সুপারি কিলারদের গুলিতে ঝাঁঝরা একের পর এক জঙ্গিনেতা! সত্যিই কি পাকিস্তানে অপারেশন চালাচ্ছে ভারতের ‘ধুরন্ধর’রা?
আদিত্য ধর পরিচালিত হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ধুরন্ধর’ বক্স অফিসে ঝড় তোলার পর উঠে গিয়েছে একটাই প্রশ্ন। পাকিস্তানের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘রাজত্ব’ চালাচ্ছে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা র?
কখনও ব্যস্ত রাস্তা। কখনও বা বাড়ির লন। সুযোগ পেলেই ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ পাকিস্তানি জঙ্গিদের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজের দল! তাঁদের আতঙ্কে ঘুম উড়েছে ইসলামাবাদের। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, এই ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপটে হিন্দি চলচ্চিত্র বানিয়ে বক্স অফিসে হইচই ফেলে দিয়েছেন পরিচালক আদিত্য ধর। তাঁর ‘ধুরন্ধর’-প্রেমে মজেছে আট থেকে আশি।
আদিত্য পরিচালিত সিনেমার অন্যতম চরিত্র হল হামজ়া আলি মাজ়ারি। পর্দায় সেই চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন রণবীর সিংহ। এ দেশের গোয়েন্দাকর্তাদের নির্দেশে পাক বন্দর শহর করাচির একটি আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংয়ে ঢুকে পড়ে হামজ়া। পরবর্তীকালে তাঁর সাহায্যেই কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের খতম করতে থাকেন ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) ডিরেক্টর অজয় সান্যাল। অজয়ের ভূমিকায় আর মাধবনকে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে।
‘ধুরন্ধর’-এর এই অজয় সান্যাল চরিত্রটি আবার কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভালের থেকে অনুপ্রাণিত। আইবিতে থাকাকালীন বেশ কয়েক বছর ছদ্মবেশে পাকিস্তানে কাটান তিনি। সেই সূত্রে করাচির অলিগলি তালুর মতো চেনেন তিনি। আর তাই দিনেদুপুরে কুখ্যাত জঙ্গিদের উপর শ্যুটআউটের নেপথ্যে ভারতীয় গুপ্তচরদের হাত থাকার অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান। যদিও তা খারিজ করে দিয়েছে ভারত।
গত বছর (২০২৫ সাল) সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’। আকাশ হাসান, শাহ মির বালোচ এবং হান্না এলিস-পিটারসনের সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০-’২৪ সালের মধ্যে পাকিস্তানের মাটিকে অপারেশন চালিয়ে অন্তত ২০ জন সন্ত্রাসীকে নিকেশ করেছে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ (র)। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জঙ্গিদের খুনের পর হাওয়ায় মিলিয়ে যায় নয়াদিল্লির শ্যুটাররা।
‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, প্রায় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ছক লক্ষ করা গিয়েছে। কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের খুন করতে বাইকে সওয়ার হয়ে এসেছে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজের দল। কখনও একটা বাইকে দু’জন, কখনও আবার দু’টি বা তিনটি বাইক ব্যবহার করেছে তারা। শুধু তা-ই নয়, হামলার আগে এলাকা রেকি করা হয়েছে বলেও অনুমান। সংশ্লিষ্ট জঙ্গিকে কখন, কোথায় নিরস্ত্র অবস্থায় পাওয়া যাবে, সেই তথ্যও ছিল তাদের কাছে।
আরও পড়ুন:
ভারত ও পাকিস্তানের শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদন লেখা হয়েছে বলে দাবি। তবে রিপোর্টে সমস্ত সূত্রের নাম গোপন রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, পশ্চিমের প্রতিবেশীর বেশ কয়েকটি শহরে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজদের বেশি দাপাদাপি লক্ষ করা গিয়েছে। সেই তালিকায় নাম আছে লাহৌর, করাচি, পেশোয়ার এবং রাওয়ালপিন্ডির।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী কী ভাবে পাকভূমিতে জঙ্গিনিধন অপারেশন চালাচ্ছে ভারত? সত্যিই কি করাচি-লাহৌরের আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংয়ে এজেন্ট ঢুকিয়েছে র? ‘ধুরন্ধর’ মুক্তি পাওয়ার পর এই নিয়ে জল্পনা তীব্র হলেও প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ অন্য তথ্য দিয়েছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’। ব্রিটিশ গণমাধ্যমটির দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে ঘাঁটি করে ইসলামাবাদের অন্দরে একটি ‘স্লিপার সেল’ তৈরি করেছে নয়াদিল্লির গুপ্তচর সংস্থা। কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের খুন করতে কাজে লাগানো হচ্ছে তাদের।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এই তত্ত্বকে মোটের উপর মান্যতা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার, ফৌজ ও গুপ্তচর সংস্থা ‘ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স’ (আইএসআই)। তাদের দাবি, অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজদের কেউই সম্ভবত র-এর এজেন্ট নন। তাঁরা স্থানীয় ‘সুপারি কিলার’ বা হতদরিদ্র স্থানীয় বাসিন্দা। নানা প্রলোভনে তাঁদের ‘স্লিপার সেল’ করেছে নয়াদিল্লি। সুযোগ পেলেই এই তুরুপের তাসে কাজ হাসিল করছে মোদী সরকার।
২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি নিয়ে কেন্দ্রীয় আধাসেনার কনভয়ে ফিঁদায়ে হামলা চালায় পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদের সদস্য আদিল আহমেদ দার। সেই ঘটনায় প্রাণ হারান ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান। এর পরই নাকি ইসলামাবাদকে শিক্ষা দিতে রণকৌশল বদল করে র। পশ্চিমের প্রতিবেশীর ঘরে ঢুকে জঙ্গিনিধনে নামে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা। এমনটাই দাবি করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
আরও পড়ুন:
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর দাবি, এ ব্যাপারে তাদের কাছে মুখ খোলেন ভারতের এক শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তা। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা সব পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসী হামলা থামাতে পারছি না। কারণ, ইসলামাবাদ তাদের নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। তাই এই সমস্যার উৎসে পৌঁছোনোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে শত্রুভূমির ভিতরে ঢুকে হামলা করা ছাড়া আমাদের কাছে দ্বিতীয় বিকল্প নেই।’’
অন্য দিকে ইসলামাবাদের এক গোয়েন্দাকর্তাকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, আমিরশাহি ছাড়াও নেপাল, মলদ্বীপ ও মরিশাসে বসে পাক স্লিপার সেলগুলি নিয়ন্ত্রণ করছে র। পাশাপাশি, নিখুঁত ভাবে গুপ্তহত্যার অপারেশন চালাতে কোটি কোটি ডলার খরচেও পিছপা নয় নয়াদিল্লি। এ ব্যাপারে বালোচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থনও রয়েছে তাদের দিকে।
গত কয়েক বছর ধরেই চার পাক প্রদেশের মধ্যে দু’টি এলাকা অগ্নিগর্ভ। ইসলামাবাদ থেকে আলাদা হতে চেয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছে বালোচ লিবারেশন আর্মি। একই ছবি খাইবার-পাখতুনখোয়ারও। ইসলামাবাদের ফৌজের উপর ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সেখানকার তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি। রাওয়ালপিন্ডির অভিযোগ, পর্দার আ়ড়ালে থেকে দু’টি গোষ্ঠীকেই মদত দিচ্ছে ভারত। স্বাভাবিক ভাবেই এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে ভারত।
‘দ্য গার্ডিয়ান’কে পাক গোয়েন্দাকর্তা বলেছেন, ‘‘গুপ্তহত্যার শুটার পেতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় মৌলবাদের বিষ ছড়াচ্ছে র। দিক্ভ্রষ্ট কিছু তরুণকে বোঝানো হচ্ছে ইসলামীয় রীতিনীতি ও মতাদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়েছে ইসলামাবাদ, যা ফিরিয়ে আনতে পবিত্র যুদ্ধের প্রয়োজন। সেটা একমাত্র কাফেরদের হত্যা করেই আসতে পারে।’’
অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজদের হামলায় নিহত জঙ্গিদের তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় নাম। উদাহরণ হিসাবে ১৯৯৯ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান অপহরণের সঙ্গে যুক্ত জাহিদ আখুন্দ, ২০১৬ সালে পঠানকোট বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলার মূল চক্রী জইশ কমান্ডার শাহিদ লতিফ, হিজ়বুল মুজ়াহিদিন কমান্ডার বশির আহমেদ পির, খালিস্তান কমান্ডো ফোর্স পরমজিৎ সিংহ পাঞ্জওয়ার এবং সেলিম রহমানির কথা বলা যেতে পারে।
গত বছরের (২০২৫ সাল) মে মাসে কুখ্যাত জঙ্গি গোষ্ঠী লশকর-এ-ত্যায়বার শীর্ষনেতা রাজাউল্লাহ নিজামানি খালিদের বুলেটবিদ্ধ দেহ উদ্ধার করে পাক পুলিশ। ২০০৫ সালে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এবং ২০০১ সালে রামপুরে সিআরপিএফ ক্যাম্পে হামলায় ভারতের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম ওঠে তাঁর।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় লশকরের রাজনৈতিক শাখা ‘পাকিস্তান মারকাজি মুসলিম লিগ’-এর প্রধান মৌলানা কাশিফ আলিকে গুলি করে পালায় অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজের দল। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। ভারতে ২৬/১১ হামলার মূল চক্রী হাফিজ় সইদের শ্যালক ছিলেন তিনি।
তবে ‘ধুরন্ধর’ স্টাইলে পাকিস্তানের ভিতরে নিজস্ব এজেন্ট নয়াদিল্লি কখনও পাঠায়নি, এমনটা নয়। ১৯৭৪ সালে থিয়েটার কর্মী রবীন্দ্র কৌশিককে প্রশিক্ষণ দিয়ে করাচি পাঠায় র। নবি আহমেদ শাকির ছদ্মনামে সেখানে পা রাখেন তিনি। কিছু দিনের মধ্যেই যোগ দেন রাওয়ালপিন্ডির সেনাবাহিনীতে। ফৌজে মেজর পদও পেয়ে যান কৌশিক। ১৯৮৩ সালে গ্রেফতার হন তিনি।
২০০১ সালে পাকিস্তানের জেলে মৃত্যু হয় রবীন্দ্র কৌশিকের। ১৯৭১ সালে ভারত-পাক যুদ্ধের মুখে ইসলামাবাদের এক সেনা অফিসারকে বিয়ে করেন র এজেন্ট সেহমত খান। নিজের জীবন বাজি রেখে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করতে সক্ষম হন তিনি। তাঁর জীবনী নিয়ে লেখা ‘কলিং সেহমত’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে একটি হিন্দি চলচ্চিত্র, নাম ‘রাজ়ি’।
১৯৮৩-’৮৯ সাল পর্যন্ত ছদ্মবেশে ইসলামাবাদ, লাহৌর এবং করাচিতে কাটান অজিত ডোভাল। গত শতাব্দীর ৮০-র দশকে পরমাণু বোমা তৈরি করতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ শুরু করে পাকিস্তান। সেই তথ্যও এজেন্ট মারফত হাতে পেয়েছিল র। তবে এগুলির কোনওটাই কখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করেনি নয়াদিল্লি।