কোটি কোটির জাকিরকে তৃণমূলে আনেন শুভেন্দু, ভোটের আগে বোমায় জখম, ধনী বিধায়কের জীবন-নাটক
মুর্শিদাবাদের বিড়ি শিল্পপতিদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাকির হোসেন। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চালকল-সহ একাধিক ব্যবসা রয়েছে তাঁর। বৃহস্পতিবার তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছে আয়কর দফতর।
মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমায় বিড়ি শিল্পপতিদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাকির হোসেন। অল্প বয়সেই ব্যবসায়িক শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে রাজ্যের অন্যতম শিল্পপতিদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। সুতি বিধানসভা এলাকার ঔরাঙ্গাবাদে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়ি অনেকের নজর কাড়ে। সেখানেই রয়েছে তাঁর বিড়ি তৈরির কারখানা।
একটা সময় পর্যন্ত কেবল নিজের ব্যবসা নিয়েই থাকতেন জাকির। বিড়ি ব্যবসা ছাড়াও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চালকল-সহ একাধিক ব্যবসা রয়েছে তাঁর। ঘনিষ্ঠ মহলে জাকির বলেন, মুর্শিদাবাদে অনেক বিড়ি ব্যবসায়ী আছেন, তবে তাঁর চেয়ে বেশি আয়কর দেন না কেউ।
২০০৪ সালে যখন প্রণব মুখোপাধ্যায় জঙ্গিপুর লোকসভায় জয়ী হয়ে সাংসদ হন, তখন থেকেই তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন জাকির। তৎকালীন মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীরও ‘ঘনিষ্ঠবৃত্তে’ ছিলেন তিনি। এই সময় মুর্শিদাবাদে রাজনীতি না করেও রাজনীতিকদের থেকে অনেক বেশি ‘ক্ষমতাবান’ ছিলেন জাকির।
আচমকাই ২০১৫ সালে রাজনীতিতে নামার কথা ঘোষণা করেন জাকির হোসেন। সেই সময় তৃণমূলের মুর্শিদাবাদ জেলার পর্যবেক্ষক ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর হাত ধরেই সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন তিনি।
২০১৬ সালে জঙ্গিপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জাকির। সেই নির্বাচনে হলফনামায় নিজের সম্পত্তির পরিমাণ ২৭ কোটি বলে জানিয়েছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা বর্ষীয়ান বিধায়ক মহম্মদ সোহরাবকে পরাজিত করে জয় পান। যদিও জাকিরের সঙ্গে লড়াইয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন আরএসপি প্রার্থী।
আরও পড়ুন:
প্রথম বার বিধায়ক হয়েই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় জায়গা পান জাকির। শ্রম দফতরের প্রতিমন্ত্রী করা হয় তাঁকে। পাঁচ বছর এই দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় বিধায়ক হিসাবে ভোটদান করতে গিয়ে নিজের ভোটটি নষ্ট করে ফেলেছিলেন জাকির। ঘটনাচক্রে, ওই দিনই বিধানসভায় ছিল মন্ত্রিসভার বৈঠক। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর ভোট নষ্ট হওয়ার খবরটি জানাজানি হতেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর ভর্ৎসনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।
২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি নিমতিতা স্টেশনে কলকাতাগামী ট্রেনে উঠতে এসে বোমার আঘাতে মারাত্মক জখম হন জাকির হোসেন। তাঁর ডান পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। হাঁটাচলাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এই সময়। বর্তমানে তাঁর উপর আক্রমণের ঘটনার তদন্ত করছে এনআইএ।
বোমার আঘাতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন জাকির। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শয্যাশায়ী অবস্থাতেই জঙ্গিপুর বিধানসভায় ফের তৃণমূলের মনোনয়ন পান। কিন্তু কোভিডে আক্রান্ত হয়ে বামফ্রন্টের আরএসপি প্রার্থীর মৃত্যু হলে জঙ্গিপুরে ভোট পিছিয়ে যায়। বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই জঙ্গিপুরে ভোট করাতে চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে দেয়।
আরও পড়ুন:
৩০ সেপ্টেম্বর ভবানীপুর বিধানসভার উপনির্বাচনের সঙ্গেই ভোট হয় জঙ্গিপুর ও মুর্শিদাবাদের আরও একটি কেন্দ্র সামশেরগঞ্জে। ৩ অক্টোবর ফলাফল ঘোষণায় সব ক’টি বিধানসভা আসনেই জয় পায় তৃণমূল। প্রত্যাশা মতোই জঙ্গিপুরে জেতেন জাকির। জন্মসূত্রে সুতির বাসিন্দা হলেও বিধায়ক হিসাবে জঙ্গিপুরেও নিজের জন্য একটি অট্টালিকা নির্মাণ করেছেন তিনি।
নির্দিষ্ট সময়ে জঙ্গিপুরে ভোট না হওয়ায় বিগত মন্ত্রিসভার সদস্য জাকিরকে বাইরে রেখে মন্ত্রিসভা গঠন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই বর্তমান মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি জঙ্গিপুরের বিধায়কের।
বর্তমানে রাজনীতি ও ব্যবসার চেয়ে নিজের পায়ের চিকিৎসা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন জাকির। মুম্বই ও চেন্নাইয়ে গিয়ে বেশ কয়েক বার অস্ত্রোপচার করিয়ে এসেছেন তিনি। তার ফলে লাঠি ছেড়ে হাঁটতে পারছেন। কিন্তু এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন বলেই ঘনিষ্ঠ মহলে দাবি করেন। তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে এনআইএ-র বিরুদ্ধে ক্ষোভের অন্ত নেই তাঁর।
সম্প্রতি চিকিৎসকদের পরামর্শে জার্মানি গিয়ে পায়ের চিকিৎসা করানোর বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন এই শিল্পপতি রাজনীতিক। সেই ভাবনার মাঝেই তাঁর বাড়িতে আচমকা হানা দিল আয়কর দফতর।
তাঁর উপর আক্রমণকারীরা এখনও গ্রেফতার না হওয়ায় ঘনিষ্ঠ মহলে আক্ষেপ করেন জাকির। তাঁরা ধরা পড়লে তাঁর মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হত বলেও দাবি করেন তিনি।
ব্যবসা ও রাজনীতির পাশাপাশি জঙ্গিপুর মহকুমা এলাকায় বহু সমাজ কল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন জাকির। সকালে ঔরঙ্গাবাদের বাড়ির বাইরে নিজের ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। ঔরঙ্গাবাদের বাড়িতে থাকলে হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভোলেন না।