মসজিদে মহিলা ও শিশুদের রাইফেল প্রশিক্ষণ, মার্কিন সেনাকে ‘কবরে পাঠাতে’ জনতার হাতে একে-৪৭ তুলে দিচ্ছে ইরান!
ফের নতুন করে ইরানে হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দিকে দেশের আমজনতাকে একে-৪৭ চালানো শেখাচ্ছে তেহরানের আধাসেনা আইআরজিসি। অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নারী ও কিশোর-কিশোরীরাও।
গৃহবধূ থেকে শুরু করে ছাপোষা মধ্যবিত্ত। কিংবা, ১৬-১৭ বছরের কিশোর-কিশোরী। দেশের আমজনতাকে এ বার হাতিয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করল ইরানি আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। তেহরানের সরকারি গণমাধ্যম সেই ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আনায় দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল। ‘আগ্রাসী’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতেই কি নাগরিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ? তুঙ্গে উঠেছে সেই জল্পনা।
চলতি বছরের ১৬ মে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অস্ত্র প্রশিক্ষণের ভিডিয়ো সম্প্রচার করে ইরানের সরকারি টিভি চ্যানেল। সেখানে আইআরজিসিকে রাজধানী তেহরান-সহ দেশের ছোট-বড় মসজিদে আমজনতাকে হাতিয়ার চালানো শেখানোর ক্লাস নিতে দেখা গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) মোজ়তবা খামেনেইয়ের ছবিকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলি চালিয়েছেন তাঁরা। সেখানে মহিলা ও কিশোর-কিশোরীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
ইরানি সরকারি টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল, রকেট প্রপেল্ড গ্রেনেড (আরপিজি), হ্যান্ড গ্রেনেড এবং ম্যান পোর্টেবল রকেট লঞ্চারের মতো পদাতিক সেনার ব্যবহৃত অতি সাধারণ হতিয়ারের প্রশিক্ষণই আমজনতাকে দিচ্ছে আইআরজিসি। সংশ্লিষ্ট অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন অংশ খুলে ফের তা জুড়ে ফেলার প্রশিক্ষণও পাচ্ছেন তাঁরা। তেহরানের দাবি, স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে এই সামরিক প্রশিক্ষণে যোগ দিচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।
সাবেক পারস্যের আমজনতার হাতিয়ার প্রশিক্ষণের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। সেখানে হিজাব পরিহিত অবস্থায় মহিলা ও কিশোরীদের একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল এবং আরপিজি চালানোর প্রশিক্ষণ হাতেকলমে নিতে দেখা গিয়েছে। রাজধানী তেহরানকে বাদ দিলে আহভাজ, কেরমান, বিজান, শিরাজ এবং জাহেদানের মতো শহরের মসজিদে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলি আইআরজিসি চালিয়েছে বলে সরকারি ভাবে জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশটির প্রশাসন।
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন নাসের সাদেঘি নামের আইআরজিসির এক সৈনিক। তাঁর কথায়, ‘‘দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলছে এই প্রশিক্ষণ। সর্বত্রই আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। এর লক্ষ্য হল দেশবাসীর মনে প্রতিশোধস্পৃহা জাগিয়ে তোলা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ দিয়েছেন আমাদের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। ওরা স্কুলে বোমাবর্ষণ করছে। তাতে ১৫৩ জন নিরীহ পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছে। এগুলি ভুলে যাওয়ার নয়।’’
আরও পড়ুন:
সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল চালানো শেখার উপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ইরান। আর তাই প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবিরে রুশ নির্মিত এই হাতিয়ারের সুস্পষ্ট ছবি টাঙিয়ে রাখতে দেখা গিয়েছে আইআরজিসিকে। পাশাপাশি, অস্ত্রটির কোন অংশের কী নাম, কী ভাবে এটি কাজ করে এবং এতে কী ধরনের বুলেট ব্যবহৃত হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ ছবির মধ্যে স্থানীয় ভাষায় লিখে আমজনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।
অস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্তেরা ইতিমধ্যেই তাঁদের অভিজ্ঞতা ইরানি সরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। উদাহরণ হিসাবে বছর ৪০-এর সরকারি কর্মচারী ফারদিন আব্বাসির কথা বলা যেতে পারে। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা কোনও পশ্চিমি আগ্রাসন সহ্য করব না। বিদেশি শক্তি এ দেশের মাটিতে পা দিলেই আমাদের গুলি তাদের স্বাগত জানাবে।’’ প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে ৪৭ বছর বয়সি গৃহবধূ ফাতেমেহ হোসেন-কালান্তারকে।
সংবাদসংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফাতেমেদ বলেছেন, ‘‘আমরা কিশোর ও যুবক সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদের সরকারি প্রশিক্ষণ শিবিরে যাচ্ছি। কারণ, এটা একটা জাতির সুরক্ষার প্রশ্ন। আমাদের সকলের প্রিয় আলি খামেনেইকে অন্যায় ভাবে খুন করা হয়েছে। আর এখন সম্পূর্ণ ইরান ধ্বংস করার নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে মার্কিন ও ইহুদিদের যৌথ ফৌজ। ফলে দেশ বাঁচাতে অস্ত্র ধরতেই হচ্ছে।’’
এএফপি জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিতে লাউডস্পিকারে সেনা কমান্ডারদের বক্তৃতা শোনায় আইআরজিসি। পাশাপাশি সেখান ছিল, নিহত সৈনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে শোকজ্ঞাপন, কট্টরপন্থী ধর্মীয় উস্কানি, মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ এবং চিকিৎসা পরিষেবার সুবন্দোবস্ত। আগামী দিনে আমজনতাকে একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেলের বাইরে গিয়ে অন্যান্য অত্যাধুনিক হাতিয়ারের প্রশিক্ষণ দিতে পারে তেহরান। সেই ইঙ্গিত অবশ্য দিয়েছেন নাসের সাদেঘি।
আরও পড়ুন:
আইআরজিসির ওই সৈনিক জানিয়েছেন, ‘‘যে ভাবে এগিয়ে এসে আমজনতা রাইফেলের প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাতে আগামী দিনে তাঁদের আরও আধুনিক হাতিয়ারের প্রশিক্ষণ দেওয়া মোটেই কঠিন হবে না। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।’’ সূত্রের খবর, তাতে থাকতে পারে শত্রুর কপ্টার বা ট্যাঙ্ক ধ্বংসের ‘ম্যান পোর্টেবল’ ক্ষেপণাস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। যদিও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতি দেয়নি তেহরান।
সামরিক বিশ্লেষকেরা আবার জানিয়েছেন, ইচ্ছাকৃত ভাবেই আমজনতাকে একে-৪৭ রাইফেল চালানো শেখাচ্ছে আইআরজিসি। কারণ, রুশ নির্মিত এই হাতিয়ারে লক্ষ্যে নিশানা লাগানো খুব সহজ। তা ছাড়া অস্ত্রটির রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলাও বেশ কম। সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের অনুমান, অচিরেই ইরানে ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ শুরু করবে মার্কিন ফৌজ। তখন গেরিলা যুদ্ধে তাদের নাস্তানাবুদ করে তোলার পাল্টা পরিকল্পনা করছে তেহরান। আর তাই আমজনতাকে দেওয়া হচ্ছে হাতিয়ারের প্রশিক্ষণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে এই আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের নকশা তৈরি করেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মিখাইল কালাশনিকভ। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে হাতিয়ারটির নামকরণ করেন তিনি। এর পুরো কথাটি হল ‘অ্যাভটোম্যাট কালাশনিকভ’। ১৯৪৭ সালে রাইফেলটি আবিষ্কার হওয়ার দু’বছরের মাথায় এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে মস্কো। খুব অল্প দিনের মধ্যেই সারা বিশ্বে প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে একে-৪৭।
এ দেশের সাবেক সেনাকর্তারা সোভিয়েত আমলের তৈরি সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটিকে অত্যন্ত ভরসাযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের কথায়, বালি থেকে শুরু করে কাদামাটি এমনকি বরফের নীচে দু’-তিন বছর পর্যন্ত চাপা থাকলেও একে-৪৭ রাইফেলের কোনও সমস্যা হয় না। শুধু তা-ই নয়, প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও দিব্যি এর থেকে ছোড়া যায় গুলি। মিনিটে ৬০০ রাউন্ড পর্যন্ত কার্তুজ দাগার ক্ষমতা আছে এই হাতিয়ারের। এতে ব্যবহার হয় ৭.৬২x৩৯ মিলিমিটারের গুলি।
একে-৪৭ রাইফেলে দু’তিন ধরনের ম্যাগাজ়িন ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। সাধারণত, এতে লাগানো থাকে ৩০ বা ৫০ রাউন্ডের ম্যাগাজ়িন। তবে প্রয়োজনে আরও বেশি গুলির ম্যাগাজ়িন এতে ব্যবহার হতে পারে। রাইফেলটির ওজন সাড়ে তিন কেজির কাছাকাছি হওয়ায় খুব সহজেই একে বহন করা যায়। তার জন্য বিরাট কোনও শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন নেই। সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন সেই কারণেই একে-৪৭ চালানোর প্রশিক্ষণের উপর জোর দিয়েছে আইআরজিসি।
১৯৫৫-’৭৫ সাল পর্যন্ত চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধে বড়সড় পরাজয়ের মুখে পড়ে আমেরিকার ফৌজ। সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় একে-৪৭। এ ছাড়া হাঙ্গেরির বিপ্লব এবং আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধেও বহুল পরিমাণে ব্যবহার হয়েছে সাবেক সোভিয়েত আমলের এই রাইফেল। বর্তমানে এর উন্নত সংস্করণকে নিয়মিত হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে ভারতীয় সেনা। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে উত্তরপ্রদেশের কারখানায় এর বাণিজ্যিক উৎপাদন চালাচ্ছে কেন্দ্র।
গত ১৯ মে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলমান শান্তি-আলোচনা ব্যর্থ হলে তেহরানকে তার ফল ভোগ করতে হবে বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “দু’-তিন দিনের মধ্যে... শুক্রবার বা শনিবার কিংবা আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ইরানের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’’
ট্রাম্পের এই হুমকির পর চুপ করে বসে থাকেনি ইরান। ওই দিনই মধ্যরাতে সমাজমাধ্যমে পাল্টা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন তেহরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘আমরা অনেক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। যুদ্ধে ফিরলে সেগুলি আমাদের আরও অনেক চমক দেখাতে সাহায্য করবে।”
আরাঘচি সমাজমাধ্যমের ওই পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ডজনখানেক যুদ্ধবিমান খুইয়েছে আমেরিকা। মার্কিন কংগ্রেসও বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী। এই সূত্রে মার্কিন সেনার এফ-৩৫ বিমান গুলি করে নামানোর প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন তিনি।