Advertisement
E-Paper

ট্রাম্পকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে হরমুজ়ে ‘তোলা’ তুলছে ইরান! আদৌ এ ভাবে তোলা যায় টাকা? কী বলছে আন্তর্জাতিক আইন?

সূত্রের খবর, সংঘর্ষবিরতি হতেই হরমুজ় প্রণালীতে জাহাজপিছু ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজ়িট ফি বা টোল (শুল্ক বা মাসুল) আদায় করছে ইরানি সামরিক বাহিনী আইআরজিসি। পাশাপাশি, ওই সামুদ্রিক রাস্তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায় তারা। কী বলছে আন্তর্জাতিক আইন?

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৩৯
Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০১ / ১৮

ইরান যুদ্ধে ইতি টানতে মরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই লক্ষ্যে ১১ এপ্রিল পাকিস্তানে আলোচনায় বসছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, শান্তি বৈঠকে সবচেয়ে বড় কাঁটা হতে চলেছে হরমুজ় প্রণালী। কারণ, ওই সামুদ্রিক রাস্তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায় তেহরান। পাশাপাশি, সেখান দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে ‘টোল’ বা শুল্ক আদায়ের নিরঙ্কুশ অধিকার দাবি করেছে পারস্য উপসাগরের শিয়া মুলুক।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০২ / ১৮

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানের এই দাবি মেনে নেওয়া অসম্ভব। কারণ, এর মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রপুঞ্জের আইনকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখাতে সক্ষম হবে তেহরান। দ্বিতীয়ত, আরব রাষ্ট্রগুলির খনিজ তেলের বাণিজ্যে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে ডলার। শুধু তা-ই নয়, সে ক্ষেত্রে মার্কিন মুদ্রাকে সরিয়ে সেই জায়গা দখল করবে চিনের রেনমিনবি, যার একক হল ইউয়ান। তাই হরমুজ়ের বাণিজ্যকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জায়গায় ওয়াশিংটন যে নিয়ে যেতে চাইছে, তা বলাই বাহুল্য।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৩ / ১৮

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী ওই সরু সামুদ্রিক রাস্তাটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানি সর্বোচ্চ নেতার (সুপ্রিম লিডার) নিয়ন্ত্রণাধীন আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে তাদের ‘ছাড়পত্র’ না নিয়ে হরমুজ় পেরোতে পারেনি কোনও পণ্যবাহী জাহাজ। তা ছাড়া ‘নিরাপদ যাত্রা’র জন্য ট্যাঙ্কারপিছু ২০ লক্ষ ডলার টোল ধার্য করেছে তারা।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৪ / ১৮

সূত্রের খবর, এই শুল্ক চিনা ইউয়ানে মেটাতে হচ্ছে জাহাজমালিক বা সংশ্লিষ্ট দেশকে। যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জের তৈরি করা নিয়ম মোতাবেক এটা পুরোপুরি বেআইনি। সেখানে বলা আছে, হরমুজ়ের মতো কোনও প্রাকৃতিক সামুদ্রিক রাস্তা কব্জা করে রাখতে পারবে না বিশ্বের কোনও দেশ। তবে কৃত্রিম জলপথে টোল বা শুল্ক আদায়ের অধিকার রয়েছে তাদের। উদাহরণ হিসাবে সুয়েজ় বা পানামা খালের কথা বলা যেতে পারে।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৫ / ১৮

ষোড়শ শতাব্দী থেকে ভারত-সহ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি থেকে পণ্য আমদানি-রফতানি করতে আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ নিয়ে যেতেন ইউরোপীয় বণিকেরা। এতে সময় লাগত অনেকটাই বেশি। উনিশ শতক আসতে আসতে বিকল্প রাস্তার সন্ধান পান তাঁরা। মিশরের সিনাই উপদ্বীপে কাটা হয় সুয়েজ় খাল। এতে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে জুড়ে যায় লোহিত সাগর। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যাতায়াতের সময় প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৬ / ১৮

১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর পণ্য জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে যায় সুয়েজ় খাল। এর ঠিক ১৯ বছরের মাথায় (১৮৮৮ সাল) সই হয় কনস্টান্টিনোপলের (আজকের ইস্তানবুল) চুক্তি। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, শান্তি বা যুদ্ধ, যে কোনও পরিস্থিতিতে যে কোনও দেশের পতাকাবাহী জাহাজ সব সময় সুয়েজ় খাল দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। কখনওই এটিকে অবরুদ্ধ করতে পারবে না কায়রো। ওই সময় যৌথ ভাবে কৃত্রিম জলপথটি নিয়ন্ত্রণ করত মিশর ও ফ্রান্স।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৭ / ১৮

কিন্তু, বিশ শতকের মাঝামাঝি ‘পিরামিডের দেশ’টিতে গামাল আবদেল নাসের কুর্সিতে বসতেই বদলে যায় সব হিসাব। ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই সুয়েজ় খালের জাতীয়করণ করেন তিনি। ইহুদিদের সঙ্গে ছিল তাঁর সাপে-নেউলে সম্পর্ক। ফলে ‘সুয়েজ় ক্যানেল অথরিটি’কে হাতের মুঠোয় পেয়ে সংশ্লিষ্ট খাল দিয়ে ইজ়রায়েলের আমদানি-রফতানি বন্ধ করার ছক কষেন নাসের। সম্ভাব্য বিপদের আঁচ পেতে তেল আভিভের অবশ্য বেশি সময় লাগেনি।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৮ / ১৮

১৯৫৬ সালের অক্টোবরে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ আক্রমণ করে বসে ইহুদি ফৌজ। তাঁদের সঙ্গে ছিল ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। উদ্দেশ্য, সুয়েজ় খালের উপর পশ্চিমের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি, কায়রোয় নাসেরের পতন চেয়েছিল তেল আভিভ। ত্রিশক্তি জোট দ্রুত সুয়েজ় খাল অধিকার করে ফেললেও সেই জয় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অচিরেই গোটা বিষয়টিতে ‘নাক’ গলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই দুই মহাশক্তির মধ্যে তখন আবার তীব্র হচ্ছিল ‘ঠান্ডা লড়াই’ (কোল্ড ওয়ার)।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
০৯ / ১৮

১৯৫৬-র যুদ্ধে রণাঙ্গনে হেরে গেলেও রাজনীতির মাঠে বড় জয় পায় মিশর। ওয়াশিংটন ও মস্কোর চাপে শেষ পর্যন্ত সিনাই উপদ্বীপ থেকে পিছু হটে ইজ়রায়েল, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। শুধু তা-ই নয়, সুয়েজ় খালের জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য হয় তারা। পরবর্তী বছরগুলিতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে পণ্যবাহী জাহাজ থেকে টোল বা শুল্ক আদায় শুরু করে কায়রো প্রশাসন। জলযানের আকার, ধরন এবং সামগ্রীর উপর ভিত্তি করে যেটা নির্ধারণ করে ‘পিরামিডের দেশ’।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১০ / ১৮

মিশরীয় সরকারের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যাবে, ২০২৩ সালে ট্রানজ়িট ফি বা টোল বাবদ কায়রোর আয়ের পরিমাণ ছিল ১,০২৫ কোটি ডলার। একই কথা পানামা খালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর বছরে (পড়ুন ১৯১৪ সাল) পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য এটিকে উন্মুক্ত করা হয়। তার পর থেকে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরে আমদানি-রফতানির একমাত্র সামুদ্রিক রাস্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে পানামা খাল।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১১ / ১৮

গোড়ার দিকে প্রশান্ত এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগকারী কৃত্রিম জলপথটি নিয়ন্ত্রণ করত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৯ সালে পানামা সরকারের হাতেই যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেয় ওয়াশিংটন। ২০২৪-’২৫ আর্থিক বছরে ট্রানজ়িট ফি বাবদ খালটির রোজগারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭০ কোটি ডলার, যেটা ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষের নিরিখে ১৪ শতাংশ বেশি। তবে সুয়েজ়ের তুলনায় এই খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা অনেকটাই কম।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১২ / ১৮

১৯৮২ সালে সমুদ্র-বাণিজ্যে বিবাদ মেটাতে বিশেষ একটি আইন পাশ করে রাষ্ট্রপুঞ্জ। নাম, ‘ইউনাইটেড নেশন্‌স কনভেনশন অন দ্য ল’ অফ দ্য সি’ বা ইউএনসিএলওএস। এর ৩৭-৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনও প্রাকৃতিক রাস্তা কখনওই অবরুদ্ধ করা যাবে না। সেখানে অবাধে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করতে দিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এই আইনের ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক সামুদ্রিক রাস্তায় চলাচলকারী জাহাজে মাসুল আরোপ নিষিদ্ধ।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১৩ / ১৮

ইউএনসিএলওএসের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে উপকূলীয় রাষ্ট্র এই ধরনের সামুদ্রিক প্রণালীর ক্ষেত্রে কী কী সুবিধা পেতে পারে তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। সেই নিয়ম মেনে, আইআরজিসি অবশ্যই নিজেদের সার্বভৌমত্ব বাঁচাতে হরমুজ়ে মার্কিন রণতরীর প্রবেশ আটকাতে পারে। পাশাপাশি, গুপ্তচর জাহাজ, সামরিক কপ্টার বা লড়াকু জেট ওড়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে তাদের। সে দিক থেকে এগুলিকে গুলি করে নামানোর অধিকারও থাকছে শিয়া ফৌজের হাতে।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১৪ / ১৮

তা ছাড়া হরমুজ় প্রণালীতে মৎস্যশিকার এবং গবেষণা ও জরিপের কাজ চালাতে পারে তেহরান। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট জলপথটির একটি অংশ আবার ছুঁয়েছে ওমান উপকূল। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের দেখাদেখি তারাও পণ্যবাহী জাহাজের উপর ট্রানজ়িট ফি আরোপ করতে পারে। তখন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আর তাই পাকিস্তানে বৈঠক শুরুর আগেই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সাবেক পারস্যকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১৫ / ১৮

গত ৯ এপ্রিল তেহরান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘‘ইরানের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক, হরমুজ় প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ অব্যাহত থাকবে।’’ দু’পক্ষের মধ্যে দু’সপ্তাহের জন্য সংঘর্ষবিরতি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট জলপথ দিয়ে তেলবাহী জাহাজের অবাধ যাতায়াতে সম্মতি দেয় আইআরজিসি। পরে মত বদলে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্য শর্ত চাপাতে চাইছে সাবেক পারস্যের শিয়া প্রশাসন।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১৬ / ১৮

ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীনও হরমুজ় প্রণালীর উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তা ছাড়া এই সময়সীমার মধ্যে দিনে ১৫টির বেশি জাহাজ ওই জলপথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। তথ্য বলছে, সংঘর্ষবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত মাত্র ১০টি জাহাজ এই পথে পার হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের হুমকিতে পারদ চড়ল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১৭ / ১৮

নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ করা এক পোস্টে ট্রাম্পের অভিযোগ, হরমুজ় পরিচালনায় ‘খুব খারাপ কাজ’ করছে ইরান। যে জলপথের মাধ্যমে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়, সেখান থেকে জাহাজ চলাচল খুব শিগগির স্বাভাবিক হবে বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘খবর পাচ্ছি তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের উপর টাকা নিচ্ছে তেহরান। এটা যদি তাঁরা করে থাকে, তা হলে সেটা এখনই বন্ধ করুক।’’

Is Iran violating international law by demanding transit toll in Strait of Hormuz
১৮ / ১৮

বিশেষজ্ঞদের দাবি, পাকিস্তানে হওয়া আলোচনায় হরমুজ় নিয়ে সমাধানসূত্র বার না হলে পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে লোহিত সাগর বন্ধ করতে পারে ইজ়রায়েল। দেখাদেখি, জিব্রাল্টার থেকে শুরু করে মলাক্কা, সমস্ত সামুদ্রিক জলপথেই শুরু হবে টোল আদায়। ফলে ইরান নাছোড়বান্দা হলে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।

সব ছবি: সংগৃহীত।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও গ্যালারি

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy