনেক বিদেশি অসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) নানা ধরনের বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছিল। এমনকি তাদের কয়েকটিকে মাদুরো সরকারের নির্দেশে পাততাড়িও গোটাতে হয়েছিল। সেখানে ভারতীয় এই ধর্মগুরুর আশ্রম নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রগুলি স্কুল এবং ‘ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ভ্যালুজ়’-এর নানা কর্মসূচি পরিচালনা করত।
১৪২১
লাটিন আমেরিকায় সাই বাবার ভক্ত সম্প্রদায়গুলির মধ্যে অন্যতম বড় দেশ ভেনেজ়ুয়েলা। সংগঠনের গোড়াপত্তন ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু হলেও ডালপালা ছড়িয়ে তা প্রসারিত হয় প্রেসিডেন্টের বদান্যতাতেই। প্রেসিডেন্টের ‘গুরু’র প্রয়াণের পর ভেনেজ়ুয়েলা গুরুর ‘মানবতার প্রতি আধ্যাত্মিক অবদান’কে সম্মান জানাতে জাতীয় শোকদিবস ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্তে অনেকেই ভুরু কুঁচকেছিলেন। তবে সরাসরি প্রশ্ন তোলার সাহস কেউ দেখাননি।
১৫২১
সম্প্রতি ২৩ নভেম্বর মাদুরো সাই বাবার জন্মের শতবার্ষিকী উদ্যাপনের একটি সরকারি বিবৃতিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ভারতীয় ধর্মগুরুকে ‘আলোর সত্তা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি রোমন্থন করে মাদুরোকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘তাঁর চিরন্তন বার্তা আমার শক্তিকে প্রতি মুহূর্তে নবজাগরিত করে তোলে। এই মহান শিক্ষকের জ্ঞান আমাদের আলোকিত করে রাখুক।’’
১৬২১
ভারতীয় গুরুর মাদুরোর প্রতি অপার ভক্তি-শ্রদ্ধার বিষয়টি নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। মাদুরোর কট্টর সমালোচকদের মতে, ভারতের এই ধর্মগুরুর শিক্ষা ও বাণী মূলত সত্য, ধর্ম এবং অহিংসার উপর ভিত্তি করে প্রচারিত হয়। অথচ দেশ চালাতে গিয়ে সন্ত্রাস, দমনপীড়ন নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন মাদুরো। নিরীহ নাগরিকদের দিতে হয়েছে চরম মূল্য। বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ভোগ করার সময় আধ্যাত্মিকতা স্রেফ প্রতীকী ঢাল হিসাবে কাজ করেছিল প্রেসিডেন্টের পরিবার, এমনটাই দাবি মাদুরোর বিরোধী পক্ষের।
১৭২১
মাদুরো সরকার মাদকপাচার-সহ নানা সংগঠিত অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত, অভিযোগ করেছে আমেরিকা। মাদুরোর হ্যাঙ্গার থেকে ‘কয়েকশো কেজি কোকেনপাচার’-এর বিষয়ে একটি রেকর্ডিং প্রকাশ্যে আসে। তাতে নাম জড়িয়েছে ফ্লোরেসের পরিবারেরও।
১৮২১
মাদকপাচারের পথ সুগম করতে প্রায়ই নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করতেন ফ্লোরেস। ২০০৭ সালে দেশের অন্যতম কুখ্যাত মাদকপাচারকারী এবং ভেনেজ়ুয়েলার জাতীয় মাদকবিরোধী অফিসের ডিরেক্টর নেস্টর রেভেরল টরেসের মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করার জন্য নাকি লক্ষ লক্ষ ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি ফ্লোরেস।
১৯২১
মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি দাবি করে, শুধু মাদুরো নন, তাঁর স্ত্রীও ‘নার্কো-নেটওয়ার্ক’-এর অংশ। যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তিনিও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন বলে অভিযোগ উঠতে থাকে। সেই থেকে মার্কিন নজরে ছিলেন ফ্লোরেসও।
২০২১
শুক্রবার রাতের অভিযানে মাদুরোর পাশাপাশি বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকেও। দম্পতির পাশাপাশি তাঁদের পুত্র এবং আরও তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। মাদকসন্ত্রাস, কোকেনপাচার, মেশিনগান-সহ বিবিধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার মতো নানা অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
২১২১
শনিবার তাঁর প্রাসাদে ঢুকে শোয়ার ঘর থেকে সস্ত্রীক মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় পেন্টাগনের ডেল্টা বাহিনী। প্রথমে তাঁদের নিউ ইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর সেখান থেকে হেলিকপ্টারে চাপিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ম্যানহাটনের ডিইএ-র সদর দফতরে।