ISRO faces tough phase amid back to back PSLV failure, is it sabotage or technical glitch dgtl
ISRO’s PSLV Failure
এক বছরে দু’বার, ফের মহাকাশে মুখ পুড়ল ইসরোর! যান্ত্রিক ত্রুটিতে হারিয়ে গেল ‘কাজের ঘোড়া’? না কি নেপথ্যে অন্তর্ঘাত?
নতুন বছরে ফের ১৫টি কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাশূন্যে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হল ইসরোর ভরসার পিএসএলভি। ২০২৫ সালের মে মাসেও একই ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তৈরি ওই রকেট, যার জেরে অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৮
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
এক বছরে দু’বার। ফের ১৫টি কৃত্রিম উপগ্রহকে অন্তরীক্ষে পাঠাতে ব্যর্থ হল ইসরো (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজ়েশন)। ৬৪তম উৎক্ষেপণের কিছু ক্ষণের মধ্যেই যান্ত্রিক গোলযোগের মুখে পড়ে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তৈরি ‘পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল’ বা পিএসএলভি-সি৬২ রকেট। সত্যিই কি যান্ত্রিক ত্রুটি, না কি ব্যর্থতার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে কোনও অন্তর্ঘাত? ঘটনাপরম্পরা বিশ্লেষণ করে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন অনেকেই। অন্য দিকে, বিতর্ক কাটাতে এই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছেন খোদ ইসরোর চেয়ারম্যান।
০২১৮
নতুন বছরের গোড়ায় ধাক্কা খাওয়া এই অভিযানকে ঘিরে সন্দেহ দানা বাঁধার নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইসরো নির্মিত রকেটগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভরসাযোগ্য হল পিএসএলভি। মহাশূন্যে কৃত্রিম উপগ্রহ ছেড়ে আসার নিরিখে এর সাফল্যের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। একসঙ্গে ১০৪টি কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপনের রেকর্ড রয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার এই রকেটের। পিএসএলভিতে ভরসা করেই চন্দ্রযান-১ এবং মঙ্গল অভিযানে সাফল্য পায় ইসরো।
০৩১৮
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দু’দশকে মাত্র পাঁচ বার ব্যর্থ হয়েছে এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তৈরি ওই রকেট। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জেরে ইসরোর কাছে বরাবরই ‘ওয়ার্কিং হর্স’ বা ‘কাজের ঘোড়ার’ তকমা পেয়ে এসেছে পিএসএলভি। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) মে মাসে প্রথম বার আঘাত লাগে সেই ভরসায়। সময়ের চাকা ঘুরে ২০২৬ সালের গোড়ায় একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করল ওই রকেট। দেশের তাবড় মহাকাশ গবেষকদের চোখে তা বেশ অস্বাভাবিক। আর তাই জোরালো হচ্ছে অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব।
০৪১৮
দ্বিতীয়ত, পিএসএলভির ব্যর্থতায় মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়া ১৫টি কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যে একটি ছিল ‘আর্থ অবজ়ারভেশন স্যাটেলাইট-এন১’ (ইওএস-এন১), যার নির্মাণকারী সংস্থা হল ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)। মূলত চিন ও পাকিস্তানের মতো শত্রু দেশগুলির হাঁড়ির খবর জোগাড় করতে সংশ্লিষ্ট উপগ্রহটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হচ্ছিল। সামরিক বিজ্ঞানীরা এর নাম রাখেন ‘অন্বেষা’, যার শতাধিক রং চিহ্নিত করার ক্ষমতা ছিল।
০৫১৮
মহাশূন্যে ‘অন্বেষা’ পৌঁছোলে তা যে বেজিং ও ইসলামাবাদের উদ্বেগ বাড়াত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেই কারণেই পিএসএলভির এ বারের ব্যর্থতাকে বাঁকা চোখে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, মাত্র আট-নয় মাসের মধ্যে কী ভাবে একই প্রযুক্তিগত ভুল করলেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা, না কি সংশ্লিষ্ট সংস্থায় ঢুকেছে শত্রুর পাঠানো কোনও বিষাক্ত সাপ? আর তাই পিএসএলভির পরপর ব্যর্থতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন তাঁরা।
০৬১৮
গত বছরের (২০২৫ সালে) অগস্টে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মহেন্দ্র প্রসাদ নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে রাজস্থান পুলিশ। ডিআরডিওর জয়সলমেরের অতিথিশালায় (গেস্ট হাউস) ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত ছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থাটির বেশ কিছু সংবেদনশীল তথ্য ইসলামাবাদে পাচারের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের মে মাসে রাওয়ালপিন্ডির জন্য চরবৃত্তির অভিযোগে তদন্তকারীদের জালে ধরা পড়েন ডিআরডিওর বিজ্ঞানী প্রদীপ কুরুলকর।
০৭১৮
জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বারের জন্য পিএসএলভি ব্যর্থ হতেই এই দুই ঘটনার কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রকে সতর্ক করেছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরেই ডিআরডিওর ক্ষেপণাস্ত্র, রেডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) এবং লেজ়ার হাতিয়ারের ফর্মুলা চুরির করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাক গুপ্তচরবাহিনী আইএসআই (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স)। সেই কারণেই চর মারফত ‘অন্বেষা’য় অন্তর্ঘাত করা তাদের পক্ষে একেবারেই অস্বাভাবিক নয়।
০৮১৮
অনেকে আবার এই ঘটনার সঙ্গে ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং দুবাই এয়ারশোয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভারতীয় লড়াকু জেট ‘তেজস’ ভেঙে পড়ার তুলনা টেনেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছরের (২০২৫ সালে) মে মাসে পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সামরিক অভিযান চালায় নয়াদিল্লি। এ দেশের ফৌজের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গুঁড়িয়ে যায় ইসলামাবাদের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি (এয়ারফিল্ড)। ‘সিঁদুর’-এর সেই লড়াই থামার কয়েক দিনের মাথাতেই কৃত্রিম উপগ্রহ মহাশূন্যে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয় পিএসএলভি।
০৯১৮
২০২৫ সালের নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাইয়ে এয়ারশো চলাকালীন হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভারতের ‘তেজস’ লড়াকু জেট। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ককপিটে থাকা উইং কমান্ডার নমন স্যালে। বিশ্লেষকদের দাবি, এতে সর্বাধিক লাভবান হয় পাকিস্তান। কারণ ওই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়ে নয়াদিল্লির অত্যাধুনিক হাতিয়ারগুলির গুণগত মান। ফলে চিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমান বিক্রির সুযোগ পেতে শুরু করেছে রাওয়ালপিন্ডি।
১০১৮
সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, পিএসএলভির ব্যর্থতার নেপথ্যে পাক গুপ্তচরবাহিনী আইএসআইয়ের হাত থাকলে দ্বিমুখী সুবিধা পাবে ইসলামাবাদ। প্রথমত, এর মাধ্যমে ‘অন্বেষা’র মতো অত্যাধুনিক সামরিক কৃত্রিম উপগ্রহের শ্যেন দৃষ্টির আড়ালে যেতে পারবেন রাওয়ালপিন্ডির সেনা কমান্ডারেরা। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুখ পুড়েছে ভারতের। ফলে আগামী দিনে ইউরোপের দেশগুলির থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ মহাশূন্যে পাঠানোর বরাত কম পেতে পারে ইসরো। এতে সংগঠনটির সুনাম ও আর্থিক স্বাস্থ্য যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা বলাই বাহুল্য।
১১১৮
প্রযুক্তিবিদদের একাংশ আবার এই ঘটনার জন্য ইসরোর বিজ্ঞানীদের মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসকে দায়ী করেছেন। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কৃত্রিম উপগ্রহ বা রকেট নির্মাণের আশঙ্কাকে একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের সঙ্গেও পাকিস্তানের যোগাযোগ থাকতে পারে। আর তাই মহাকাশ গবেষকদেরও তদন্তের আওতায় আনার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন অনেকেই।
১২১৮
এ ছাড়া পিএসএলভির ব্যর্থতায় ইসরোর ‘অন্তর্কলহের’ দিকেও আঙুল তুলেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। ২০২৩ সালে মালয়ালম ভাষায় লেখা সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির সাবেক চেয়ারম্যান এস সোমনাথের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী ‘নিলাভু কুদিচা সিমহঙ্গল’-এর (চাঁদের আলো পান করা সিংহেরা) বেশ কিছু তথ্য সমাজমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। সেখানে পূর্বসূরি কে শিবন সম্পর্কে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ করেন তিনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে দেশ জুড়ে শুরু হয় হইচই। ফাঁস হওয়া ওই তথ্যের সত্যতা অবশ্য যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
১৩১৮
সমাজমাধ্যমে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরো চেয়ারম্যান থাকাকালীন সোমনাথের পদোন্নতিতে যথেচ্ছ বাধা তৈরি করেন শিবন। এর পাশাপাশি সেখানে ‘চন্দ্রযান-২’র ব্যর্থতার জন্যেও পূর্বসূরিকে দায়ী করেছেন ‘নিলাভু কুদিচা সিমহঙ্গল’ লেখক। ভাইরাল হওয়া অপ্রকাশিত বইটির পাতায় আরও বলা হয়েছে যে অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই ‘চন্দ্রযান-২’র উৎক্ষেপণের নির্দেশ দেন শিবন। ফলে চন্দ্রপৃষ্ঠে নামার ঠিক আগে ভেঙে পড়ে ওই নভোযান।
১৪১৮
২০২৩ সালে এই ইস্যুতে হইচই শুরু হতেই সংশ্লিষ্ট আত্মজীবনীর প্রকাশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন সোমনাথ। এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘‘জীবনে সাফল্য পেতে হলে সবাইকেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আত্মজীবনীতে আমি কিছু বিষয় তুলে ধরেছি। কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে আক্রমণ করিনি। কাউকে সমালোচনার জন্য এই বই নয়।’’ তার পরেও অবশ্য বিষয়টি নিয়ে জল্পনা থামেনি।
১৫১৮
পিএসএলভি ব্যর্থ হওয়ায় সোমনাথের পুরনো কথার রেশ টেনে তাই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের যুক্তি, ‘চন্দ্রযান-২’র ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে কৃত্রিম উপগ্রহগুলির ক্ষেত্রেও তা হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। বিজ্ঞানীদের নিজেদের মধ্যে রেষারেষি দেশের বড় ক্ষতি করছে কি না সে দিকে কেন্দ্রের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তাঁরা।
১৬১৮
গত ১২ জানুয়ারি সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশকেন্দ্র থেকে ১৫টি কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে অন্তরীক্ষে পাড়ি দেয় পিএসএলভি-সি৬২, যার মধ্যে ডিআরডিওর ‘অন্বেষা’ ছাড়াও ছিল হায়দরাবাদের বেসরকারি সংস্থা ‘ধ্রুব স্পেস’-এর সাতটি উপগ্রহ। এ ছাড়া ফ্রান্স, স্পেন, নেপাল, ব্রাজ়িল-সহ বিভিন্ন দেশের আটটি কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার।
১৭১৮
ওই দিন সকাল পৌনে ১১টা নাগাদ ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন বলেন, ‘‘অভিযানের তৃতীয় ধাপে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার জেরে গতিপথ থেকে রকেটটির বিচ্যুতি ঘটে।’’ পিএসএলভির মোট চারটি ধাপ ছিল। এর মধ্যে দু’টি কঠিন (সলিড) এবং দু’টি তরল (লিকুইড) জ্বালানি দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা। সূত্রের খবর, বিচ্যুতির জেরে রকেটটির উচ্চতা এবং গতিবেগ ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মানের অনেক নীচে নেমে যায়। ফলে ব্যর্থ হয় অভিযান।
১৮১৮
ইসরো অবশ্য ‘অন্তর্ঘাতের’ তত্ত্ব মানতে চায়নি। মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটির চেয়ারম্যান একে কেবলমাত্র প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসাবেই চিহ্নিত করেছেন। তবে কেন বার বার পিএলএলভি ব্যর্থ হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্য দিকে আলাদা করে এখনও পর্যন্ত কোনও তদন্তের নির্দেশ দেয়নি কেন্দ্র। ফলে যাবতীয় সমালোচনা উড়িয়ে ইসরো ফের কবে স্বমহিমায় ফিরে আসে, সেটাই এখন দেখার।