‘যুদ্ধ-পরীক্ষিত’ বিজ্ঞাপনে জেট বিক্রির চেষ্টা! পাকিস্তানের মুখে ঝামা ঘষে কেন দিল্লির ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ বাছল মুসলিম দ্বীপরাষ্ট্র?
‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে ‘যুদ্ধ-পরীক্ষিত’ বলে চিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার লড়াকু জেট নিয়ে প্রচার-ঝড় তোলে পাকিস্তান। সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটি ইন্দোনেশিয়াকে বিক্রির চেষ্টাও করেছিল ইসলামাবাদ। যদিও শেষ পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে ব্রহ্মস ‘সুপারসনিক’ ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের চুক্তি সেরেছে জাকার্তা। কিন্তু কেন?
চিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার লড়াকু জেট কিনতে নাকি লাইন লেগেছে খদ্দেরের! চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের এ-হেন দাবি ঘিরে দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় হইচই। কিন্তু, মাত্র দু’মাসের মাথাতেই হাটে হাঁড়ি ভাঙল ইন্দোনেশিয়া। ইসলামাবাদের প্রচার-ঝড়ে গা না ভাসিয়ে ভারতের সঙ্গে কয়েক কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরেছে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনবহুল দেশ, যা বেজিঙের রক্তচাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের মুখ পোড়াল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায় ভারতীয় ফৌজ। তার জেরে নয়াদিল্লির সঙ্গে চার দিনের সংক্ষিপ্ত ‘যুদ্ধে’ জড়়িয়ে পড়ে ইসলামাবাদ। লড়াই চলাকালীন রাওয়ালপিন্ডির ১১টি বিমানঘাঁটি উড়িয়ে দেয় এ দেশের বাহিনী। যদিও সংঘর্ষবিরতি হতেই বিশ্ববাজারে তাদের লড়াকু জেট, সামরিক ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারগুলি ‘যুদ্ধ-পরীক্ষিত’ বলে প্রচারে ঝড় তোলে ইসলামাবাদ।
এই ইস্যুতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিস্ফোরক দাবি করে বসে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের সরকার। ইসলামাবাদ জানায়, জেএফ-১৭ থান্ডার লড়াকু জেট, সামরিক প্রশিক্ষণ বিমান এবং সামরিক ড্রোন কিনতে আগ্রহী হয়েছে ১৩টি দেশ। তাদের মধ্যে ছয় থেকে আটটি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত পর্যায়ে আলোচনা চলেছে। বিষয়টিতে সিলমোহর পড়লে আর্থিক দুরবস্থা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যাবে বলেও লম্বা-চওড়া বিবৃতি দিয়েছিল পশ্চিমের প্রতিবেশী।
ইসলামাবাদের ওই মন্তব্যের কয়েক দিনের মাথায় পাকিস্তান সফর করেন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিকো রিকার্ডো সিরাইত। রাওয়ালপিন্ডির বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবরের সঙ্গে বৈঠকও হয় তাঁর। পরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ব্যাপারে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।’’ ঠিক তখনই একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তানের থেকে ৪০টি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে জাকার্তা।
কিন্তু, সময়ের চাকা ঘুরতেই অস্ত্রচুক্তি নিয়ে সম্পূর্ণ অন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ইন্দোনেশিয়া। ভারতের সঙ্গে ব্রহ্মস ‘সুপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে গতিশীল) ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে তারা। এই নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন খোদ প্রতিরক্ষা মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিকো। তাঁর কথায়, ‘‘নয়াদিল্লির সঙ্গে হওয়া ব্রহ্মস চুক্তি আমাদের সামরিক আধুনিকীকরণের অংশ। ওই ক্ষেপণাস্ত্র ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় শক্তি বৃদ্ধিতে আমাদের সাহায্য করবে।’’
আরও পড়ুন:
ব্রহ্মস চুক্তির আর্থিক দিকটা এখনও প্রকাশ্যে আনেনি নয়াদিল্লি ও জাকার্তা। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের দ্রুততম ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রটি হাতে পেতে আনুমানিক ২০ থেকে ৩৫ কোটি ডলার খরচ করতে চলেছে ইন্দোনেশিয়া। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিকো জানিয়েছেন, দেশের উপকূলীয় এলাকার প্রতিরক্ষাকে জোরদার করবে ব্রহ্মস। সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটির একাধিক শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। তার মধ্যে কোনটি কত পরিমাণে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার বিক্রি করতে চলেছেন, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডারের থেকে মুখ ফিরিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ব্রহ্মস চুক্তিতে সই করা একেবারেই কাকতালীয় নয়। কারণ, ‘অপারেশন সিঁদুর’ হোক বা হালফিলের ইরান যুদ্ধ, কোনও জায়গাতেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করতে পারেনি চিনা হাতিয়ার। অন্য দিকে নিখুঁত নিশানায় হামলা চালিয়ে একের পর এক ইসলামাবাদের বায়ুসেনা ঘাঁটি উড়িয়েছে ব্রহ্মস। বেজিঙের এইচকিউ-৯পি আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা ব্যবহার করেও যা আটকাতে ব্যর্থ হয় রাওয়ালপিন্ডি।
‘সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে অবশ্য ব্রহ্মসের ঘা ধামাচাপা দেওয়ার কম চেষ্টা করেনি পাক ফৌজ। তবে কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো ছবি প্রকাশ্যে আসতেই ফাঁস হয় ইসলামাবাদের যাবতীয় জারিজুরি। সূত্রের খবর, ব্রহ্মসের হামলায় মুরিদকে বিমানঘাঁটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, সেটিকে পাকাপাকি ভাবে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এয়ার চিফ মার্শাল বাবর। যদিও সরকারি ভাবে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি পশ্চিমের প্রতিবেশীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দফতর বা আইএসপিআর (ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস)।
তৃতীয়ত, গত কয়েক বছরে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ‘দৌরাত্ম্য’ বেড়েছে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌবাহিনীর। অন্য দিকে কৌশলগত দিক থেকে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ চিন সাগরের মধ্যবর্তী সরু একফালি সামুদ্রিক রাস্তা মলাক্কা প্রণালীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ওই দ্বীপরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট রুটের নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘ দিন ধরেই পেতে চাইছে বেজিং, যা জাকার্তার সঙ্গে তাদের বিরোধকে বাড়িয়ে তুলেছে।
আরও পড়ুন:
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চিনকে জোরালো ধাক্কা দিতে হলে দ্রুত ডোবাতে হবে পিএলএ নৌবাহিনীর একাধিক রণতরী। এই কাজে ব্রহ্মসের জুড়ি মেলা ভার। সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ছোট-বড় যে কোনও যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। তা ছাড়া উল্লম্ব বা হেলানো যে কোনও অবস্থান থেকে শত্রুর দিকে ছুটে যেতে পারে ব্রহ্মস। হাতিয়ারটির এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য যে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ সেনা অফিসারদের চোখ টেনেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
দক্ষিণ চিন সাগরের একটি কাল্পনিক সামুদ্রিক রেখা হল বেজিংয়ের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’। এই রেখার মধ্যে পড়ছে একাধিক দ্বীপ এবং দেশ। কাল্পনিক রেখাটির উপরে থাকা সমস্ত এলাকাকেই নিজেদের বলে দাবি করে ড্রাগন। ফলে সেখানকার ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সের মতো দেশগুলির সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে চিন। এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য ভারতের ‘ব্রহ্মস’ ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকর হবে বলেই মনে করছেন জাকার্তার সেনাকর্তারা।
রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি নয়াদিল্লির ব্রহ্মস ‘সুপারসনিক’ ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটি মূল শ্রেণি রয়েছে। রণতরী, লড়াকু জেট এবং স্থলবাহিনীর লঞ্চার থেকে একে শত্রুর উপর ছুড়তে পারে সেনা। ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্মাণকারী সংস্থার নাম ‘ব্রহ্মস এরোস্পেস লিমিটেড’। শব্দের প্রায় তিন গুণ বেশি গতিতে ছুটে গিয়ে নিখুঁত নিশানায় হামলা করতে পারে ভারতের এই ব্রহ্মাস্ত্র। ২০০৫ সাল থেকে এটি ব্যবহার করছে এ দেশের নৌবাহিনী। ডেস্ট্রয়ার এবং ফ্রিগেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজকে ব্রহ্মসে সাজিয়ে তুলেছেন তাঁরা।
অন্য দিকে ইসলামাবাদ বিমানবাহিনীর জেএফ-১৭ থান্ডার লড়াকু জেটটির মূল নির্মাণকারী সংস্থা হল চিনের ‘চেংডু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন’ (সিএসি)। বর্তমানে পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে বেজিং। সেগুলি জোড়ার (পড়ুন অ্যাসেমব্লিং) কাজ হচ্ছে ‘পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে’ (পিএসি)। এর জেরে জেএফ-১৭কে নিজেদের জেট বলে প্রচার চালানোর সুবিধা পেয়ে গিয়েছেন রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা।
এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট বহুমুখী অপারেশনে সক্ষম জেএফ-১৭ থান্ডার প্রকৃতপক্ষে একটি চতুর্থ প্রজন্মের জেট। যুদ্ধবিমানটির ইঞ্জিন আবার চিন কতটা নিজে তৈরি করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, এ ব্যাপারে সম্ভবত রাশিয়ার সাহায্য নিয়েছে বেজিং। নয়তো মস্কোর জেট ‘নকল’ করে জেএফ-১৭ নকশা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিমানটি কোন কোন ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম, তা নিয়ে বেশ ধোঁয়াশা রয়েছে। আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই শত্রুর তৈরি অস্ত্র কেনার ঝুঁকি নেয়নি ইন্দোনেশিয়া।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইন্দোনেশিয়া হাতছাড়া হলেও বেশ কয়েকটি দেশকে জেএফ-১৭ বিক্রির মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাক সরকার ও ফৌজ। সেই তালিকায় রয়েছে সুদান, নাইজ়েরিয়া, মরক্কো, সৌদি আরব, বাংলাদেশ এবং লিবিয়া। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি থাকার কারণে এই রাষ্ট্রগুলির অনেকগুলির উপরেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে চিনের অনুমোদন ছাড়া সেখানে জেএফ-১৭ ইসলামাবাদের পক্ষে বিক্রি করা একেবারেই সম্ভব নয়।
প্রতিরক্ষা নজরদার সংস্থা ‘স্টকহলমস ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর পদস্থ কর্তা সিমন ওয়েজ়ম্যান আবার রয়টার্সকে বলেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কারণে সুদান এবং লিবিয়ার মতো দেশগুলিতে যুদ্ধবিমান বিক্রি করা যায় না। ফলে কোনও অবস্থাতেই তাদের হাতে লড়াকু জেট তুলে দিতে পারবে না পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এ ব্যাপারে মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
ভারত-রুশ যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মসের প্রথম ক্রেতা ছিল ফিলিপিন্স। ২০২২ সালে ম্যানিলার সঙ্গে ৩৭.৪০ কোটি ডলারের চুক্তি করে নয়াদিল্লি। পরবর্তী বছরগুলিতে সেখানকার বাহিনীর হাতে ওই ক্ষেপণাস্ত্র তুলে দিতে দেরি করেনি কেন্দ্রের মোদী সরকার। ব্রহ্মস কেনার ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা (সাউথ আফ্রিকা) এবং চিলির মতো রাষ্ট্রেরও।
বর্তমানে ব্রহ্মসের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন এ দেশের প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের একাংশ। সেখানে সাফল্য এলে ‘হাইপারসনিক’, অর্থাৎ শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল হয়ে উঠবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র। সে ক্ষেত্রে বিশ্বের অস্ত্রের বাজারে পাকাপাকি ভাবে একটা জায়গা পেতে পারে নয়াদিল্লি, বলছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।