অর্থ মন্ত্রকে হ্যাকিং, গায়েব কোটি কোটি টাকা, মৃত ‘চক্রান্তকারী’! তদন্তে ‘কেউটে’র খোঁজ পাচ্ছে ঋণে ডুবে থাকা ভারতের প্রতিবেশী
বড় সড় সাইবার হামলার জেরে ভারতের এক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাথায় পড়েছে বাজ! তাদের অর্থ মন্ত্রকের কম্পিউটারে ঢুকে ২৫ লক্ষ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। নেপথ্যে আছে কি কোনও ষড়যন্ত্র?
অর্থ মন্ত্রকে সাইবার হামলা! ইমেল হ্যাক হতেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল কয়েক লক্ষ ডলার। তদন্তে নেমে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর পদমর্যাদার এক আধিকারিককে সাসপেন্ড করে প্রশাসন। কিন্তু, দু’-তিন দিনের মাথায় বাড়ির পিছন থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ায় দানা বেঁধেছে সন্দেহ। নিছক হ্যাকিং, না কি নেপথ্যে রয়েছে কোনও বড় ষড়যন্ত্র? সর্ষের মধ্যেই লুকিয়ে নেই তো ভূত?
সম্প্রতি, এই ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায়। সেখানকার প্রেসিডেন্ট অনুরাকুমার দিশানায়েকের সরকার জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রকের কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে ২৫ লক্ষ ডলার হাতিয়েছে সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। ভারতীয় মুদ্রায় সেটা ২৩ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকারও বেশি।
দীর্ঘ দিন ধরেই আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে লঙ্কা প্রশাসন। আর তাই দিশানায়েকের সরকারের মাথায় উপর রয়েছে বিপুল ঋণের বোঝা। এ-হেন পরিস্থিতিতে খাস অর্থ মন্ত্রকের কম্পিউটার হ্যাকিংয়ে কয়েক লক্ষ ডলার উবে যাওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে তাঁদের। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অতীতে প্রশাসনের অন্দর থেকে কখনওই এত অর্থ চুরি যায়নি কলম্বোর।
চলতি বছরের এপ্রিলে সাইবার হামলার কথা স্বীকার করে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন লঙ্কা প্রশাসনের অর্থ সচিব হর্ষনা সুরিয়াপেরুমা। তাঁর দাবি, ঋণ শোধ করতে অস্ট্রেলিয়া সরকারকে ২০-২১ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। সেইমতো যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু, পরে জানা যায় ওই অর্থ ঢোকেনি ক্যানবেরার অ্যাকাউন্টে।
এর পরই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তদন্তের নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকে। তড়িঘড়ি বরখাস্ত করা হয় পাবলিক ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিসের চার পদস্থ আধিকারিককে। সুরিয়াপেরুমা জানিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপ ও ফৌজদারি ধারায় মামলা চলছে। তবে এর বেশি তথ্য দিতে রাজি হননি তিনি।
আরও পড়ুন:
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সাহায্য চেয়েছে লঙ্কা সরকার। অন্য দিকে, কলম্বোয় কর্মরত অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার ম্যাথু ডাকওয়ার্থ বলেছেন, ‘‘আমাদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে অনিয়মের কথা আমরা জানি।’’ আর তাই তদন্তে দিশানায়েকের প্রশাসনকে সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে লঙ্কা প্রশাসনের অস্ট্রেলীয় দ্বিপাক্ষিক ঋণ পরিশোধের কথা ছিল। সেইমতো অনলাইনে টাকা পাঠায় কলম্বোর অর্থ মন্ত্রক। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সেই অর্থ যে গায়েব করা হয়েছে, জানুয়ারিতে পৌঁছে তা জানতে পারে দ্বীপরাষ্ট্রের প্রশাসন।
এর কয়েক দিনের মাথায় ফের সাইবার হামলার শিকার হয় শ্রীলঙ্কার অর্থ মন্ত্রক। এ বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছ’কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল কলম্বোর। অনলাইনে ওয়াশিংটনকে সেই অর্থ পাঠায় দিশানায়েকের সরকার। পরে জানা যায়, একটা পয়সাও ঢোকেনি ওয়াশিংটনের অ্যাকাউন্টে।
পর পর দু’বার একই রকমের ঘটনা ঘটায় নড়েচড়ে বসে দ্বীপরাষ্ট্রের পুলিশ প্রশাসন। এ বার সাসপেন্ড হন অর্থ মন্ত্রকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর পদমর্যাদার এক অফিসার। তাঁকে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারী দল। বাজেয়াপ্ত করা হয় তাঁর পাসপোর্ট। সূত্রের খবর, জোরালো প্রমাণ না থাকায় তাঁকে গ্রেফতার করা যায়নি।
আরও পড়ুন:
এর কয়েক দিনের মাথায় বাড়ির পিছন থেকে রহস্যজনক ভাবে উদ্ধার হয় ওই অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের মৃতদেহ। স্থানীয় পুলিশের সন্দেহ, আত্মহত্যা নয়, খুন হয়েছেন ওই ব্যক্তি। অর্থ মন্ত্রকের কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের ব্যাপারে তথ্যফাঁসের ভয়েই কি তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিল সাইবার অপরাধীদের গ্যাং? উঠছে সেই প্রশ্নও।
দ্বীপরাষ্ট্রের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, দু’ক্ষেত্রেই টাকা চুরিতে একই রকমের পদ্ধতি অবলম্বন করে হ্যাকারদের দল। প্রথমে, ইমেলে ঢুকে অর্থ মন্ত্রকের ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত তথ্য হাতিয়ে নেয় তারা। শুধু তা-ই নয়, সেখানে বেশ কিছু কারসাজিও করে সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। ফলে গোড়ায় টাকা হাতানোর বিষয়টি দু’তরফের কেউই বুঝতে পারেননি।
কিন্তু পরে নির্ধারিত অর্থ না পাওয়ায় লঙ্কা সরকারের কাছে অভিযোগ দায়ের করে অস্ট্রেলীয় ঋণদাতারা। তখনই ২৫ লক্ষ ডলার গায়েব হওয়ার বিষয়টি নজরে পড়ে কলম্বোর। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন দিশানায়েকে সরকারের উপ-অর্থমন্ত্রী অনিল জয়ন্ত ফার্নান্দো। সেখানে আবার ভারতের নাম করতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
ফার্নান্দোর কথায়, অস্ট্রেলিয়ার মতোই লঙ্কা সরকারের ভারতকেও ঋণের টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। সেই সময় আরও এক বার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। তবে সেটা আটকে দেওয়া গিয়েছে। তখনই বিষয়টি দিনের আলোর মতো তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট হয় বলে দাবি করেছেন তিনি।
বছর চারেক আগে আচমকাই শূন্য হয়ে যায় শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার। ফলে মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়ে দক্ষিণের ওই দ্বীপরাষ্ট্র। এখনও সেই অবস্থা থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা। তার মধ্যেই ভয়ঙ্কর সাইবার হামলার শিকার হল কলম্বো প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে খোয়া যাওয়া অর্থ ফেরত আনার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে দিশানায়েকে সরকার।
২০২২ সালে ৪,৬০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র। পাশাপাশি, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার খালি হয়ে যাওয়ায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানি করতে পারছিল না কলম্বো। ফলে দেশ জুড়ে শুরু হয় প্রবল গণবিক্ষোভ। একসময় তা আছড়ে পড়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের প্রাসাদে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয় তাঁকে।
এই আর্থিক বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফের (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) দ্বারস্থ হয় দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্র। সেখান থেকে ২৯০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার কথা রয়েছে কলম্বোর। সেই জন্যই পাবলিক ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিস বা পিডিএমও নামের নতুন একটি দফতর তৈরি করেছে লঙ্কা সরকার।
বিশ্লেষকদের দাবি, যে পদ্ধতিতে দক্ষিণী দ্বীপরাষ্ট্রে সাইবার হামলা হয়েছে, তার পোশাকি নাম বিজ়নেস ইমেল কমপ্রোমাইজ়ড। কিন্তু, এতে দিশানায়েকে সরকারের অর্থ মন্ত্রকের পদস্থ কর্তাদের জড়িত থাকার সন্দেহ উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। এমনকি, ষড়যন্ত্রে কোনও মন্ত্রীর নাম উঠে আসাও অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ভিতরের লোক ছাড়া এই ধরনের সরকারি তথ্য হাতিয়ে নেওয়া একেবারেই সহজ নয়।
শ্রীলঙ্কার আইএমএফের ঋণে জামিনদারের ভূমিকা পালন করছে ভারত। দ্বীপরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রকে সাইবার হামলার পর এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি নয়াদিল্লি। তবে ঘটনার জেরে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার টাকা দিয়ে সহযোগিতায় বেঁকে বসলে কলম্বোর আর্থিক পরিস্থিতি যে জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।