জলের নীচে থাকতে পারে ২৫ বছর! তূণীরে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র নিয়ে আরব সাগরে হাজির ব্রিটেনের ‘অদৃশ্য তলোয়ার’
মার্চের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থের উপকূল সংলগ্ন এলাকা ছেড়ে আরব সাগরের দিকে রওনা দেয় এইচএমএস অ্যানসন। প্রায় ৮,৮০০ কিলোমিটারের জলপথ পাড়ি দিয়ে ব্রিটিশ ডুবোজাহাজটি রয়েছে আরব সাগরেই। এর সবচেয়ে ঘাতক অস্ত্রটি হল টোমাহক।
পেটের মধ্যে লুকোনো বিশ্বের অন্যতম বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। সেই বহর নিয়ে আরব সাগরে রয়েছে রয়্যাল নেভির অত্যাধুনিক এবং অন্যতম জটিল প্রযুক্তির পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণকারী সাবমেরিন এইচএমএস অ্যানসন। ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ব্রিটিশ-মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরের দিনই আরব সাগরে তাদের শক্তিশালী নৌযান পাঠিয়ে দিয়েছে ব্রিটেন।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে জলযুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে মহড়া নেওয়ার প্রস্তুতি সেরে রাখছে ব্রিটিশ নৌসেনা। সংঘর্ষ আরও বৃদ্ধি পেলে এখান থেকে যে কোনও দূরপাল্লার নিশানায় আক্রমণ শানাতে পারবে তারা। ওয়াকিবহাল মহলের অনুমান, সেই কৌশলগত সুবিধার জন্যই ডুবোজাহাজটিকে পাঠানো হয়েছে আরব সাগরে।
গত মার্চের শুরুর দিকেই অস্ট্রেলিয়ার পার্থের উপকূল সংলগ্ন এলাকা ছেড়ে আরব সাগরের দিকে রওনা দেয় এইচএমএস অ্যানসন। প্রায় ৮,৮০০ কিলোমিটারের জলপথ পাড়ি দিয়ে সেই ডুবোজাহাজটি রয়েছে আরব সাগরেই।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত যে দিকে মো়ড় নিয়েছে তাতে ইরানের নিশানায় রয়েছে ব্রিটেনও। ওই অঞ্চলে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলিকে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করছে মার্কিন সেনা। শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক উদ্দেশ্যেই সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ব্রিটেন। অনুমান করা হচ্ছে, সেই কারণেই ইরান ব্রিটেনকে তাদের নতুন প্রতিপক্ষ বলে মনে করতে শুরু করছে। ফলত ব্রিটিশ ঘাঁটিকেও নিশানা করেছে তেহরান।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ বায়ুসেনার ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়। দু’টি ড্রোন দিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। তার মধ্যে একটি ধ্বংস করে ব্রিটিশ বাহিনী। অন্যটি আছড়ে পড়ে রানওয়েতে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে এই হামলায় প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয় ইরানই হামলা চালিয়েছে।
আরও পড়ুন:
হামলায় যে ইরানের হাত রয়েছে তা স্বীকার করেনি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, ওই ড্রোনটি ইরান থেকে ছোড়াই হয়নি। তবে কোথা থেকে ড্রোনটি ছোড়া হয়েছিল, তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি ব্রিটেন। এই ঘটনার পরেও ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গ্রাসিয়ায় ব্রিটিশ-মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পর পর দু’টি মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
আচমকা হামলা হলে তার পাল্টা জবাব দিতে ডুবোজাহাজ মোতায়েন করে আরব সাগরে টহল দিতে শুরু করে ব্রিটেন। পারমাণবিক এই ব্রিটিশ ডুবোজাহাজটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে ওঠে। নর্থউডে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ‘পার্মানেন্ট জয়েন্ট হেডকোয়ার্টার্স’-এর সঙ্গে সেই সময় যোগাযোগ করে ডুবোজাহাজটি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত যে কোনও হামলার নির্দেশ সামরিক বাহিনীর এই যৌথ সদর দফতর থেকেই পাঠানো হয় ডুবোজাহাজে।
ব্রিটিশ নৌসেনার (রয়্যাল নেভি) এইচএমএস অ্যানসন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এবং শক্তিশালী একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ। এটি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অ্যাস্টিউট ক্লাস সিরিজ়ের পঞ্চম সাবমেরিন। ৯৭ মিটার দীর্ঘ ডুবোজাহাজটির নির্মাতা বিএই সিস্টেমস। ২০২২ সালের ৩১ অগস্ট এটি আনুষ্ঠানিক ভাবে রয়্যাল নেভিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
আরব সাগরে অবস্থান করার অর্থ হল এই ডুবোজাহাজটির সাহায্যে ইরান বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নজরদারি চালাবে ব্রিটেন। যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এই নিঃশব্দ শিকারি ডুবোজাহাজটি। শিকারি বেড়ালের মতো ওত পেতে বসে থেকে আঘাত করার ক্ষমতা রয়েছে এইচএমএস অ্যানসনের। অত্যন্ত ক্ষীণ অ্যাকোস্টিক সিগনেচারযুক্ত উন্নত সোনার রয়েছে এতে। ফলে অন্য ডুবোজাহাজের পক্ষে একে শনাক্ত করা কঠিন।
আরও পড়ুন:
সাধারণত জলের নীচে কোনও বস্তুর (যেমন ডুবোজাহাজ) উপস্থিতি নির্ধারণ করা হয় নির্গত শব্দের অনন্য নকশা থেকে। একেই ‘সোনার সিগনেচার’ বা শব্দচিহ্ন বলা হয়। নৌবাহিনী বা ডুবোজাহাজের চালকেরা এই নকশা বিশ্লেষণ করে শত্রুর জাহাজ বা ডুবোজাহাজের ধরন ও অবস্থান শনাক্ত করে থাকেন।
একে শনাক্ত করা এমনিতেই কঠিন। এর উপর ডুবোজাহাজটিতে বিশ্বের অন্যতম উন্নত সোনার সিস্টেম রয়েছে। সেটি এতটাই সংবেদনশীল যে ৪৮২৮ কিমি দূর থেকে অন্য কোনও জাহাজ বা ডুবোজাহাজের উপস্থিতি টের পায় এই ব্রিটিশ ডুবোজাহাজটি।
এই ডুবোজাহাজের সবচেয়ে ঘাতক অস্ত্রটি হল টোমাহক ব্লক চার। এই মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত ব্রিটিশ নৌযানটি ১,৬০০ কিমি পাল্লার যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। অর্থাৎ, মাঝসমুদ্র থেকেই এটি স্থলের গভীরে নিখুঁত ভাবে আক্রমণ করতে পারে। সবচেয়ে ঘাতক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র বলে মনে করা হয় টোমাহককে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ১৬০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করতে পারে।
এই ক্ষেপণাস্ত্র ৪৫৩ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে নিখুঁত ভাবে হামলা চালাতে পারদর্শী। তবে এই ক্ষেপণাস্ত্রের ‘অ্যাডভান্স ভার্সন’ ২৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করতে পারে। ঘণ্টায় ৮৮০ কিমি বেগে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে পারে। এ ছাড়াও ডুবোজাহাজে থাকা স্পিয়ারফিশ টর্পেডোটি প্রায় ২৩ কিমি দূরের শত্রুপক্ষের নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম।
৩০০ মিটার গভীরতা এবং ঘণ্টায় ৫৬ কিমি গতিতে চলাচল করে ৭,৪০০ টনের শিকারি ডুবোজাহাজটি। পারমাণবিক চুল্লি দ্বারা চালিত ডুবোযানে জ্বালানি ভরার জন্য বন্দরে ফিরতে হয় না। টানা ২৫ বছর পর্যন্ত সাগরের নীচে থাকতে সক্ষম এটি। সমুদ্রের নোনাজল থেকে অক্সিজেন এবং পানযোগ্য জল তৈরি করার প্রযুক্তি রয়েছে এই জাহাজে।
তবে এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হল, এতে ৯৮ জন নৌসেনা ও নাবিকের জন্য তিন মাসের রসদ মজুত করা যায়। পারমাণবিক শক্তিচালিত হওয়ায় এটি দিনের পর দিন সমুদ্রের গভীরে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে। গভীর জলের গা ঢাকা দিয়ে আক্রমণ শানানোর এই বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এটিকে ‘অদৃশ্য তলোয়ার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রতিরক্ষা সূত্রের মতে, এইচএমএস অ্যানসনের সঠিক অবস্থান অত্যন্ত গোপন রাখা হয়। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান নৌ কমান্ডার-সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরই জানানো হয় এর অবস্থান। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে একই জায়গায় থাকতে পারে এটি। নিঃশব্দে চলার সময়, জাহাজের ভিতরের পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন হয়ে ওঠে।
তখন ডুবোজাহাজে থাকা নৌসেনাদের জলের ব্যবহার সীমিত থাকে এবং নাবিকদের কঠোর নিয়ন মেনে চলতে হয়। যখন ডুবোজাহাজটি গোপন কোনও অভিযানে থাকে, তখন এর নাবিক বা সদস্যেরা কোনও রেডিয়োবার্তা পাঠাতে পারেন না। এমনকি পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করার অনুমতি থাকে না।
এতে ৩৮টি পর্যন্ত টর্পেডো এবং টমাহক রাখার জায়গা আছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলি উড়ানের সময় দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং ক্যামেরা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি ডুবোজাহাজে পাঠাতে পারে। প্রচলিত পেরিস্কোপের পরিবর্তে, এটিতে একটি বড় পর্দায় সমুদ্রপৃষ্ঠের দৃশ্য ফুটে ওঠে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি এক প্রতিরক্ষা সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, সমুদ্রে কোনও হুমকি এলে প্রত্যাঘাতের আদেশ বা অনুমোদন সরাসরি আসে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের কাছ থেকে।
বিপরীত দিকে ইরানি নৌবাহিনীর হাতে এসএইচ-৩ ডুবোজাহাজ-বিধ্বংসী হেলিকপ্টার রয়েছে, যা সোনার প্রযুক্তিতে সজ্জিত এবং মার্ক ৪৬ টর্পেডো দিয়ে ডুবোজাহাজ শনাক্ত ও আক্রমণ শানাতে পারে। এ ছাড়াও, তাদের রয়েছে ফতেহ এবং বেসাত শ্রেণির ডুবোজাহাজগুলি। সেগুলিকে ‘ক্যারিয়ার কিলার’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। এই শ্রেণির ডুবোযানগুলিকে আরব সাগরের গভীর সমুদ্রে অভিযানের জন্য বিশেষ ভাবে নকশা করেছেন ইরানি প্রতিরক্ষা গবেষকেরা।