ফাঁস করেছিলেন পুতিনের ‘হাঁটুর বয়সি’ প্রেমিকার কথা, পালাতে হয় দেশ ছে়ড়ে! বিষক্রিয়ায় রহস্যমৃত্যু রুশ প্রেসিডেন্টের সেই ‘শত্রু’র
২০০৮ সালে ‘মস্কোভস্কি করসপনডেন্ট’ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, পুতিন তাঁর স্ত্রী লিউডমিলার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে জিমন্যাস্ট আলিনাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন। গ্রিগরি তখন ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
মৃত্যু হল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘শত্রু’র! অলিম্পিক জিমন্যাস্ট আলিনা কাবায়েভার সঙ্গে পুতিনের ‘সম্পর্কে’র কথা ফাঁসে যুক্ত সাংবাদিক গ্রিগরি নেখোরোশেভের মৃত্যু হয়েছে লাটভিয়ায়। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯।
রাজনৈতিক শরণার্থী হিসাবে নির্বাসিত গ্রিগরি রিগায় নিজের বাড়ির কাছে সংগ্রহ করা ‘বিষাক্ত মাশরুম’ খেয়ে মারা গিয়েছেন বলে খবর। লাটভিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘ডেলফি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ জুন লাটভিয়ার রাজধানী রিগায় মৃত্যু হয় গ্রিগরির। তিনি সেখানে ১১ বছর ধরে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বসবাস করছিলেন।
ডেলফির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হল ‘ফলস হানি মাশরুম’-এর বিষক্রিয়া। গ্রিগরি তাঁর বাড়ির কাছাকাছি কোনও এলাকা থেকে ওই মাশরুম সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। গ্রিগরির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দুই ব্যক্তি রুশভাষী বুদ্ধিজীবী মহলে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
২০০৮ সালে ‘মস্কোভস্কি করসপনডেন্ট’ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, পুতিন তাঁর স্ত্রী লিউডমিলার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে জিমন্যাস্ট আলিনাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন। গ্রিগরি তখন ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই পত্রিকাটির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাশিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তারা গ্রিগরিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও পুতিন ও আলিনার সম্পর্ক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন:
দাবি করা হয়, পুতিন এবং আলিনার অন্তত দু’টি সন্তান রয়েছে। যদিও পুতিন কখনওই জনসমক্ষে আলিনার সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেননি এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলির দাবিও বার বার অস্বীকার করেছেন। ২০১৪ সালে রাশিয়ার তরফে ক্রাইমিয়া দখলের ঘটনার পর দেশত্যাগ করেন গ্রিগরি। শেষ পর্যন্ত লাটভিয়ায় চলে যান। সেখানেই পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন।
লাটভীয় সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তেও গ্রিগরিকে বেশ প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল। লাটভিয়ার প্রথিতযশা সাংবাদিক আন্দ্রে শাভরেই জানিয়েছেন, মৃত্যুর দু’দিন আগেই রিগার একটি সাহিত্য ক্লাবে গ্রিগরির সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। অন্য দিকে লাটভিয়ার শিল্পকলা বিশেষজ্ঞ আর্তুর আভোতিনশ জানিয়েছেন, পরের দিন সন্ধ্যায় শহরের একটি বাসে গ্রিগরিকে হাসিখুশি অবস্থায় দেখেছিলেন তিনি। তার পরে হঠাৎই মৃত্যু।
তবে এই প্রথম নয়। গ্রিগরির মৃত্যুর নেপথ্যে এখনও কোনও ষড়যন্ত্রের প্রমাণ না মিললেও এর আগেও একাধিক বার রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়েছে পুতিনের ‘শত্রু’দের। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা।
২০০৬ সালে মস্কোয় নিজের অ্যাপার্টমেন্টে গুলি করে খুন করা হয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক আনা পোলিতকোভস্কায়াকে। লন্ডনে তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম-২১০ বিষক্রিয়ায় মারা যান এফএসবি-র প্রাক্তন সদস্য আলেকজ়ান্ডার লিটভিনেঙ্কো।
আরও পড়ুন:
২০১৩ সালে ব্রিটেনে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় অলিগার্ক বরিস বেরেজোভস্কির দেহ। ২০১৫ সালে ক্রেমলিনের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় পুতিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বরিস নেমতসভকে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি হল পুতিনের ‘ব্যক্তিগত’ বাহিনী ওয়্যাগনারের প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজ়িনের মৃত্যু। ২০২৩ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি।
সম্প্রতি পোল্যান্ডে গুলি করে হত্যা করা হয় শিল্পী সেমিয়ন স্ক্রেপেটস্কিকে। মনে করা হয়, পুতিনকে ‘রক্তপিপাসু স্বৈরশাসক’ হিসাবে চিত্রিত করার কারণেই তাঁকে খুন করা হয়েছিল। এর মধ্যে এক ‘শত্রু’ গ্রিগরির মতো মাশরুম খেয়েও মারা গিয়েছিলেন।
২০২৩ সালে রুশ রকেট বিজ্ঞানী ভিটালি মেলনিকভ রহস্যজনক ভাবে বিষক্রিয়ায় মারা যান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাওয়ার অযোগ্য মাশরুম খাওয়ার ফলেই নাকি ওই ঘটনা ঘটেছিল।
৭৭ বছর বয়সি অধ্যাপক ভিটালি মৃত্যুর কয়েক দিন আগে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে ‘আরএসসি এনার্জিয়া’র রকেট এবং মহাকাশ ব্যবস্থা বিভাগের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মস্কোর একটি সংবাদপত্রের দাবি, খাওয়ার অযোগ্য মাশরুমই তাঁর স্বাস্থ্যের আকস্মিক অবনতির কারণ ছিল। অসুস্থ হওয়ার পর দু’সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা ভিটালিকে ‘তীব্র বিষক্রিয়া’র হাত থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ হন রুশ চিকিৎসকেরা।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৩ সালে বান্ধবী লুদমিলা আলেকসান্দ্রোভনাকে বিয়ে করেন পুতিন। বিবাহবিচ্ছেদ হয় ২০১৪ সালে। দুই কন্যা রয়েছে পুতিন এবং লুদমিলার। ৩৭ বছর বয়সি মারিয়া এবং ৩৫ বছর বয়সি ক্যাটরিনা। এঁরা দু’জনেই পুতিনের ‘বৈধ’ সন্তান। কানাঘুষোয় শোনা যায়, মারিয়া এবং ক্যাটরিনা ছাড়াও পুতিনের আরও সন্তান রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জন্মই বিবাহ-বর্হিভূত সম্পর্কের জেরে। মারিয়া এবং ক্যাটরিনা ছাড়া বৈধ তকমা পাননি আর কেউই।
গ্রিগরির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পুতিন এবং আলিনার সম্পর্ক নিয়ে চর্চা শুরু হয়। চলতি বছরে পুতিন ৭৪-এ পা দেবেন। আলিনা অবশ্য তাঁর ‘হাঁটুর বয়সি’। ২০০৪ সালের অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী আলিনার বয়স এখন ৪৩।
জিমন্যাস্ট হিসাবে আলিনা মোট ২টি অলিম্পিক পদক, ১৪টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ পদক এবং ২১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ পদক জিতেছেন। ২০০১ সালে ডোপ পরীক্ষায় তাঁর শরীরে নিষিদ্ধ মাদক ধরা পড়ার ফলে তাঁকে দু’বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। জিমন্যাস্টিক থেকে অবসর নেওয়ার পর আলিনা রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০০৫ সাল থেকে তিনি রাশিয়ার আইনসভার গতিবিধিতে নজর রাখা দফতর ‘পাবলিক চেম্বার অফ রাশিয়া’র সদস্য ছিলেন। পরে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ন্যাশনাল মিডিয়া গ্রুপ’-এর চেয়ারউওম্যান হন।
শোনা যায়, দুই সন্তানও রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর প্রেমিকার। এর মধ্যে প্রথম সন্তান নাকি সুইৎজ়ারল্যান্ডে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ২০১৫ সালে জন্মগ্রহণ করে। আর দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয় মস্কোতেই। ২০১৯ সালে। পুতিনের এই দুই পুত্রের জন্ম একই চিকিৎসকের হাতে হয়েছিল বলেও কানাঘুষো রয়েছে।
প্রথম থেকেই নিজের এই দ্বিতীয় পরিবারকে জনসমক্ষে আসতে দেননি পুতিন। যতটা সম্ভব রেখেছেন দেশবাসীর চোখের আড়ালে। এমনকি দুই সন্তানের জন্মের সময়ও নাকি তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তবে পুতিন-আলিনার পরিবারের তরফ থেকে পুরো বিষয়টি গুজব বলেই উড়িয়ে দেওয়া হয়।
পুতিনের আরও এক মেয়ে রয়েছে বলেও মনে করা হয়। তাঁর নাম লুইজা রোজোভা। ১৯ বছর বয়সি লুইজা কোটিপতি ব্যবসায়ী শ্বেতলানা ক্রিভোনোগিখের মেয়ে। ৪৫ বছর বয়সি শ্বেতলানা দেশের অন্যতম ধনী মহিলা। তবে শ্বেতলানা নিজের জীবন শুরু করেন এক ঝাড়ুদার হিসেবে। একসময় পুতিন তাঁর প্রেমেও হাবুডুবু খেতেন বলেও অনেকে মনে করেন।