উত্তর কোরিয়ায় অবাক নির্বাচন, ৯৯.৯৩% সমর্থনে ফের তখতে কিম! কোথায় গেল ০.০৭% ‘ভূতুড়ে’ ভোট? শুরু চর্চা
সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের হারের নিরিখে অল্পের জন্য ১০০-য় ১০০ হয়নি ‘ওয়ার্কার্স পার্টি অফ কোরিয়া’ এবং সহযোগী দলগুলির। ৯৯.৯৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে তারা। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বাকি ০.০৭ শতাংশ ভোট কোথায় পড়ল?
যেমনটা হয়ে আসছে, তেমনটাই হল। পরিবর্তন ঘটল না উত্তর কোরিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে। বিপুল ভোট পেয়ে আবার জয়ী শাসক কিম জং উন। তবে চমকে দেওয়ার মতো বিষয় হল উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতাসীন ‘ওয়ার্কার্স পার্টি অফ কোরিয়া’ এবং সহযোগী দলগুলো সে দেশের বিরোধীহীন সাধারণ নির্বাচনে পেয়েছে ৯৯.৯৩ শতাংশ ভোট!
অল্পের জন্য ১০০-য় ১০০ হয়নি ‘ওয়ার্কার্স পার্টি অফ কোরিয়া’ এবং সহযোগী দলগুলির। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বাকি ০.০৭ শতাংশ ‘ভূতুড়ে’ ভোট কোথায় পড়ল? তা কি পড়েছে কিমের বিরুদ্ধে?
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ় এজেন্সি (কেসিএনএ)’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিয়ংইয়ংয়ে শাসকের গদিতে কে বসবে, তা ঠিক করতে সম্প্রতি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে সে দেশে। উত্তর কোরিয়ার ১৫তম সুপ্রিম পিপল্স অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচনের জন্য গত ১৫ মার্চ ভোটগ্রহণ হয়।
সেই নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যেই। দেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সামরিক কর্মী এবং কর্মকর্তা-সহ মোট ৬৮৭ জন প্রতিনিধি সর্বোচ্চ গণপরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে ফলপ্রকাশের পর দেখা গিয়েছে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল এবং সহযোগী দলগুলির প্রার্থীরা প্রতিটি আসনে জয়লাভ করেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯৯.৯৩ শতাংশ মানুষ কিমের সমর্থনে ভোট দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
যদিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সাধারণ নির্বাচনে মোট ভোটারের ৯৯.৯৯ শতাংশ ভোট দিয়েছেন এবং তার মধ্যে ৯৯.৯৭ শতাংশ ভোট পড়েছে কিমের পক্ষে।
গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে মাত্র ০.০০৩৭ শতাংশ বিদেশে বা সমুদ্রে কর্মরত থাকায় ভোট দিতে পারেননি। ভোটদানে বিরতও ছিলেন ০.০০০০৩ শতাংশ। তবে সেই সংখ্যা হিসাবে আসে না।
তবে সরকারি হিসাব বলছে উত্তর কোরিয়ার ৯৯.৯৩ শতাংশ মানুষ কিমকেই আবার শাসকের গদিতে ‘দেখতে’ চান। যদিও মজার বিষয় হল, সে দেশের মানুষের কাছে আর কোনও বিকল্পও ছিল না। কারণ, কোনও বিরোধী প্রার্থীই ছিলেন না ব্যালটে।
এর পরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে কিমের সমর্থনে যাঁরা ভোট দিলেন না, তাঁরা কাকে সমর্থন করলেন? ০.০৭ শতাংশ ভোট তা হলে কোথায় গেল? কে পেলেন?
আরও পড়ুন:
উত্তর কোরিয়ার নির্বাচনে কোনও বিরোধী প্রার্থী ছিলেন না। পরিবর্তে, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের এক জন মাত্র পূর্ব-অনুমোদিত প্রার্থীকে সমর্থন বা প্রত্যাখ্যান করার জন্য ভোট দিতে বলা হয়েছিল।
এর অর্থ, যে ০.০৭ শতাংশ ভোটারের হিসাব মিলছে না, তাঁদের ভোট কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী দল বা অন্য কোনও নেতার কাছে যায়নি। রিপোর্ট বলছে, এই ভোট পড়েছে ‘না’-এ। অর্থাৎ, কিছু সংখ্যক ভোটার এমন রয়েছেন যাঁরা কিমের দলের প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যে এক জন করে প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই কিমের নেতৃত্বাধীন শাসকগোষ্ঠীর ঠিক করা প্রার্থী। তাঁদের কোনও বিকল্প প্রার্থী ছিল না। ফলে ভোটারদের সামনে যে সহজ বিকল্পটি ছিল, তা প্রার্থীকে মেনে নেওয়া বা প্রত্যাখ্যান করা।
সংবাদসংস্থা ‘ইয়োনহাপ’-এর মতে, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ জানিয়েছে যে ০.০৭ শতাংশ ভোটার প্রার্থীদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ, এলাকার প্রার্থীকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছেন তাঁরা।
২০১১ সালে বাবা কিম জং ইলের মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ার শাসকের আসনে বসেন কিম। তখন থেকে তিনিই সে দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালে, উত্তর কোরিয়ার উপর কিমের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার জন্য সে দেশের সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়। আনুষ্ঠানিক ভাবে রাষ্ট্রপ্রধান করা হয় কিমকে। সরকার, সামরিক বাহিনী এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাঁর কর্তৃত্বকে একাধিপত্য দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সংসদীয় নির্বাচনে প্রকাশ্যে ‘না’ ভোটের কথা স্বীকার করেছে, যা ১৯৫৭ সালের পর থেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।
উত্তর কোরিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি কিমের উত্তরাধিকারী কে? সম্প্রতি তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে দুই কোরিয়ায়। কিমের সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক কিশোরীকে দেখা যাচ্ছে। সে কিমের ১৩ বছরের কন্যা, নাম কিম জু এ। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) দাবি করছে, এই কন্যার হাতেই উত্তর কোরিয়ার শাসনভার তুলে দিতে চলেছেন কিম। তবে ঘরের ভিতর থেকেই সেই পথে বাধা আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
কিমের বোন, ৩৮ বছর বয়সি কিম ইয়ো জংকে এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব বলে বর্ণনা করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা। তিনি সরকারের শীর্ষ পদে রয়েছেন। রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব অপরিসীম। বিশেষত, দেশটির সেনাবাহিনীতে কিমের বোনের প্রভাব তাঁকে ক্ষমতার অন্যতম শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
তাই একাংশের মত, এত সহজে ভাইঝির হাতে শাসনভার তুলে দিতে দেবেন না কিমের বোন। তিনি নিজে কিমের উত্তরসূরি হিসাবে উত্তর কোরিয়ার দায়িত্ব নিতে চাইবেন। সুযোগ পেলেই তার সদ্ব্যবহার করবেন। ফলে উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে কিমের পরিবার আসন্ন সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। পুরো বিষয়টি নিয়ে জল্পনা যখন তুঙ্গে, তার মধ্যেই সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল উত্তর কোরিয়ায়। ক্ষমতায় ফিরলেন কিম।