৬৫ কিমি দূর থেকে হৃৎস্পন্দন চিনতে পারে! ইরান থেকে পাইলট উদ্ধারে ভূতুড়ে প্রযুক্তি ব্যবহার আমেরিকার! কী এই ‘গোস্ট মারমার’?
ইরানের মাটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভেঙে পড়ার পরে পরেই প্রথম পাইলটকে উদ্ধার করে আমেরিকা। তার ৪৮ ঘণ্টা পরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় দ্বিতীয় পাইলটকে।
কয়েক দিন আগে ইরানে প্রবেশের পর ধ্বংস হয়ে যায় মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই। তবে বেঁচে যান দু’জন পাইলটই। ইরানের অন্দরেই আত্মগোপন করেছিলেন তাঁরা। পরে মার্কিন বাহিনী গোপন অভিযান চালিয়ে ওই পাইলটকে ইরানের মাটি থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় তাঁদের।
ইরানের মাটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভেঙে পড়ার পরে পরেই প্রথম পাইলটকে উদ্ধার করে আমেরিকা। তার ৪৮ ঘণ্টা পরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় দ্বিতীয় পাইলটকে।
এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর, পাইলটদের ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ইরানি সেনা। প্রথম পাইলটকে আমেরিকার উদ্ধার করার পর দ্বিতীয় পাইটকে তন্নতন্ন করে খুঁজছিল তারা। ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে পরিচিত ওই পাইলট দু’দিন ধরে একটি পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচান।
‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’কে উদ্ধারের জন্য ১৭৬টি বিমানে কয়েকশো বিশেষ কমান্ডোকে অভিযানে নামানো হয়। সাত ঠিকানায় ৪৫ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ধরে চলে অভিযান। তার পর সফল ভাবে ইরান থেকে ফিরিয়ে আনা হয় তাঁকে।
উদ্ধার অভিযানের পর প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় পাইলটকে উদ্ধার করা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জে সাফল্য এসেছে। তাঁর কথায়, ‘‘পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি অভিযান চালিয়ে ইরানের মাটি থেকে দ্বিতীয় পাইলটকে তাদের (ইরান বাহিনীর) নাকের ডগা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি।’’
আরও পড়ুন:
মার্কিন সেই উদ্ধার অভিযানের বাহবা শোনা গিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে ওই অভিযান সংক্রান্ত এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র তৈরি একটি নতুন, অত্যন্ত গোপন সরঞ্জাম ব্যবহার করে দক্ষিণ ইরানে ভূপতিত হওয়া বিমানটির এক পাইলটকে সফল ভাবে খুঁজে বার করে উদ্ধার করেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। কিন্তু কী সেই গোপন সরঞ্জাম?
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর মতে, পাইলট উদ্ধারের ক্ষেত্রে আমেরিকার বায়ুসেনার সাফল্য এসেছে ‘গোস্ট মারমার’ নামক একটি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। কী এই ‘গোস্ট মারমার’? এটি এমন এক প্রযুক্তি, যা দূর থেকে মানুষের হৃৎস্পন্দনের তড়িচ্চুম্বকীয় সঙ্কেত শনাক্ত করতে সক্ষম। পারিপার্শ্বিক কোলাহল থেকে হৃৎস্পন্দনকে আলাদা করার ক্ষমতা রয়েছে এই প্রযুক্তির। মূলত কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোমেট্রি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ‘গোস্ট মারমার’।
পাইলট উদ্ধারের ক্ষেত্রে মার্কিন অভিযানের সঙ্গে ওয়াকিবহাল এক সূত্র ‘দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট’কে বলেছেন, “এই প্রযুক্তি অনেকটা স্টেডিয়ামের ভিতরে কোনও একটি মাত্র কণ্ঠস্বর শোনার মতো। তবে পার্থক্য হল, এ ক্ষেত্রে স্টেডিয়ামটি ছিল হাজার বর্গমাইলের মরুভূমি।’’ ওই একই সূত্রের দাবি, কেউ যদি মরুভূমির ধূ ধূ প্রান্তরে বা আরও দুর্গম কোনও জায়গায় থাকেন এবং তাঁর যদি হৃৎস্পন্দন চলতে থাকে, তা হলে তাঁকে খুঁজে বার করে ফেলবে ‘গোস্ট মারমার’ প্রযুক্তি।
‘গোস্ট মারমার’ তৈরি করেছে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণকারী সংস্থা লকহিড মার্টিনের ‘স্কান্ক ওয়ার্কস’। লকহিড মার্টিনের একটি অতি-গোপনীয় গবেষণা বিভাগ সেটি। ভবিষ্যতে এফ-৩৫-এর মতো আমেরিকার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানে ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তিটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ইরান থেকে পাইলট উদ্ধারের সময়েই প্রথম বারের জন্য ‘গোস্ট মারমার’ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
কিন্তু কেন এমন নাম? সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “নামটি ইচ্ছাকৃত ভাবে রাখা হয়েছে। ‘মারমার’ হল হৃৎস্পন্দনের ছন্দ বোঝাতে ব্যবহৃত চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা। আর ‘গোস্ট’ বলতে বোঝায় এমন কাউকে খুঁজে বার করা, যিনি কার্যত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন। আর সে কারণেই এমন নাম।”
সূত্র এ-ও জানিয়েছে, এফ-১৫ই বিমানের দুর্ঘটনাস্থলের চারপাশের মরুভূমি ‘গোস্ট মারমার’-এর জন্য আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। স্বল্প তড়িচ্চুম্বকীয় সঙ্কেত, মানুষের অনুপস্থিতি এবং নিস্তব্ধ মরুভূমি, পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে থাকা ওই পাইলটের হৃৎস্পন্দন শনাক্ত করতে সাহায্য করেছিল।
সাধারণত মানুষের হৃৎস্পন্দন এতটাই ক্ষীণ হয় যে তা কেবল বুকের সঙ্গে সরাসরি চেপে ধরা সেন্সর দ্বারাই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোমেট্রি প্রযুক্তি থাকার কারণে ‘গোস্ট মারমার’ সেই হৃৎস্পন্দনের সঙ্কেত ‘অনেক দূর’ থেকেই চিহ্নিত করতে পারে।
সূত্রটি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট’কে বলেছে, “এই প্রযুক্তি ত্রিকালদর্শী নয় যে কে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে তা বার করে ফেলবে। কিন্তু প্রত্যন্ত, কম কোলাহলযুক্ত পরিবেশে ভাল কাজ করে এই প্রযুক্তি।”
সূত্র অনুযায়ী, তাঁকে যেন সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, তার জন্য মার্কিন পাইলট পাহাড়ের ফাটলে থাকাকালীন একটি ‘কমব্যাট সারভাইভার এভেডার লোকেটর বিকন’ সক্রিয় করেছিলেন। কিন্তু অনুসন্ধান দল সেই সঙ্কেত দেখে তাঁর সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারছিল না।
তখনই ‘গোস্ট মারমার’কে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ওই পাইলটের হৃৎস্পন্দনের সঙ্কেত চিহ্নিত করে প্রযুক্তিটি। এর পর ওই পাইলটকে উদ্ধার করে আমেরিকার সেনা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ উভয়েই হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে এই প্রযুক্তির বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘‘সিআইএ ৪০ মাইল দূর থেকে বিমানচালকটির অবস্থান শনাক্ত করেছে।’’ এই অভিযানকে তিনি ‘খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো’ বলেও বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য, আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। শনিবার সংঘর্ষবিরতির শর্ত খুঁজতে ইরান এবং আমেরিকা মুখোমুখি বসতে চলেছে। বৈঠক হবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। সেখানে মার্কিন প্রতিনিধিদলকে নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। তাঁর সঙ্গে থাকবেন পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা তথা প্রাক্তন উপদেষ্টা জেরাড কুশনার।
অন্য দিকে, ইরানের প্রতিনিধিদলে থাকবেন পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। গালিবাফ ইরান সেনার ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর প্রাক্তন আধিকারিক। বৈঠকের প্রথম পর্বে যোগ দেবেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ এবং বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার। শান্তিবৈঠক উপলক্ষে বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই কার্যত নিশ্ছিদ্র দুর্গে পরিণত করা হয়েছে ইসলামাবাদকে। শহর ঘিরে ব্যারিকেড তৈরি করেছে পাক সেনা ও রেঞ্জার্স।