কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে এনেছে মার্কিন ডেল্টা বাহিনী। বিশেষ এক যুদ্ধজাহাজে করে ডিটেনশন ক্যাম্পে আনা হয়েছে মাদুরোকে। কী আছে এই রণতরীতে?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৯
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৭
ভেনেজ়ুয়েলার প্রাসাদ থেকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়া হল সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করেছে আমেরিকা। পরনে ছাইরঙা এক জ্যাকেট। হাতে একটা জলের বোতল ধরা। চোখ বাঁধা কালো আবরণে। বন্দিদশার মাদুরোর এমনই একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব জুড়ে।
০২১৭
মার্কিন ডেল্টা বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার পর ভেনেজ়ুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাওয়া হয় নিউ ইয়র্কে। রাজধানী কারাকাসের ফোর্ট টিউনা সামরিক কমপ্লেক্স থেকে প্রথমে বিমানে করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আনা হয় মাদুরোকে। তার পর হাই প্রোফাইল এই বন্দিকে নিয়ে সমুদ্রপথে নিউ ইয়র্ক অভিমুখে যাত্রা করে বিশেষ এক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ।
০৩১৭
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মার্কিন জাহাজে তুলে নিয়ে রওনা হয় এফবিআইয়ের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী। মার্কিন নৌবহরের বিশেষ এক রণতরীতে ঠাঁই পান লাটিন আমেরিকার দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট। ইউএসএস ইও জিমায় চড়ে নিউ ইয়র্ক পাড়ি দেন মাদুরো। নিউ ইয়র্কেই বিচারপ্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হচ্ছে মাদুরোকে। সেখানে মাদুরোকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইউএসএস ইও জিমাকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক বিশেষ কারণ।
০৪১৭
মার্কিন নৌবহরের এই যুদ্ধজাহাজটি সাধারণ রণপোত নয়। এটি জল ও স্থল উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করতে দক্ষ। ইউএসএস ইও জিমা একটি ছোট বিমানবাহী জাহাজের মতো কাজ করে। এটির ৮৪০ ফুট লম্বা এবং ১৪০ ফুট প্রশস্ত উড়ানের একটি ডেক রয়েছে। জাহাজটি হেলিকপ্টার, ছোট জেট এবং নৌকো বহন করতে পারে। ফলে এটি সরাসরি তীরে সৈন্য এবং যুদ্ধে ব্যবহৃত বিমান ও হেলিকপ্টারকে নামাতে পারে।
০৫১৭
মূলত মাদকবিরোধী অভিযানেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে জাহাজটিকে। জাহাজটির পোশাকি নাম এলএইচডি-৭। ওয়াস্প গোত্রের উভচর আক্রমণকারী জাহাজটি (অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ) দ্রুত সৈন্যদের সমুদ্র থেকে স্থলে স্থানান্তর করতে সক্ষম। হেলিকপ্টার এবং বিমান ব্যবহার করে শত্রুদের পিছু ধাওয়া করতে সক্ষম জাহাজটি।
০৬১৭
কার্গো হোল্ড থেকে পণ্য সরবরাহ পরিবহণের জন্য ছ’টি কার্গো লিফ্ট রয়েছে। পাশাপাশি দু’টি বিমান লিফ্টও রয়েছে। এলএইচডি তিনটি ল্যান্ডিং ক্রাফ্ট এয়ার কুশন, এক ডজন ল্যান্ডিং ক্রাফ্ট রয়েছে তাতে। চল্লিশটিরও বেশি উভচর অ্যাসল্ট যান বহন করতে পারে জাহাজটি। ফ্লাইট ডেকে ন’টি হেলিকপ্টার অবতরণের মতো পর্যাপ্ত জায়গাও রয়েছে।
০৭১৭
২০২৫ সালের অগস্টের শেষের দিকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ইউএসএস ইও জিমাকে মোতায়েন করা হয়েছিল। অপারেশন সাদার্ন স্পিয়ার নামে পরিচিত এই মাদকবিরোধী অভিযানটি মূলত ভেনেজ়ুয়েলার মাদক পাচারকারীদের সমূলে ধ্বংস করার জন্যই পরিচালিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ইও জিমা যুদ্ধের নামেই জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে।
০৮১৭
এই শ্রেণির প্রথম চারটি জাহাজে চড়ুই ক্ষেপণাস্ত্র (স্প্যারো মিসাইল) উৎক্ষেপণের জন্য দু’টি মার্ক ২৯ অক্টোপল লঞ্চার, রোলিং এয়ারফ্রেম মিসাইলের জন্য দু’টি মার্ক ৪৯ লঞ্চার, তিনটি ২০ মিমি ফ্যালানক্স সিআইডব্লিউএস, চারটি ২৫ মিমি মার্ক ৩৮ চেন গান এবং চারটি .৫০ ক্যালিবার মেশিনগান ছিল। পরে তা থেকে একটি ফ্যালানাক্স ও মার্ক ৩৮ চেন গান কমিয়ে ভার লাঘব করা হয় জাহাজটির।
০৯১৭
অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত রণতরী ইও জিমা তৈরির কাজ ১৯৯৬ সালে ইঙ্গলস শিপইয়ার্ডে শুরু হয়। ২০০০ সালে এটি চালু হয়। মার্কিন নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০০১ সালে। সেই থেকে এখনও সক্রিয় রয়েছে জাহাজটি। এর পূর্ববর্তী সংস্করণগুলি ভিয়েতনাম এবং অন্যান্য মার্কিন সামরিক অভিযানে কাজ করেছে।
১০১৭
ক্যারিবীয় অঞ্চলে বর্তমানে আমেরিকার নৌবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত চারটি ডেস্ট্রয়ার এবং ৪,৫০০ জনেরও বেশি নৌসেনা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ জেনারেল ফোর্ডও ওই এলাকায় এনে রেখেছেন ট্রাম্প। ইউএসএস ইও জিমা ছাড়াও ইউএসএস সান আন্তোনিও এবং ইউএসএস ফোর্ট লডারডেলের মতো অত্যাধুনিক রণতরীগুলিকে ইতিমধ্যেই দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরে মোতায়েন করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী।
১১১৭
ইউএসএস ইও জিমাকে অত্যাধুনিক রণতরী বললে এর সম্পূর্ণ পরিচয় বোধহয় সঠিক দেওয়া হয় না। ভাসমান দুর্গের মতো মনে হলেও জাহাজটিকে মাদুরোর মতো বন্দি পরিবহণের জন্য বেছে নেওয়ার একমাত্র কারণ সুরক্ষা নয়। এই নির্দিষ্ট জাহাজটি বেছে নেওয়ার একটি প্রধান কারণ হল এর চিকিৎসা পরিকাঠামো।
১২১৭
মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএনএস কমফোর্টের মতো হাসপাতাল জাহাজের দ্বিতীয় শ্রেণির সংস্করণ হল ইও জিমা। এতে রয়েছে ছ’টি সম্পূর্ণ কার্যকরী অস্ত্রোপচারের কক্ষ, একটি নিবিড় পরিচর্যা কক্ষ (আইসিইউ) এবং ৬০০ শয্যাবিশিষ্ট ওয়ার্ড। এই ধরনের জাহাজের সঙ্গে সংযুক্ত হাসপাতালগুলি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে দুর্যোগকবলিত এলাকা— যেখানেই প্রয়োজন সেখানেই অস্ত্রোপচার এবং হাসপাতালের পরিষেবা দিতে পারে।
১৩১৭
প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বা তাঁর স্ত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে চায়নি যুক্তরাষ্ট্র সরকার। সমুদ্রপথে গতিশীল বন্দিদশার সময় কোনও কারণে তাঁরা যদি অসুস্থ হন বা মানসিক চাপের কারণে স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভোগেন তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিশেষ বন্দিদের বিদেশের হাসপাতালে স্থানান্তর করার প্রয়োজনই পড়বে না। কারণ সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াটা আপাতত ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের কাছে ‘কূটনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়াবে। তাই যে কোনও অবাঞ্ছিত পরিস্থিত এড়াতে ইও জিমাকে বেছে নেওয়া হয়।
১৪১৭
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিরাপদে জাহাজে পৌঁছোনোর জন্য উন্মুক্ত ফ্লাইট ডেকে নামানো হয়নি। তার জন্য জাহাজে ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। জাহাজের নকশাটি এমনই যে এর নৌকোগুলি সরাসরি জাহাজের পেটের ভিতরে চলাচল করতে সক্ষম। তাই মাদুরোকে লুকোনো দরজা দিয়ে জাহাজের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়। উপগ্রহ, ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্যামেরা থেকে বাঁচিয়ে জাহাজে ওঠানো হয় প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে।
১৫১৭
মাদুরোকে এই জাহাজের ক্যাপ্টেনের কোয়ার্টারে রাখা হয়নি। তাঁকে জাহাজের ব্রিগেডিয়ারে রাখা হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। এটি একটি বিশেষ সামরিক কারাগার যা সাধারণ এবং যুদ্ধবন্দিদের রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ইস্পাত-মজবুত সেলগুলিকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করেন জাহাজে থাকা ১৬০০ সৈন্যদলের কোনও না কোনও সদস্য। মূলত এই ভাসমান সামরিক ঘাঁটিতে বন্দিদের বাইরের জগতের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে দেওয়া হয় না।
১৬১৭
আইনগত ও কৌশলগত ভাবে, ইউএসএস ইও জিমা আমেরিকার একটি চলমান অংশ হিসাবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাদুরোকে আটকে রাখার মাধ্যমে আমেরিকা প্রত্যর্পণ চুক্তির জটিল আইনি বাধা এড়াতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু তাঁকে কলম্বিয়া বা ব্রাজ়িলের মাটিতে অবতরণ করানো হলে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রযোজ্য হত।
১৭১৭
গত বছরের (২০২৫ সাল) মাঝামাঝি সময় থেকেই ভেনেজ়ুয়েলার মাদকব্যবসার মৌচাকে ঢিল মেরেছে আমেরিকা। মাদক মাফিয়াদের গুপ্ত ডেরা ধ্বংসের জন্য আদাজল খেয়ে নেমে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে নিন্দকদের মতে এটি কারাকাসের তেলসম্পদ ‘লুট’ করার ছক। সেই আশঙ্কাই সত্যি করেছেন ট্রাম্প, বলছেন সমালোচকেরা।