যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরতে শুরু করেছে নিহতদের কফিন! ভিয়েতনাম-আফগান যুদ্ধের আতঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রকে মনে করাচ্ছে ইরান?
পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গন থেকে নিহত সৈনিকদের কফিনবন্দি দেহ ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনে ফিরতে শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধে ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো লেজেগোবরে দশা হবে আমেরিকার? সেই প্রশ্নেই বর্তমানে সরগরম যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি।
এলাম, দেখলাম আর জয় করলাম। ইরান যুদ্ধের সূচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শরীরী ভাষায় যেন ঝরে পড়ছিল সেই আত্মবিশ্বাস! কিন্তু, মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তেহরান পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতেই ফিকে হতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের যাবতীয় চাল। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার অন্দরেই উঠছে জোরালো প্রশ্ন। পারস্যের খাঁড়ি শেষে ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান হয়ে উঠবে না তো?
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরানে আক্রমণ শানায় মার্কিন ফৌজ। প্রথম আঘাতেই তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা করে তারা। পাশাপাশি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় মৃত্যু হয় সাবেক পারস্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজ়িজ় নাসিরজ়াদেহ্ এবং সেনাপ্রধান আব্দুল রহিম মৌসাভির। ফলে শিয়া মুলুকটির ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করেছিল ওয়াশিংটন।
তাই আলি খামেনেই-সহ ইরানি শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুর খবর আসতেই সুর চড়ান ট্রাম্প। বলেন, ‘‘ওরা আলোচনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।’’ পাশাপাশি, তেহরানের পতন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘আগামী এক সপ্তাহ লাগাতার বোমাবর্ষণ করবে মার্কিন বিমানবাহিনী।’’ তার মধ্যেই সাবেক পারস্যের ক্ষমতার পালাবদল সম্পূর্ণ হবে বলে একরকম নিশ্চিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পর বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যম। সেখানে বলা হয়, কুর্সি বদলে তেহরানের শাসনভার কে নেবেন, তা নাকি বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই ছকে রেখেছে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি)। সুযোগ বুঝে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদসংস্থাকে সাক্ষাৎকার দেন ইরানের ক্ষমতাচ্যুত যুবরাজ রেজ়া পহেলভি। ১৯৭৯ সালের ইসলামীয় বিপ্লবের আগে পর্যন্ত যাঁর বাবা ছিলেন পারস্যের শাহ বা রাজা।
কিন্তু, ১ মার্চ থেকে ধীরে ধীরে উল্টো দিকে বইতে শুরু করে যুদ্ধের হাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে পশ্চিম এশিয়ার ছড়িয়ে থাকা তাদের সেনাঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে ইরানি সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানে আছড়ে পড়ে তেহরানের ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা আইআরজিসির ওই হামলা ঠেকাতে মোটের উপর ব্যর্থ হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ফলে বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটিতে ধরে যায় আগুন। ড্রোন আছড়ে পড়ে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধের মার্কিন দূতাবাসে। এ ছাড়া উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী রেডার ব্যবস্থা উড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে তেহরান, যা মোতায়েন ছিল কাতারে।
তেহরান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহার সেনাছাউনির ওই এএন/এফপিএস-১৩২ রেডারটি ছিল পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের চোখ ও কান। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন চিহ্নিত করে এটি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে খবর দিচ্ছিল। রেডারটির পাল্লা ৫,০০০ কিলোমিটার এবং আনুমানিক মূল্য ১১০ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে। এ ছাড়া আইআরজিসির প্রত্যাঘাতে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি লড়াকু জেট হারিয়েছে মার্কিন বায়ুসেনা।
চক্রব্যূহে ইরানকে ঘিরতে এ বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকেই পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে পারস্য উপসাগর সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। তার সঙ্গে ছিল তিনটে আর্লে বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ। আইআরজিসির দাবি, চারটে ক্ষেপণাস্ত্রে লিঙ্কনের উপর জোরালো আঘাত হেনেছে তারা। যদিও তারা ভাসমান ইস্পাতের দুর্গটিকে ডোবাতে সক্ষম হয়নি।
তেহরানের এ-হেন দাবি ঘিরে শোরগোল শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেখানে বলা হয়, আপাতত অক্ষত আছে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। বিমানবাহী রণতরীটির গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। যদিও সূত্রের খবর, পারস্য উপসাগরে নিজের অবস্থান বদল করেছে ওই যুদ্ধজাহাজ। ফলে সরকারি ভাবে যা-ই বলা হোক না কেন, আমেরিকার দাবি ঘিরে বাড়ছে জল্পনা।
আরও পড়ুন:
আরবের মার্কিন সামরিক ছাউনিগুলিতে প্রত্যাঘাতের পাশাপাশি ইতিমধ্যেই হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করেছে আইআরজিসি। পারস্য ও ওমান সাগর সংলগ্ন সরু এই সামুদ্রিক রাস্তাটি অপরিশোধিত তেল পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসাবে চিহ্নিত। বিশ্ববাজারের তরল সোনার ২০ শতাংশ এখান দিয়েই সরবরাহ করে যাবতীয় উপসাগরীয় দেশ। এ-হেন হরমুজ় আটকে দেওয়ায় সেখানে থমকে আছে সারি সারি তেলের ট্যাঙ্কার।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, আইআরজিসির ওই পদক্ষেপে হরমুজ়ে নোঙর ফেলতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন তেলবাহী জাহাজও। সেগুলিকে নিরাপদে বার করে আনতে নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, কাজটা মোটেই সহজ নয়। কারণ, সরু সামুদ্রিক জলপথটিকে অষ্টপ্রহর চক্কর কাটছে ইরানি নৌসেনার রণতরী ও ডুবোজাহাজ। তা ছাড়া ‘ওয়াটার মাইন’ দিয়ে হরমুজ় জুড়ে বারুদ সুড়ঙ্গ তৈরি করতে পারে তেহরান।
পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে ঘন ঘন ড্রোন হামলা চালাচ্ছে আইআরজিসি। ফলে মাঝেমধ্যেই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে রিয়াধকে। পশ্চিম এশিয়ার একের পর এক দেশে এ ভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। এর প্রভাবে মুদ্রাস্ফীতির সূচকও উপরের দিকে ছুটতে শুরু করেছে। এর ছেঁকা যুক্তরাষ্ট্রের আমজনতার গায়ে যে লাগতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
এ ছাড়া ইরান যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েক জন মার্কিন সৈন্য। রণাঙ্গন থেকে তাঁদের কফিনবন্দি দেহ ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনে ফিরেছে। সূত্রের খবর, এই অবস্থায় তেহরানে ‘গ্রাউন্ড অপারেশনের’ পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। তাঁর কথায় শেষ পর্যন্ত পেন্টাগন সায় দিলে নিহত সৈনিকের সংখ্যা উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ, ভূ-প্রকৃতিগত কারণে পারস্যভূমিতে লড়াই করা বেশ কঠিন।
সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, পাহাড় ও মরুভূমিতে ঘেরা ইরানে স্থলবাহিনীর অভিযানে বিপুল সংখ্যায় সৈনিক হারাতে পারে আমেরিকা। কারণ, এই ধরনের অপারেশনে সাধারণ ভাবে কৃত্রিম উপগ্রহ বা গ্যাজেটের দিকনির্ণয়ের উপর ভরসা করে শত্রুর দেশে পা রেখে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ। এর সঙ্গে প্রকৃত রণক্ষেত্রের আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে। অন্য দিকে নিজের এলাকার প্রতিটা ইট চেনে আইআরজিসি।
ফলে অতি সহজেই গেরিলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নাস্তানাবুদ করে ফেলতে পারে ইরানি সেনা। সাবেক পারস্যের সরকারের হাতে একাধিক ভাড়াটে বাহিনীও রয়েছে। লুকিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের জুড়ি মেলা ভার। ফলে সেই ঝুঁকি ট্রাম্প নেবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। লড়াইয়ের বিপুল খরচের বোঝা ইতিমধ্যেই তাঁর প্রশাসনের ঘাড়ে চেপেছে। সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট সংঘাতে দিনে ২০ কোটি খরচ হচ্ছে আমেরিকার।
এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের একাংশ ইরান যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন। পেন্টাগনের থেকে রণাঙ্গনের অবস্থা জানতে পেরেছেন তাঁরা। একে সামনে রেখে তাঁদের যুক্তি, লড়াই লম্বা চললে সেখানে থেকে আমেরিকার বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। তখন ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো লেজেগোবরে দশা হতে পারে ওয়াশিংটনের। তা ছাড়া সংঘর্ষের খরচ শেষ পর্যন্ত জোগাতে হবে মার্কিন আমজনতাকেই।
সম্প্রতি এ ব্যাপারে একটি জনমত সমীক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম সিএনএন। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্পের ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্তে খুশি নন ৫৯ শতাংশ আমেরিকাবাসী। ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক আবার মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রেসিডেন্টের মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। আর যুদ্ধ লম্বা হলে অবস্থা ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো হবে বলে আশঙ্কাপ্রকাশ করেছেন ৬২ শতাংশ মানুষ।
গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। ১৯৬৫ সালের পর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সৈনিক, হাতিয়ার, গোলা-বারুদ এবং অন্যান্য রসদ বেশি পরিমাণে পাঠাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। সংঘর্ষ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মার্কিন সৈন্যের মৃত্যুর সংখ্যা। শেষে বাধ্য হয়ে ১৯৭৩ সালে মাথা নিচু করে সেখান থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে ওয়াশিংটন। তত দিনে ৫৮ হাজারের বেশি সৈনিকের প্রাণ চলে গিয়েছে সেখানে।
৯/১১ জঙ্গি হামলার পর ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা। প্রাথমিক সাফল্য এলেও হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে টানা দু’দশক যুদ্ধ লড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। তাতেও তালিবানের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি তারা। শেষে ২০২১ সালে ‘কাবুলিওয়ালার দেশ’ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ওয়াশিংটন। এটি ছিল ‘সুপার পাওয়ার’ রাষ্ট্রটির হার স্বীকার করে নেওয়ার শামিল।
আফগান যুদ্ধে প্রায় ২,৫০০ সৈনিক হারায় আমেরিকা। এই লড়াইয়ে তাঁদের খরচ হয়েছিল ৭৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। সেই পরিস্থিতি যাতে ফের তৈরি না হয়, তার জন্য ট্রাম্পকে ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী। এই অবস্থায় আক্রমণের ঝাঁজ বাড়িয়ে ইরানকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করবেন তিনি? না কি পথ খুঁজবেন রণাঙ্গন থেকে বেরোবার? আগামী দিনেই মিলবে তার উত্তর।