‘বন্ধু’ চিনকে খুশি করতে লাখ লাখ গাধা জবাই! পাকিস্তানের ভাগ্য ফেরাবে ঝলমলে কসাইখানা?
বালুচিস্তানের গ্বদর বন্দরে দেশের প্রথম গর্দভ কসাইখানা খুলল পাকিস্তান। সেখানে গাধার চামড়া প্রক্রিয়াকরণে প্রাপ্ত উপজাত দ্রব্য পাঠানো হবে চিনে।
গাধাই ভরসা! ‘প্রাণের বন্ধু’ চিনের জন্য আরব সাগর লাগোয়া বন্দর শহরে এ বার মোটা টাকা খরচ করে কসাইখানা খুলে ফেলল পাকিস্তান। চারপেয়েদের জবাই করে সেখান থেকেই তাদের মাংস বেজিং বা সাংহাইয়ে পাঠাবে ইসলামাবাদ। পাশাপাশি রফতানি হবে গর্ধভের অস্থি এবং চামড়াও।
পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের গ্বদর একটি সমুদ্র বন্দর। সেখানে গিয়ে শেষ হবে ‘চিন পাকিস্তান আর্থিক বারান্দা’ (চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর বা সিপিইসি) প্রকল্পের কাজ। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই গ্বদরেই গাধার কসাইখানা খুলেছে শাহবাজ় শরিফের সরকার। এর জন্য খরচ হয়েছে ৭০ লক্ষ ডলার।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এর আগে পাকিস্তানে ছিল না কোনও গর্দভ কসাইখানা। এর নিয়ন্ত্রণ অবশ্য থাকছে না শাহবাজ় সরকার বা সেখানকার কোনও সংস্থার হাতে। কসাইখানাটি চালাবে ড্রাগনের হ্যাংগেং ট্রেড কোম্পানি। সংস্থাটি গাধার মাংস, হাড় এবং চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করবে বলেও জানা গিয়েছে।
গত বছর চিনা বাজারে গাধার চামড়া রফতানি নিয়ে বেজিঙের সঙ্গে চুক্তি করে ইসলামাবাদ। সেই চুক্তির অংশ হিসাবেই গ্বদরে সংশ্লিষ্ট কসাইখানাটি খোলা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখানে বছরে তিন লক্ষ গর্দভচর্ম প্রক্রিয়াকরণের কাজ করবে ড্রাগনের হ্যাংগেং ট্রেড কোম্পানি।
বেজিঙের বাজারে পাকিস্তানি গাধার বিপুল চাহিদার মূল কারণ হল ‘এজিয়াও’। এটি প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী চিনা ওষুধের মূল উপাদান, যা তৈরি হয় গর্দভচর্মের আঠা দিয়ে। ড্রাগনভূমির আমজনতার একটি বড় অংশের বিশ্বাস, নিয়মিত ‘এজিয়াও’ সেবনে বৃদ্ধি পায় রক্ত সঞ্চালন, বাড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না ক্যানসার।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে ইসলামীয় রীতিতে ‘পবিত্র পশু’র তকমা পেয়েছে গাধা। মূলত, মোট বহনের জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই চারপেয়ে প্রাণীটিকে ব্যবহার করে আসছে আর্থিক ভাবে অসচ্ছল পাক পরিবারগুলি। ফলে কসাইখানার জন্য ইসলামাবাদ পর্যাপ্ত গর্দভ সরবরাহ করে যেতে পারবে বলে আশাবাদী চিন।
গ্বদরের কসাইখানায় গাধার চামড়া প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত হবে কোলাজেন। এটি ব্যবহার করেই চিনা ওষুধ সংস্থাগুলির কারখানায় তৈরি হবে ‘এজিয়াও’। বর্তমানে এর বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। ড্রাগনভূমিতে এর বিপুল চাহিদা থাকায় গর্দভচর্ম থেকে আরও বেশি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে চিনা বাজারে গাধার চাহিদা হু-হু করে বাড়তে শুরু করে। ফলে ব্যাপক হারে কমে যায় অশ্বপালনের সংখ্যা। ১৯৯০ সালে ড্রাগনভূমিতে ঘুরে বেড়াত ১.১ কোটি ঘোড়া। ২০২১ সালে সেই অঙ্কই কমে নেমে আসে মাত্র দু’লক্ষে। গত তিন বছরে আরও নিম্নমুখী হয়েছে এই সংখ্যা।
অন্য দিকে, একটা সময়ে বিলাসবহুল পণ্য হিসাবে চিনা বাজারে ছিল ‘এজিয়াও’র পরিচিতি। কিন্তু, বর্তমানে অনেক বেশি সহজলভ্য এবং জনপ্রিয় হওয়ায় এর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, ‘এজিয়াও’র উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গর্দভচর্মের জন্য পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বেজিং।
আরও পড়ুন:
বালুচিস্তানের গ্বদর বন্দর শহরে গাধার কসাইখানা খোলাকে পাক অর্থনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলা যাবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে গাধা খাওয়া নিষিদ্ধ। ফলে পশ্চিমের প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিতে চারপেয়ে পশুটির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামাবাদের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে গর্দভের সংখ্যা ছিল ৫৫ লক্ষ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্বদরে গাধার কসাইখানা খোলার উপযোগিতার ব্যাখ্যা দেন পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’র খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতা রানা মহম্মদ হায়াত। তাঁর কথায়, ‘‘জীবিত গাধা রফতানি করা অনেক বেশি কঠিন। এতে লাভের সম্ভাবনাও কম। আর তাই কসাইখানা খুলে গর্দভ-উপজাত দ্রব্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’
কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্বদরে গাধার কসাইখানা প্রতিষ্ঠা নিয়ে পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে উঠেছে বিতর্কের ঝড়। বালুচিস্তানের ধর্মীয় নেতারা নির্বিচারে শয়ে শয়ে গাধা জবাইয়ের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের যুক্তি, গরিব পাক নাগরিকেরা পরিবহণের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই এই প্রাণীটির উপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া এতে অচিরেই গর্দভের সংখ্যার উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘ডাঙ্কি স্যাঙ্কচুয়ারি’। তাদের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, চিনা ‘এজিয়াও’র জন্য ফি বছর বিশ্বব্যাপী জবাই হয় প্রায় ৫৯ লক্ষ গাধা। এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে পুরোপুরি গর্দভশূন্য হবে পৃথিবী।
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের পরবর্তী সময়ে ঘরোয়া বাজারে ‘এজিয়াও’র চাহিদা বৃদ্ধি পেলে আফ্রিকার দেশগুলি থেকে গর্দভচর্ম আমদানি শুরু করে বেজিং। কিন্তু পরবর্তী কালে গাধা রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আফ্রিকান ইউনিয়ন। তার পর থেকেই বিশেষ এই চারপেয়ে প্রাণীটির জন্য ক্রমাগত পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকেছে ড্রাগনভূমির সরকার। গ্বদরের কসাইখানা সেই চাহিদা পূরণ করবে বলে আশা করছে তারা।
নির্বিচারে গাধা হত্যায় সৃষ্ট পরিবেশগত কুফলের পাশাপাশি ‘এজিয়াও’র ব্যাপারে আরও একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, এতে মোটা লাভের সুযোগ থাকায় গাধা চুরি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুরু হতে পারে চারপেয়ে প্রাণীটির ব্যাপক চোরাচালান। এতে পাক সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এই সমস্ত সতর্কবার্তাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে শাহবাজ় শরিফ সরকার। কারণ এখনও পাক অর্থনীতির একটি বড় অংশই পশুজাত পণ্য রফতানির উপর নির্ভরশীল। ২০১৫-’১৬ এবং ২০১৬-’১৭ আর্থিক বছরে আফগানিস্তানে যথাক্রমে ২৮ লক্ষ ও ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ডলার মূল্যের শূকরের মাংস পাঠিয়েছিল ইসলামাবাদ। ওই সময়ে হিন্দুকুশ পাহাড়ের কোলের দেশটিতে মোতায়েন ছিল মার্কিন শক্তিজোট নেটোর বাহিনী। মূলত, তাঁদের জন্যই ওই মাংস রফতানি করা হয়েছিল।
ইসলামিক খাদ্যতালিকায় গাধার মাংস নিষিদ্ধ হওয়ায় গ্বদরের সংশ্লিষ্ট কসাইখানা খোলার পর এই নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে শরিফ প্রশাসন। সেখানে নিশ্চিত করেই বলা হয়েছে, গর্দভের মাংস কেবলমাত্র রফতানিতেই ব্যবহার করা হবে। এটা অভ্যন্তরীণ ভাবে খাওয়ার জন্য নয়। অর্থাৎ ইসলামীয় রীতিনীতিতে কোনও রকমের আঘাত দেবে না ওই কসাইখানা।
২০১৩ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সিপিইসি নিয়ে চুক্তি করে ড্রাগন সরকার। প্রাথমিক ভাবে এতে ৪,৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও পরবর্তী কালে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার কোটি ডলারে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে পশ্চিম চিনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় থেকে শুরু হয়ে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের কারাকোরাম পেরিয়ে ১,৩০০ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা শেষ হবে গ্বদর বন্দরে। এই সুদীর্ঘ সড়কপথকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অঙ্গ বলে জানিয়েছে বেজিং।
সিপিইসি প্রকল্পে গ্বদরকে আগামী দিনের সিঙ্গাপুরের জাহাজশিল্পের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বালুচিস্তানের বন্দর শহর। কিছু দিন আগে সেখানে একটি বিমানবন্দরের উদ্বোধন করে শাহবাজ় সরকার। কিন্তু আর্থিক দিক থেকে সেখানকার উড়ান পরিষেবা কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
গ্বদর পর্যন্ত চলা সিপিইসি প্রকল্প নিয়ে প্রবল আপত্তি রয়েছে বালুচিস্তানের আমজনতার। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে পাক সরকার গোটা প্রদেশটিকেই বেজিঙের গোলামে পরিণত করেছে। চিন-পাকিস্তান আর্থিক করিডরের জেরে স্থানীয়েরা কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন বলে উঠেছে অভিযোগ। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমের পাক প্রদেশটিতে বাড়ছে সশস্ত্র আন্দোলন।
এই পরিস্থিতিতে গ্বদরে চিনা সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীনে গাধার কসাইখানা খোলায় পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের অনুমান, সংশ্লিষ্ট কসাইখানায় গাধার জোগান ঠিক রাখতে আম বালুচ নাগরিকের পোষা গাধাকেও জোর করে সেখানে পাঠাবে পাক প্রশাসন। ফলে আগামী দিনে সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠী বালুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর নিশানায় আসতে পারে ওই গর্দভ কসাইখানা।