সৌদির সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বলে হুঁশিয়ারি! যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইরানের পিঠে ছুরি বসাবে ‘মুসলিম ভাই’ পাকিস্তান?
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে হওয়া ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’র প্রসঙ্গ টেনে সংসদে বিবৃতি দিলেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার। ফলে পশ্চিম এশিয়ার সংঘর্ষে ইসলামাবাদের জড়িয়ে পড়া নিয়ে তীব্র হচ্ছে জল্পনা।
ইরান যুদ্ধে এ বার ‘মেগা এন্ট্রি’ নেবে পাকিস্তান? ‘ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ’কে (ইসলামিক ব্রাদারহুড) মাথায় রেখে তেহরানের পক্ষ নিয়ে ধরবে অস্ত্র? না কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে সাবেক পারস্যের পিঠে ছুরি বসাবে ইসলামাবাদ? পাক উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক দারের মন্তব্যে তীব্র হচ্ছে সেই জল্পনা। পাশাপাশি, ফের এক বার খবরের শিরোনামে চলে এসেছে সৌদি আরবের সঙ্গে তাঁদের ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’র প্রসঙ্গ।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতে আরব দুনিয়ার মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও দূতাবাসগুলিকে ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনে নিশানা করে তেহরান। পারস্যের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির রোষ থেকে বাঁচতে পারেনি ইহুদি রাষ্ট্রও।
লড়াইয়ের গোড়াতেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানকে নিশানা করে তেহরান। এই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির ঝাঁ-চকচকে শহরে এবং খনিজ তেলের খনি ও শোধনাগারে আছড়ে পড়েছে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র। তা ছাড়া হরমুজ় প্রণালী বন্ধ রেখে পাল্টা চাপ তৈরির কৌশল নিচ্ছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ। এই পরিস্থিতিতে ৩ মার্চ ইরানি বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ইশাক দার।
পরে এই প্রসঙ্গে পাক পার্লামেন্টে বিবৃতি দেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘সৌদির সঙ্গে আমাদের যে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, সেটা আমরা তেহরানকে বোঝাতে পেরেছি। তার পরেই ওরা রিয়াধের দিকে আক্রমণের ঝাঁজ কমিয়ে আনে।’’ যদিও তাঁর এই দাবির কোনও বাস্তবতা পাওয়া যায়নি। কারণ, দু’পক্ষের মধ্যে ফোনালাপের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরব মুলুকটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আরামকোর সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালায় আইআরজিসি।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে রিয়াধের সঙ্গে একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সারে ইসলামাবাদ। সেই সমঝোতায় বলা হয়েছে, এই দু’য়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত পরিস্থিতিতে পাক উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক দারের সংশ্লিষ্ট চুক্তিটির প্রসঙ্গ তোলা তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও পড়ুন:
কূটনীতিকদের কেউ কেউ মনে করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সৌদির হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে পাকিস্তান। তেহরান একের পর এক এলাকায় আক্রমণ শানালেও পাল্টা প্রত্যাঘাতের রাস্তা এখনও বেছে নেয়নি রিয়াধ। তবে আরব মুলুকটির যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমনের পক্ষে বেশি ক্ষণ ধৈর্য ধরে থাকা সম্ভব নয়। কারণ, শিয়া ফৌজের ক্ষেপণাস্ত্র তাণ্ডবের জেরে তেল উৎপাদন সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখতে হচ্ছে তাঁকে।
সরকারি ভাবে সৌদি অবশ্য পাকিস্তানের কাছে কোনও সামরিক সাহায্য চায়নি। তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ইসলামাবাদের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিবৃতি দেওয়ায় সন্দেহ দানা বাঁধছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা ছাড়া রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের কাছে দ্বিতীয় কোনও রাস্তা খোলা নেই। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে তীব্র হচ্ছে তেলসঙ্কট। আর তাই হরমুজ় এড়িয়ে বিকল্প পথে তরল সোনা আমদানি করতে রিয়াধের কাছে আর্জি জানিয়েছে সেখানকার শাহবাজ় শরিফ সরকার।
গত ৪ মার্চ এই ইস্যুতে বিবৃতি দেয় পাক প্রশাসন। সেখানে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রফতানির আর্জি নিয়ে সৌদির রাষ্ট্রদূত নওয়াফ বিন সৈয়দ অল-মালকির সঙ্গে দেখা করেন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলি পারভেজ মালিক। শুধু তা-ই নয়, এ ব্যাপারে রিয়াধের থেকে প্রয়োজনীয় আশ্বাস মিলেছে বলে দাবি ইসলামাবাদের। অর্থাৎ, আগামী দিনে লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং আরব সাগর হয়ে তেলবাহী জাহাজ বা ট্যাঙ্কার ঘরের মাটিতে আনবে পশ্চিমের প্রতিবেশী।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, এই পরিস্থিতিতে সৌদির হাত ছেড়ে দেওয়া কোনও অবস্থাতেই পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর আকার নিলে ‘ইসলামীয় ভ্রাতৃত্ববোধ’ ভুলে তেহরানের বিরুদ্ধে যে তাদের নামতে হবে, তা ভালই জানে ইসলামাবাদ। এর জেরে বার বার প্রতিরক্ষা সমঝোতার কথা বলে ইরানি আইআরজিসিকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ ইশাক দার। বস্তুত সাবেক পারস্যকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিতে চেয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
ইরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে আরও একটি যুক্তি রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই আর্থিক দিক থেকে দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ইসলামাবাদ। দেশ চালাতে ঘন ঘন আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার বা আইএমএফের থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে তাদের। এই সংস্থাটির উপর আমেরিকার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলা যেতে পারে। আর তাই দ্রুত লড়াই শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের তেহরান আক্রমণের নির্দেশ দিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও আছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কথায়, ইরান সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া যে একরকম ‘আত্মহত্যা’র শামিল তা ভালই জানেন পাক ফৌজের সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে তাঁর সেনা। ফলে পঠানভূমিতে তালিবান লড়াকুদের জোরালো প্রত্যাঘাতের মুখে পড়েছে ইসলামাবাদের বাহিনী। এই পরিস্থিতিতে আরও একটা ফ্রন্ট খোলা মুনিরের পক্ষে বেশ কঠিন।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমানহানায় ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা করে মার্কিন ও ইজ়রায়েল ফৌজ। পাশাপাশি, পারস্যের একটি স্কুলে বোমাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান। এই দুই ঘটনাকে আমেরিকা ও ইহুদিদের আগ্রাসন হিসাবেই দেখছে পশ্চিম এশিয়ার আরব দুনিয়া-সহ ইসলামিক বিশ্ব। ফলে জোড়া ‘সুপার পাওয়ারের’ বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে এককাট্টা হতে দেখা যাচ্ছে তাদের।
মার্কিন হামলায় নিহত স্কুলপড়ুয়াদের কফিনের ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে ইরানি বিদেশ মন্ত্রক। তা ছড়িয়ে পড়তেই দুনিয়া জুড়ে ওঠে নিন্দার ঝড়। ‘আগ্রাসী’ আমেরিকার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয় পশ্চিম এশিয়ার একাধিক মুসলিম জনবহুল দেশে। সেই আঁচ এসে পড়েছে পাকিস্তানেও। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর পরই মার্কিন উপদূতাবাসে হামলা চালায় করাচির উন্মত্ত জনতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালাতে হয় স্থানীয় পুলিশকে।
বিশ্লেষকদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে ইসলামাবাদের ফৌজ। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষে আমেরিকার সঙ্গে আছে ইজ়রায়েল। ধর্মীয় কারণে সেখানকার ইহুদিদের আজীবন শত্রু বলে মেনে এসেছে পাক জনতা। ফলে এতে পুরোপুরি গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে রাওয়ালপিন্ডি ও শাহবাজ় প্রশাসনের।
তৃতীয়ত, দীর্ঘ দিন ধরেই পাকিস্তানের থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বালোচিস্তান। ইসলামাবাদের থেকে স্বাধীনতা পেতে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে সেখানকার একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। রাওয়ালপিন্ডির ফৌজের উপর গেরিলা যুদ্ধ চালাচ্ছে তারা। তা গুঁড়িয়ে দিতে সেখানে বিপুল সংখ্যায় বাহিনী মোতায়েন রেখেছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।
ইরান যুদ্ধে যোগ দিলে বালোচিস্তান থেকে বাহিনী সরাতে হবে পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ককে। সে ক্ষেত্রে স্বাধীনতা লাভের সুবর্ণসুযোগ যে স্থানীয় বিদ্রোহীরা পেয়ে যাবেন, তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমের প্রতিবেশীটির সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালোচিস্তান। তা হাতছাড়া হলে ইসলামাবাদের পক্ষে অস্তিত্ব রক্ষা যে কঠিন হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
লড়াইয়ে জড়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আরও একটি সমস্যা রয়েছে। সেটা হল ইরানের ‘হাইপারসনিক’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন। একে আটকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) সিস্টেম ব্যর্থ হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। যুদ্ধে গেলে তার আঘাত সহ্য করতে হবে ইসলামাবাদকে, যা নিশ্চয়ই পেতে চাইবেন না রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা।
আর তাই প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বর্তমানে উভয় সঙ্কট অবস্থায় রয়েছে পাকিস্তান। ফলে শাঁখের করাত অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আগামী দিনে ইরানকে পরমাণু হামলার হুমকি দিতে দেখা যেতে পারে ইসলামাবাদকে। তা ছাড়া সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে আকাশসীমা মার্কিন বায়ুসেনাকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার রাস্তায় হাঁটার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের। শেষ পর্যন্ত শাহবাজ় প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার।