ব্যবসায়ী স্বামীর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ, বিয়ের ছ’মাসে বিচ্ছেদ, বলিউডে ‘প্রতারিত’ ইরানের অভিনেত্রী!
আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর মুক্ত ইরানের স্বপ্ন দেখছেন নায়িকা। এমন এক দেশ, যেখানে মহিলারা স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবেন, নিজেদের পছন্দমতো পোশাক পরতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন।
দেশে যুদ্ধ চলছে। কর্মসূত্রে বিদেশে থাকলেও মন পড়ে রয়েছে দেশেই। নিজের দেশের মানুষের জন্য মোমবাতি মিছিল করতে চেয়েছেন। অনুমতি পাননি। এমনকি, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হওয়ায় ‘তথাকথিত’ বন্ধুদের হারিয়েছেন। যে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করবেন বলে দেশ ছেড়েছিলেন, সেই ইন্ডাস্ট্রিই নাকি ‘মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে’। তাই আর ভারতে এক মুহূর্ত থাকতে চান না ইরানের অভিনেত্রী মন্দনা কারিমি।
১৯৮৮ সালের মে মাসে ইরানের তেহরানে জন্ম মন্দনার। তাঁর বাবা ইরানের নাগরিক এবং মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। বাবা-মা, দাদা এবং ভাইয়ের সঙ্গে তেহরানে থাকতেন তিনি। তাঁর আসল নাম অবশ্য মানিজ়ে কারিমি। ছোটবেলা থেকে সিনেমা দেখতে খুব ভালবাসতেন মন্দনা। সচরাচর ইরানের চলচ্চিত্রই দেখতেন তিনি।
মন্দনা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বাড়িতে ভিডিয়ো ক্যাসেটে সিনেমা দেখার উপর ইরান সরকারের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবুও তাঁর বাবা গোপনে ‘শোলে’র ক্যাসেট বাড়িতে এনেছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে ‘শোলে’ দেখেছিলেন তিনি। তার পর থেকেই ভারতীয় সিনেমার প্রতি আগ্রহ জাগে মন্দনার।
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য দুবাই চলে যান মন্দনা। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিমানসেবিকা হিসাবে কেরিয়ার গড়ে তোলেন তিনি। কিন্তু বেশি দিন সেই পেশায় থাকতে পারেননি মন্দনা। ধীরে ধীরে মডেলিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
মডেলিংয়ের সূত্রে দেশে-বিদেশের নানা জায়গায় ঘুরতে হত মন্দনাকে। সেই সূত্রে তিন মাসের জন্য ভারতেও থাকতে হয়েছিল তাঁকে। পরিবারের থেকে আলাদা থাকলেও ভারতের প্রেমে পড়ে যান তিনি। এখানেই থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন মন্দনা।
আরও পড়ুন:
বিমানসেবিকার চাকরি ছেড়ে ইরান থেকে মুম্বই চলে যান মন্দনা। মডেলিংজগতে কম সময়ের মধ্যেই পরিচিতি তৈরি করে ফেলেন তিনি। ললিত তেহলান নামের এক মডেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন মন্দনা। তাঁদের বিয়ের শংসাপত্রের ছবি সমাজমাধ্যমের পাতায় ছড়িয়ে পড়ায় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন মন্দনা।
শংসাপত্রে মন্দনার নাম মানিজ়ে কারিমি বলে উল্লেখ ছিল। প্রথমে মন্দনা অস্বীকার করে জানিয়েছিলেন যে, এটি তাঁর নাম নয়। কিন্তু পরবর্তী কালে দেখা যায়, তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলের পাতায় মানিজ়ে নামটি রয়েছে।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, ইরানের নাগরিক মন্দনার ভারতে আসার পর ‘ওয়ার্ক পারমিট’ পেতে সুবিধা হতে পারে ভেবে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক মন্দিরে গোপনে ললিতকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু মন্দনা সব অস্বীকার করে জানিয়েছিলেন যে, ললিতের সঙ্গে তিনি যে ডেট করছিলেন, সে কথা ১০০ শতাংশ সত্য। কিন্তু তাঁদের বিয়ের খবর পুরোপুরি ভুয়ো।
২০১৩ সাল থেকে মুম্বইয়ে পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন মন্দনা। শাহরুখ খান, সইফ আলি খান, করিনা কপূর খান, শাহিদ কপূরের মতো তাবড় তাবড় বলি তারকার সঙ্গে বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে রণবীর কপূর অভিনীত ‘রয়’ ছবিতে অতিথিশিল্পী হিসাবে মুখ দেখা যায় মন্দনার।
আরও পড়ুন:
২০১৫ সালে কুণাল খেমু অভিনীত ‘ভাগ জনি’ ছবিতে মুখ্যচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান মন্দনা। একই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ম্যায় অউর চার্লস’ ছবিতে চার্লস শোভরাজের সহকারীর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় তাঁকে। ২০১৬ সালে ‘কয়া কুল হ্যায় হম ৩’ ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। ছবির পরিচালক উমেশ ঘাগড়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছিলেন মন্দনা।
মন্দনার অভিযোগ, উমেশ নাকি যখন-তখন তাঁকে সেটে ডেকে পাঠাতেন। যে ধরনের পোশাক পরার কোনও প্রয়োজন ছিল না, সেই ধরনের পোশাক পরতে বলতেন মন্দনাকে। কোনও গানের শুট চলাকালীন হঠাৎ করেই মন্দনাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হত। ‘শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি করতেন উমেশ। বলিউডের ছবিনির্মাতা সাজিদ খানের বিরুদ্ধেও ২০১৮ সালে ‘মিটু’ আন্দোলনের সময় অভিযোগ করেছিলেন মন্দনা।
ভারতীয় ব্যবসায়ী গৌরব গুপ্তের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন মন্দনা। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে গৌরবকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু বিয়ের পর সেই সংসার ছ’মাসও টেকেনি। স্বামী এবং শাশুড়ির বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসা এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করেন মন্দনা। পরে নিজেই সেই অভিযোগ ফিরিয়ে নেন। আলাদা থাকতে শুরু করেন। ২০২১ সালে আইনি বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাঁর।
শোনা যায়, আইনি বিচ্ছেদের পর মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের পুত্র পার্থ পাওয়ারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন মন্দনা। তাঁরা একই জায়গা থেকে আলাদা আলাদা ভাবে নিজেদের ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করতেন। ফলত, তিল থেকে তাল করতে বেশি সময় নেননি নেটাগরিকেরা।
ঘনিষ্ঠমহলের মতে, পার্থের রাজনৈতিক কেরিয়ার এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে মন্দনার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁরা যে দীর্ঘ দিন ডেট করছিলেন তা নাকি জানতেন ঘনিষ্ঠজনেরাই। মন্দনা এবং পার্থ কখনওই তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খোলেননি।
অনুমান, পার্থের সঙ্গে বর্তমানে কোনও সম্পর্ক নেই মন্দনার। ২০২২ সালে এক অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগত জীবন এবং অতীতের সম্পর্ক নিয়ে প্রসঙ্গ উঠলে মন্দনা জানিয়েছিলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য সব সময় সুখকর হয়নি। বলিপাড়ার অধিকাংশের দাবি, মন্দনার এই মন্তব্য পার্থের সঙ্গে বিচ্ছেদের ইঙ্গিত বহন করে।
২০১৫ সালে জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘বিগ বস্ ৯’-এ অংশগ্রহণ করে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে প্রথম তিন জন প্রতিযোগীর তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেন মন্দনা। ২০২২ সালে বলি অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত সঞ্চালিত ‘লক আপ’ নামের একটি অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। একই বছর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘থার’ ছবিতে অভিনয় করেন মন্দনা। তার পর আর মন্দনাকে কোথাও দেখা যায়নি।
আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর নতুন শাসনতন্ত্র নিয়ে খুব আশাবাদী মন্দনা। কিন্তু ভারতের প্রতি ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘আমার ব্যাগ গোছানো রয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে ভারত ছেড়ে চলে যাব। আমার মনে হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে।’’
খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর মুক্ত ইরানের স্বপ্ন দেখছেন মন্দনা। যেখানে মহিলারা স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবেন, নিজেদের পছন্দমতো পোশাক পরতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির কাছে কোনও হুমকি না হয়ে বরং একটি গঠনমূলক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করুক ইরান, এমনটাই চান মন্দনা।
মন্দনা জানান, খুব অল্প বয়সে ভারতে এসে কেরিয়ার, ভালবাসা এবং বন্ধু— সবই পেয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি নিজের ‘কণ্ঠস্বর’ হারিয়ে ফেলেছেন বলে অনুভব করছেন। ইরানের নাগরিক হিসাবে নিজের দেশের মানুষের জন্য মোমবাতি মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হয়নি তাঁকে। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার কারণে বহু বন্ধুবিয়োগ হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
মন্দনার দাবি, গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে প্রচুর কাজ হারিয়েছেন তিনি। ভারতে থেকে নিজেকে ‘প্রতারিত’ বলে বোধ করছেন মন্দনা। তাই ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা চালু হলে ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইরানের অভিনেত্রী।