দাম বাড়া তো দূর, অনিশ্চয়তার মেঘেও নিম্নমুখী সোনা! কেন মিলছে না সমীকরণ? নেপথ্যে কি এক শক্তিশালী মুদ্রার কলকাঠি?
অনিশ্চিত পরিবেশে সাধারণত সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। এর আগে বার বারই ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় সোনা-সহ দামি ধাতুর দাম উঠতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু এ বার চেনা ছক একেবারে উল্টে গিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তুঙ্গে। শেয়ারবাজারে ধস। এমনকি দামে ঔজ্জ্বল্য হারাতে বসেছে সোনা-রুপোর মতো দামি ধাতুও। আর এখানেই লাগছে খটকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি খানিকটা নজিরবিহীনও বটে। অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকেই আশা করেছিলেন মূল্যবান ধাতুর দাম চড়চড় করে বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে ঠিক উল্টো।
নিরাপদ লগ্নি হিসাবে খারাপ সময়ে বরাবরই সোনা-রুপোর কদর বাড়ে। এর আগে বার বারই ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় দাম উঠতে দেখা গিয়েছে এই ধাতুগুলির। তবে এ বার ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের জেরে দেখা যাচ্ছে উলটপুরাণ। বছরের শুরুতে নজিরবিহীন ভাবে সোনা ও রুপোর দামে উত্থান দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হতেই তা নামছে হু-হু করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে অর্থনীতিতে যখন টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন সেই অস্থির পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে জমিয়ে রাখা সোনার হাতেই। নিরাপদ সম্পদ হিসাবে হলুদ ধাতুতে বিনিয়োগেই আস্থা রাখেন আমজনতা। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় চলা যুদ্ধের ফলে অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে পড়েছে তার প্রভাব। এর মধ্যে অন্যতম হল সোনা-রুপো ও খনিজ তেল।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সোনার দাম আকাশচুম্বী হয়ে রেকর্ড উচ্চতায় চলে গিয়েছিল। সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে সোনার দাম আউন্স প্রতি পাঁচ হাজার ডলারের কাছাকাছিই ঘোরাফেরা করেছে।
যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ার পর যখন দাম আর বিশেষ বাড়ছিল না, তখন তাবড় তাবড় বিনিয়োগকারী তাঁদের জমানো সোনা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন। সোনা বেচে দেওয়ার হিড়িকে দাম পড়তে শুরু করে কাঞ্চন ধাতুর। বিশ্ববাজারের ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ বলে ধরা হয় যাকে, তার মূল্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেলে সাধারণত সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পরিবহণ সঙ্কট ও চাহিদা কমার কারণে এর বিপরীত প্রবণতা দেখা গিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক দোলাচলের জেরে বহু ক্রেতাই নতুন অর্ডার দেওয়া বন্ধ করেছেন। কারণ সোনা দ্রুত সরবরাহ করার বিষয় নিয়েও নিশ্চয়তা দিতে পারেননি ব্যবসায়ীরা।
চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনার পরিবর্তে ডলারকেই আবার বিনিয়োগের নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। ডলারের সূচক শক্তিশালী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ডলারে কেনাবেচা হয়। তাই ডলারের দাম বাড়লে অন্যান্য দেশের ক্রেতাদের জন্য সোনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে সোনার চাহিদায় ভাটা পড়েছে বিশ্ব জুড়ে।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ফলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, কোনও জিনিস বা সামগ্রীর চাহিদা বাড়লে চড়তে থাকে তার দাম। ফলে দাম বাড়ছে রকেটের গতিতে। তেলের দাম বাড়লে বিশ্ব জুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন ফেডারেল রিজ়ার্ভ-সহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সুদের হার চড়া রাখতে পারে। এই অবস্থায় সোনা বা রুপোর মতো সম্পদ, যা থেকে কোনও সুদ পাওয়া যায় না তার আকর্ষণ কমে যায়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে বন্ড মার্কেটের কথা বলা যাক। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড দ্রুত গতিতে বেড়ে হয়েছে ৪.৪ শতাংশ। বিনিয়োগকারীরা যখন বুঝতে পারেন যে মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং সুদের হার কমার সম্ভাবনা নেই, তখন বাজারের সমীকরণ বদলে যায়। একেই অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘প্রাইসিং ইন’ বলা হয়।
আরও পড়ুন:
ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন কোনও বড় খবর বা ঘটনার প্রভাব যখন বর্তমান বাজারদরে (শেয়ার বা সোনার দাম) আগেই প্রতিফলিত হয়ে যায়, তখন তাকে ‘প্রাইসিং ইন’ বলা হয়। বিনিয়োগকারীরা সব সময় ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যদি তাঁরা আশঙ্কা করেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ আরও বাড়বে বা মার্কিন ফেডারেল রিজ়ার্ভ সুদের হার কমাবে না, তবে তাঁরা সেই অনুযায়ী সোনা, রুপো বা তামা কেনাবেচা শুরু করবেন। ফলে যে দিন সরকারি ভাবে ঘোষণা আসবে যে সুদের হার কমছে না, সে দিন হয়তো দাম আর নতুন করে কমবে না। এটাই ‘প্রাইসিং ইন’-এর খেলা।
বড় অঙ্কের বিনিয়োগকারীদের জন্য সুদের হার বৃদ্ধি রাতারাতি বিনিয়োগের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। যখন ট্রেজ়ারি বন্ডে বিনিয়োগ হঠাৎ করে লাভের মুখ দেখাচ্ছে, তখন শূন্য সুদে সোনা ধরে রাখার মধ্যে কোনও বাস্তবতা খুঁজে পাচ্ছেন না বড় বিনিয়োগকারীরা।
আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার জেরে অনেকেই সোনায় লগ্নি সরিয়ে তা ডলারে বিনিয়োগ করছেন। ফলে হঠাৎ করেই বাজারে কমেছে হলুদ ধাতুর চাহিদা। মূলত তেল এবং ডলার লগ্নি টানছে। জ্বালানি এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চিন্তাও লগ্নি কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞেরা এটাও মনে করছেন, দুই ধাতুর দাম অতিরিক্ত দ্রুত গতিতে চড়েছিল। ফলে এই বুদ্বুদ ফাটা স্বাভাবিক। ঠিক যে ভাবে শেয়ারবাজার অনেকটা উপরে ওঠার পরে লগ্নিকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার কারণে বিভিন্ন শেয়ারের দর কিছুটা নেমে আসে। এতে বাজারে ভারসাম্য ফেরে।
শেয়ারবাজারও লাভের মুখ দেখাতে পারেনি বিনিয়োগকারীদের। শেয়ারবাজারে ধস নামলে অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা তাদের লোকসান সামাল দিতে বা নগদের প্রয়োজনে সোনা বিক্রি করে দেন। বর্তমানের অস্থির বাজারেও সেই প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
কয়েক মাস আগে বিদেশের বেশ কয়েক জন আর্থিক বিশ্লেষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সোনার দাম তার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে। সোনা নিয়ে তীব্র জল্পনা ও অতিরিক্ত প্রচারের কারণে হলুদ ধাতুর দাম আকাশছোঁয়া। সোনা ও রুপোর মতো ঐতিহ্যশালী সম্পদ ঘিরে বুদ্বুদের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।
সোনার দাম রেকর্ডমাত্রা ছুঁয়ে ফেলার প্রবণতাকে খুব একটা ভাল চোখে দেখেননি পোড়খাওয়া অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা। বিশ্ব জুড়ে সোনার দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের আগেভাগেই সতর্ক করেছিলেন জেপি মরগানের চেয়ারম্যান এবং সিইও জেমি ডিমন। তাঁর মতে, বিশ্ববাজারে সম্পদের দামকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ঐতিহাসিক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আমেরিকার শীর্ষ ব্যাঙ্ক ফেডারাল রিজ়ার্ভ সুদ কমানোর ফলে লগ্নিকারীরা সুরক্ষিত গন্তব্য হিসাবে সোনাকে বেছে নিয়েছিলেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে তা রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলে। ডলার তার নিজের শক্তি দেখাতে শুরু করতেই সমস্ত ছকে বাঁধা হিসাব উল্টে গিয়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ সোনা ও রুপোর মতো ধাতুর দাম বৃদ্ধিকে একটি সতর্কীকরণের লক্ষণ বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা মনে করছেন একমুখী বিনিয়োগের দিকে দৌড়োনো বোকামির নামান্তর।