‘উন্মাদ সন্ন্যাসী’র প্রেমিকা ছিলেন রুশ সম্রাজ্ঞী, বিষ দিয়েও মারা যায়নি! ‘ধুরন্ধরের’ গানের রহস্যময় চরিত্র কে এই রাসপুতিন?
‘ধুরন্ধর ২’-এর প্রেক্ষাপটে, ‘রাসপুতিন’ গানটি সিনেমার শেষের দিকে বাজানো হয়েছে। বনি এমের গাওয়া বিখ্যাত ‘রাসপুতিন’ গানটির ব্যবহারের পর নতুন করে ইতিহাসের কুখ্যাত চরিত্রটি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। কে সেই ব্যক্তি যাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও নাম শুনলে কেঁপে ওঠেন রাশিয়ার মানুষ।
দেশ জুড়ে ‘ধুরন্ধর দ্য রিভেঞ্জ’-এর ঝড়়ে মাতোয়ারা সিনেপ্রেমীরা। আদিত্য ধরের পরিচালনায় ‘ধুরন্ধর’ ছবির দু’টি পর্বে ফিরে ফিরে এসেছে পড়শি দেশের অন্ধকার জগতের ইতিবৃত্ত। দ্বিতীয় পর্বে পুরনো চরিত্রগুলি ফিরে এসেছে আবারও। দর্শকমহলে বিপুল প্রশংসা কুড়োচ্ছে সিনেমাটি। কারণ দ্বিতীয় পর্বে আদিত্য তাঁর দর্শকের জন্য রেখেছিলেন নতুন চমকও।
প্রথম চলচ্চিত্রে গল্পের যে বুনন ছিল, পরের পর্বে সেই বুননকে আরও জটিল এবং গভীর করে তুলেছেন পরিচালক। ‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তির পর বিস্মৃত এক চরিত্রকে ঘিরে আবারও নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। সরাসরি সেই চরিত্রকে পর্দায় উপস্থাপিত করা হয়নি। ‘ধুরন্ধর’-এর দ্বিতীয় পর্বের শেষে একটি গান উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। আর তাতেই কুখ্যাত চরিত্রটিকে নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।
‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’-এর শেষ পর্বটি টানটান উত্তেজনাপূর্ণ এবং রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ছবিটির শেষের একটি মুহূর্ত বিশেষ ভাবে চোখে পড়েছে দর্শকের। একেবারে শেষ পর্যায়ে বনি এমের গাওয়া ‘রাসপুতিন’ গানটির ব্যবহার। প্রথম দর্শনে এই গানের ব্যবহার সিনেমার চরিত্রদের মধ্যে খাপছাড়া বলে মনে হতে পারে। কিছুটা অপ্রত্যাশিতও মনে হতে পারে।
সিনেমার শেষ দৃশ্যে মুহূর্তের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে যায়। যাকে অজেয় মনে হচ্ছিল, তার মুখোশ উন্মোচিত হয়। আর এখানেই রাসপুতিনের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন পরিচালক আদিত্য। রহস্যময়, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব রাশিয়ার রাসপুতিনের জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া গানটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ‘ধুরন্ধর ২’-এর প্রেক্ষাপটে, ‘রাসপুতিন’ গানটি সিনেমার শেষের দিকে বাজানো হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উত্থান ঘটে রাশিয়ার এক রহস্যময় এবং অত্যন্ত বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের। সন্ন্যাসী বা ধর্মীয় যাজক না হয়েও নিজেকে ‘ধর্মীয় সাধক’ বা ‘অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি’ হিসাবে পরিচয় দিতেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে বশ হয়ে ছিলেন রাশিয়ার জ়ার ও তাঁর পরিবার। তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে ওঠাবসা করত রাশিয়ার রাজপরিবার।
আরও পড়ুন:
মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও রাসপুতিনের নাম শুনলে কেঁপে ওঠেন রাশিয়ার মানুষ। আজও তাঁকে নিয়ে নানা কাহিনি ঘুরে বেড়ায় লোকমুখে। আলো-আঁধারির খেলা যাঁকে ঘিরে, কে সেই রাসপুতিন?
এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া রাসপুতিন ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি গোটা রাশিয়ার ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে হাতের পুতুল করে রেখেছিলেন। রাশিয়ার শাসনক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন ‘সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী’। সন্ন্যাসীর বেশকেই ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
১৮৬৯ সালে রাশিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম পোক্রোভস্কোয়েতে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম রাসপুতিনের। পুরো নাম গ্রিগরি ইয়েফিমোভিচ রাসপুতিন। শোনা যায়, রাসপুতিনের আগে আরও সাত সন্তানের জন্ম দেন তাঁর বাবা-মা। কিন্তু কেউই বাঁচেনি। রাসপুতিনের জন্মের পর তাঁদের আরও এক সন্তান হয় বলে জানা যায়। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর সম্পর্কে তেমন কোনও তথ্য নেই।
রাশিয়ার সিংহাসনে শেষ জ়ার (সম্রাট) দ্বিতীয় নিকোলাস এবং সম্রাজ্ঞী জ়ারিনা আলেজ়ান্দারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন রাসপুতিন। জ়ারের একমাত্র ছেলে আলেক্সেই হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত ছিলেন। রক্ত জমাট বাঁধত না রুশ রাজপুত্রের দেহে। তখনকার চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রায় নিরাময় অযোগ্য ছিল এই রোগটি। প্রার্থনার মাধ্যমে রাসপুতিন ছেলের কষ্ট লাঘব করতে সক্ষম হন বলে সম্রাজ্ঞী বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন:
ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানোর জন্যই জ়ার এবং তাঁর পরিবারের কাছে রাতারাতি ‘ঈশ্বরের প্রতীক’ হয়ে ওঠেন রাসপুতিন। রাজপরিবারের ওপর তাঁর অকল্পনীয় প্রভাব ছিল। জনশ্রুতি আছে, রাসপুতিন যখনই অসুস্থ আলেক্সেইয়ের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করতেন বা মন্ত্র পড়তেন, ছেলেটির রক্তপাত আশ্চর্যজনক ভাবে কমে যেত বা সে সুস্থ হয়ে উঠত। জ়ারদম্পতি একে রাসপুতিনের ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ হিসাবে বিশ্বাস করতেন।
জ়ারের অন্দরমহলে রাসপুতিনের প্রবেশের প্রধান চাবিকাঠি ছিল এটিই। পারিবারিক সমস্যা তো বটেই, রাশিয়ার শাসনকার্যেও রাসপুতিনের উপর নির্ভর করতে শুরু করেন দ্বিতীয় নিকোলাস। জ়ার যে পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে সে কথাও সদর্পে ঘোষণা করতে এতটুকু বুক কাঁপত না রাসপুতিনের।
রাজপরিবারের অন্দরমহলে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায় তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেন। তাঁর এই হস্তক্ষেপ ও প্রভাব অনেক প্রভাবশালী রুশ অভিজাত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্দরে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছিল তাঁদের। কারণ রাসপুতিনের পছন্দের লোকজনকেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছিলেন জ়ার।
রাসপুতিনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম বিতর্কিত। এক দিকে যেমন তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবে প্রচার করতেন, অন্য দিকে মদ্যপান, নারীসঙ্গ এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য তিনি কুখ্যাত ছিলেন। এ জন্য অনেকে তাকে ‘ম্যাড মঙ্ক’ বা উন্মাদ সন্ন্যাসী বলেও ডাকতেন রুশ জনতা। প্রায়শই তিনি জনসমক্ষে মদ্যপ অবস্থায় হাজির হতেন। এমনকি এ-ও কথিত যে তিনি অভিজাত বংশের ও রাজসভার মহিলাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতেন।
এমনকি শোনা যায় রাসপুতিনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন জ়ারের স্ত্রী। শুধু জ়ারিনা নন, তাঁর মেয়েদের সঙ্গেও রাসপুতিনের সম্পর্কের কথা ছড়িয়ে পড়ে। মত্ত অবস্থায় নানা পার্টিতে রাসপুতিন নিজে সে কথা সকলকে রসিয়ে রসিয়ে শোনাতে শুরু করেন। রুশ রাজপরিবার নিয়ে কেচ্ছা বাইরে বেরিয়ে আসতেই আর চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি রাশিয়ার অভিজাত সম্প্রদায়ের সদস্যেরা।
রাজপরিবারের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশে যায় এবং অভিজাত সম্প্রদায়ও জ়ারের বিরুদ্ধে চলে যায়। রাসপুতিনকে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সালটা ১৯১৬। তাঁকে প্রথমে বিষ মেশানো ওয়াইন ও সায়ানাইড মেশানো পেস্ট্রি খেতে দেওয়া হয়। তাতেও কাজ না হলে গুলি করা হয়। এর পরও নাকি দেহে প্রাণের স্পন্দন ছিল রুশ ধর্মগুরুর। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কুপিয়ে ও নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর এই নাটকীয় মৃত্যুর ঘটনা আজও ইতিহাসবিদদের কাছে বড় বিস্ময়।
দ্বিতীয় নিকোলাসের হাত ধরেই রাশিয়ায় জ়ার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। সেই পতনের প্রধান অনুঘটক ছিলেন রাসপুতিন। রাসপুতিনকেই জ়ারদের পতনের জন্য দায়ী করেন ইতিহাসবিদরা। রাসপুতিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই জ়ার তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু তত দিনে জ়ারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ চরমে উঠেছে। সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হয় জ়ারকে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয় এবং প্রায় ২০ লক্ষ রুশ সৈন্যের মৃত্যু জ়ারের শাসনের অবসানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ১৯১৭ সালে দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর পর ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে বলশেভিকেরা (লেনিনের নেতৃত্বে) জ়ার, তাঁর স্ত্রী, চার কন্যা এবং পুত্র আলেক্সেইকে এক অন্ধকার কামরায় গুলি করে হত্যা করে।
‘ধুরন্ধর’-এ রাসপুতিনের প্রসঙ্গ ব্যবহারের নেপথ্যে সম্ভবত ঐতিহাসিক রূপক কাজ করেছে। রাসপুতিন যেমন পর্দার আড়ালে থেকে রাজপরিবার ও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অস্থির করে তুলেছিলেন, সিনেমার গল্পে ‘রাসপুতিন’ গানটির প্রসঙ্গ ঠিক তেমনই এমন একটি বিপদের সঙ্কেত হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ‘সিস্টেমের’ ভেতর থেকে পুরো গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে ধসিয়ে দিতে সক্ষম ছিল।