প্রেমে বাধা দেওয়ায় পুলিশ বাবাকে বিষ মেশানো মিল্কশেক খাইয়ে খুন করেন পুলিশ কন্যা! তিন বছর পর ধরিয়ে দিলেন সেই প্রেমিকই
পুলিশ সূত্রে খবর, কন্যার প্রেমের বিরোধিতা করেছিলেন জয়ন্ত। জানিয়ে দিয়েছিলেন, কিছুতেই আশিসকে বিয়ে করতে পারবেন না আর্যা। এর পরেই নাকি ‘পথের কাঁটা’ উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন যুগল।
২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল। ডিউটির জন্য বাড়ি থেকে বার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মহারাষ্ট্র পুলিশের কনস্টেবল জয়ন্ত বল্লাওয়ার। বছর ৪৫-এর জয়ন্ত যখন বাড়ির বাইরে পা দিতে যাবেন, এমন সময় তাঁর দিকে মিল্কশেকের গ্লাস এগিয়ে দেন কন্যা। হাসিমুখে কন্যার দেওয়া পানীয় খেয়ে বেরিয়ে যান তিনি।
মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুরে জেলাশাসকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে পৌঁছোনোর আগেই মাথা ঘুরতে শুরু করে জয়ন্তের। জেলাশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আর উঠতে পারেননি। জয়ন্তকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
জয়ন্তের মৃত্যুর কারণ হিসাবে রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘হঠাৎ অসুস্থ’ হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। অস্বাভাবিক কারণে মৃত্যু হতে পারে, এমনটা সে সময় সন্দেহ করেননি কেউ। কোনও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণও মেলেনি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধ করে দেওয়া হয় পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যুর ফাইল।
এর পর তিন বছর পেরিয়ে গিয়েছে। অনেক জল পেরিয়ে গিয়েছে গোদাবরী দিয়ে। সম্প্রতি আবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে জয়ন্তের মৃত্যুরহস্য। বলা ভাল জয়ন্তের হত্যারহস্য। অন্তত তেমনটাই অভিযোগ উঠেছে।
আর সেই রহস্যের জট খুলতে গিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে তদন্তকারীদের হাতে। জয়ন্তের মৃত্যুর তিন বছর পর তাঁকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে চার জনকে।
আরও পড়ুন:
চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, ওই চার জনের মধ্যে মূল অভিযুক্ত জয়ন্তেরই কন্যা। সেই কন্যা, যিনি বাবার মৃত্যুর আগে তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন মিল্কশেকের গ্লাস। আর সেই মিল্কশেক খাওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় জয়ন্তের।
জয়ন্তের মেয়ের নাম আর্যা বল্লাওয়ার। ঘটনাচক্রে, আর্যা নিজেও পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধেই পুলিশ কনস্টেবল বাবাকে খুনের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীরাও বিষয়টিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
আর্যার পাশাপাশি ওই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর স্বামী আশিস মহেশ শেডমাকেকেও। ২০২২ সাল থেকে সম্পর্কে ছিলেন আশিস এবং আর্যা। আশিসও মহারাষ্ট্র পুলিশে কর্মরত ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে খবর, কন্যার প্রেমের বিরোধিতা করেছিলেন জয়ন্ত। জানিয়ে দিয়েছিলেন, কিছুতেই আশিসকে বিয়ে করতে পারবেন না আর্যা। এর পরেই নাকি ‘পথের কাঁটা’ উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন যুগল। উল্লেখ্য, জয়ন্তের মৃত্যুর সময় আর্যা এবং আশিস মহারাষ্ট্র পুলিশে কর্মরত ছিলেন না। ২০২৫ সালে প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁদের।
আরও পড়ুন:
আর্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আশিসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মেনে না নেওয়ার কারণে বাবাকে খুনের ছক কষেন তিনি। এর জন্য ২২ বছর বয়সি তুতো ভাই চৈতন্য গেদামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
জানা গিয়েছে, পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে চৈতন্যই বিষ জোগাড় করেছিলেন আর্যার জন্য। চতুর্থ অভিযুক্ত (নাবালক) বিষ পৌঁছে গিয়ে এসেছিল আর্যার হাতে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জয়ন্তের মৃত্যুর দিন সকালে আর্যা সেই বিষই মিশিয়ে দেন মিল্কশেকে। মেয়ের দেওয়া সেই মিল্কশেক খেয়ে ডিউটিতে বেরিয়ে যান জয়ন্ত।
জেলাশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছোনোর আগেই বিষের কারণে মাথা ঘুরতে শুরু করে জয়ন্তের। গন্তব্যে পৌঁছোনোর পর বিষের প্রভাব আরও প্রকট হয়। যে হেতু মৃত্যু স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল, তাই সে সময় কোনও ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। মামলাও খারিজ হয়ে যায়।
কিন্তু কী ভাবে তিন বছর পর জয়ন্ত হত্যারহস্যের উদ্ঘাটন হল? আর্যা ধরা পড়লেন সেই প্রেমের জন্যই, যে কারণে তিনি বাবাকে খুন করতেও পিছপা হননি!
পুলিশ সূত্রে খবর, জয়ন্তের মৃত্যুর পরেই বিয়ে করেন আর্যা এবং আশিস। কিন্তু তাঁদের সংসার সুখের হয়নি। দাম্পত্যজীবনে দ্রুতই তিক্ততা আসে। বিয়ের পরে আশিস নিজেও পুলিশ হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। কিন্তু শৃঙ্খলাহীনতা এবং খারাপ আচরণের কারণে আশিসকে পুলিশ প্রশিক্ষণ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
অন্য দিকে আর্যা শ্বশুরবাড়ি না গিয়ে তাঁর বাবা-মায়ের বাড়িতেই বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। এই বিষয়গুলি নিয়ে দম্পতির মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া বাধত। তিন বছরের মধ্যে আশিস এবং আর্যার জীবনে অশান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আর সহ্য করতে পারেননি আশিস।
গত সপ্তাহে থানায় গিয়ে মহারাষ্ট্র পুলিশের কনস্টেবল তথা শ্বশুর জয়ন্তকে খুনের ছক কষার কথা স্বীকার করেন আশিস। স্বীকারোক্তি দেন, তিন বছর আগে স্ত্রী আর্যাই তাঁর বাবাকে বিষ খাইয়ে খুন করেন। এ-ও জানান যে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং আর্যাকে বিষ জোগাড় করে দিয়েছিলেন তাঁর তুতো ভাই চৈতন্য।
এর পরেই জয়ন্তের মৃত্যুর তিন বছর পর তাঁর খুনের কিনারা করতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে নেমেই জয়ন্তের কন্যা আর্যা, জামাই আশিস, চৈতন্য এবং চতুর্থ এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। চার জনই আপাতত পুলিশি হেফাজতে আছেন বলে খবর।
পুলিশের অনুমান, আর্যার সঙ্গে ঝগড়ার জেরেই জয়ন্তকে খুনের তথ্য ফাঁস করেন আশিস। পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং মিথ্যা বিবৃতি সম্পর্কিত ফৌজদারি ধারা প্রয়োগ করেছে। বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।