মার্কিন দণ্ডমুণ্ডের কর্তার এই দাবিকে বরদাস্ত করা হবে না বলে জানিয়েছে গ্রিনল্যান্ডের ‘প্রকৃত অভিভাবক’ ডেনমার্ক। ইতিমধ্যেই বরফের ভূখণ্ডে সেনা নামিয়ে মার্কিন আগ্রাসন ঠেকানোর প্রস্তুতি সেরে রাখতে চাইছে তারা। খনিজ সম্পদে ভরপুর ‘সবুজ দ্বীপের’ মালিকানা নিজেদের হাত থেকে কোনও ভাবেই যাতে ফস্কে না যায় তা নিশ্চিত করতে চায় নর্ডিক দেশ ডেনমার্ক।
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়েছে ৩২টি দেশ নিয়ে গঠিত ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ বা নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) মধ্যেই। সেনা নামিয়ে আমেরিকার গ্রিনল্যান্ড দখল করার অর্থ হল পক্ষান্তরে নেটোর সদস্যরাষ্ট্রেরই ‘গায়ে হাত তোলা’। সবুজ দ্বীপের দখল নিয়ে ক্রমশ ফাটল চওড়া হচ্ছে নেটোর অন্দরে। ডেনমার্ক তার বন্ধুস্থানীয় রাষ্ট্রগুলিকে নিয়ে আমেরিকা বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে।
কোপেনহেগেনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতে, ‘সবুজ দ্বীপ’-এ আগ্রাসনের অর্থ হল সামরিক জোট নেটোর অবসান। গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সেনা অভিযান শুরু হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। অন্য দিকে, সত্যিই যদি নেটো ছেড়ে আমেরিকা বেরিয়ে আসে, তা হলে সংস্থাটিই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বে কি না এই ভাবনাও উঁকি দিয়ে চলেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় মৌলিক মতবিরোধ দেখা দেওয়ার পর মেরুদ্বীপের নিরাপত্তা জোরদার করতে ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ থেকে সৈন্যরা গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছে। ফ্রান্স ১৫ জন এবং জার্মানি ১৩ জন সৈন্য পাঠিয়েছে। নরওয়ে এবং সুইডেনও সৈন্য পাঠাচ্ছে। সমস্ত দেশের সৈন্য গ্রিনল্যান্ডে একজোট হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউই) পতাকা স্থাপন করবে বলে স্থির করা হয়েছে।
নেটোর সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নেটো-ভুক্ত অন্য কোনও জোট মহাশক্তিধর এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এই ধারণাটি কয়েক বছর আগে পর্যন্ত অকল্পনীয়ই ছিল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ৭৬ বছরের ইতিহাসে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা নেটো বিভিন্ন সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু আজকের মতো এত গুরুতর জটিল সমস্যার মুখোমুখি আর কখনও হয়নি। যদি নেটো সত্যিই ভাঙনের মুখে দাঁড়ায় বা সমস্ত আশঙ্কা সত্যি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয়, তা হলে কী হবে?
নেটো-ভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলির তুলনায় ওয়াশিংটন বছরের পর বছর ধরে জিডিপির দিক থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে অনেক বেশি জোর দিয়েছে। নেটোর মোট সামরিক ব্যয়ের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নেটোর সামরিক বহর আমেরিকার কাঁধেই বন্দুক রেখে চলে। ফলে কোনও কারণে ট্রাম্পের সরকার নেটোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে নেটোর বাকি দেশগুলিকে নিজেদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
এই নিয়ে সম্প্রতি লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ়ের (আইআইএসএস) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেটো থেকে সরে গেলে ভবিষ্যতে আর এক সুপার পাওয়ার দেশ রাশিয়ার হুমকির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ঐক্য রক্ষা করার জন্য নেটোর আর্থিক খরচ এবং প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ চতুর্গুণ বৃদ্ধি করতে হতে পারে। আইআইএসএসের মতে, এই খরচ ১ লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে।
যদিও নেটো জোটের সমস্ত রাষ্ট্র গত বছরের (২০২৫ সালের) জুনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে হোয়াইট হাউসকে সন্তুষ্ট করার জন্য নেটোর সদস্যেরা প্রতিরক্ষা এবং সম্পর্কিত খাতে ৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি করবে। অন্য দিকে, ২০২৭ সালের জন্য সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেড় লক্ষ কোটি ডলার (প্রায় ১৩৬ লক্ষ কোটি টাকা) করার প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ডিসেম্বরে মার্কিন কংগ্রেস ২০২৬ সালের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮১ লক্ষ কোটি টাকা বাজেট অনুমোদন করেছিল। ট্রাম্পের আবেদন কংগ্রেসের অনুমোদন পেলে পরবর্তী বছরে আমেরিকার সামরিক খাতে ব্যয়বরাদ্দ ৫০ শতাংশ বাড়বে।
নেটোর সদস্যেরা জোটের প্রস্তুতি এবং সামরিক ক্ষমতা জোরদার করার জন্য সহমতের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জন্য নেটোর অসামরিক বাজেট ৫২.৮২ কোটি ইউরো বা ৬২.৩ কোটি ডলার নির্ধারণ করেছে। সেখানে সামরিক বাজেট মোট ২৪২ কোটি ইউরো ধরা হয়েছে। আইআইএসএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ইউরোপ বিমান প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোয়েন্দা ক্ষেত্রে ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে নেটো, যা সমাধান করতে ১ লক্ষ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বার বার ইউরোপীয় নেটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত ব্যয় না করার এবং মার্কিন সামরিক শক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসের সর্বময় কর্তার সমালোচনার মুখে পড়ে গত বছর (২০২৫) মার্চের গোড়ার দিকে ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে, ইউরোপীয় নেতারা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের জন্য ১৫ হাজার কোটি ইউরো বা ১৬ হাজার কোটি ডলার ধার নিতে সম্মত হন। ফলে পরবর্তী ১০ বছরে প্রতিরক্ষার জন্য আরও ৬৫ হাজার কোটি ইউরো (৭০ হাজার কোটি ডলার) যোগ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩০টি নেটো সদস্যের ১৫ লক্ষ সক্রিয় সামরিক কর্মী রয়েছেন। আমেরিকা জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলে বাদবাকি সদস্য দেশগুলিকে ৩ লক্ষ সৈন্য যোগ করতে হবে। নেটোর প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইভো এইচ ডাল্ডারের মতে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এবং অসংগঠিত ভাবে নেটো ত্যাগ করে এবং ইউরোপের পাশ থেকে সরে যায়, তা হলে কয়েক দশক ধরে নির্মিত কাঠামো ভেঙে পড়বে। ইউরোপীয় দেশগুলির কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা সরবরাহ করেছে তা অবিলম্বে প্রতিস্থাপন করার জন্য সামরিক এবং প্রযুক্তিগত সম্পদ সে সব দেশের নেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটোর বাকি সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধান হল পারমাণবিক অস্ত্র। শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং ব্রিটেন পারমাণবিক অস্ত্রে বলীয়ান। তাদের সম্মিলিত মোট অস্ত্রের পরিমাণ প্রায় ৫১৫টি। নেটোর বাকি সদস্যদের পারমাণবিক ভাঁড়ার শূন্য। এটাই সবচেয়ে বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে রাশিয়ার দিক থেকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার কাছে বিশ্বের ১২,০০০-এরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার মজুত রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পরমাণু অস্ত্রের মালিকানা রয়েছে এই দুই সুপার পাওয়ার দেশের পারমাণবিক অস্ত্রাগারে। ৫,১৭৭টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ভাঁড়ারে। কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র থেকে শুরু করে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমারু বিমান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ঘায়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে গোটা শহর।
নেটোর সদস্যপদ প্রত্যাহার করলে আমেরিকারও কিছুটা ‘ব্যাকফুটে’ চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। নেটো ছাড়লে আমেরিকা ইউরোপে তার ৩১টি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার হারাবে। এই ঘাঁটিগুলি, বিশেষ করে জার্মানির রামস্টাইন, পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক মহড়া এবং শক্তি প্রদর্শনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে অস্ত্রব্যবসায়। ইউরোপের দেশগুলির প্রতিরক্ষা অস্ত্রের লোভনীয় বাজার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির। মারাত্মক ভাবে ঝুঁকির মুখে পড়বে মার্কিন অস্ত্রব্যবসা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউরোপে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি নাটকীয় ভাবে বেড়েছে বলে মত বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সমীক্ষক সংস্থার।
গ্রিনল্যান্ড ঘিরে আমেরিকা এবং ডেনমার্কের কূটনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে জড়িয়ে গিয়েছে ইউরোপ। যদিও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলির অবস্থান যে ট্রাম্প পছন্দ করছেন না, তা-ও সোমবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কথায়, “ইউরোপের উচিত রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে মন দেওয়া। সত্যি বলতে, আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন সেখানে কী চলছে। ইউরোপের উচিত গ্রিনল্যান্ডের বদলে ওই বিষয়টির উপরে মন দেওয়া।”
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy