নির্বাচনী পর্যবেক্ষক থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর উপদেষ্টা, কী ভাবে দুঁদে আমলা হয়ে উঠলেন ক্ষেপণাস্ত্র গবেষক সুব্রত গুপ্ত?
রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপদেষ্টা হিসাবে কাজ শুরু করলেন দুঁদে বাঙালি আমলা সুব্রত গুপ্ত। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করতে করতে আইএএস পরীক্ষা দিয়ে সারা ভারতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন তিনি।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) থেকে শুরু করে রাজ্যে দু’দফায় হওয়া বিধানসভা নির্বাচন। তাঁর হাত ধরে গত ছ’মাসে পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে বাংলার ‘ভোট সংস্কৃতি’। ফলে এ বারের নির্বাচন হয়েছে প্রায় শান্তিপূর্ণ। শুধু তা-ই নয়, ভোটদানের হার ৯০ শতাংশের বেশি হওয়ায় সারা দেশে রেকর্ড গড়েছে পশ্চিমবঙ্গ। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সেই ‘সেনাপতি’ তথা দুঁদে বাঙালি আমলাকে এ বার নিজের উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ করলেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি, সুব্রত গুপ্ত। ৯ মে, শনিবার ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই উপদেষ্টা হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। বিধানসভা নির্বাচন চলাকালীন বিশেষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ভোট মিটতেই সেই কাজ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেয় কমিশন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরও বড় চ্যালেঞ্জ এবং নতুন দায়িত্ব পেলেন ১৯৯০ ব্যাচের আইএএস সুব্রত।
আইআইটি খড়্গপুরের ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তনী সুব্রত ইউপিএসসি পরীক্ষায় গোটা দেশে চতুর্থ স্থান পেয়েছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে পিএইচডি করতে করতেই ওই পরীক্ষা দেন তিনি। ফলে কিছুটা থমকে যায় তাঁর গবেষণার কাজ। তবে হাল ছাড়েননি এই দুঁদে বাঙালি আমলা। অতিরিক্ত জেলাশাসক থাকাকালীন পিএইচডি শেষ করেন তিনি। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী তথা প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের নেতৃত্ব একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে তাঁর।
অর্থ দফতরের যুগ্ম সচিব থাকাকালীন বাজেট ব্যবস্থায় আমূল বদল আনেন সুব্রত। তাঁর নেতৃত্বে হাতে লেখার পরিবর্তে শুরু হয় কম্পিউটার পরিচালিত বাজেট। এ ছাড়া রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন নিগমের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। তাঁর আমলে বাংলার বিভিন্ন শিল্পতালুক এবং অন্ডাল বিমাননগরীর জমি অধিগ্রহণ করতে সক্ষম হয় রাজ্য প্রশাসন। এ ছাড়া ‘ইস্ট ওয়েস্ট’ মেট্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গোড়ার দিকের অন্যতম রূপকার ছিলেন এই বাঙালি আমলা।
দীর্ঘ চাকরিজীবনে একাধিক দফতরে কাজ করেছেন সুব্রত। সামলেছেন সচিব, প্রধান সচিব এবং অতিরিক্ত মুখ্যসচিবের দায়িত্ব। তবে তৃণমূল আমলে রাজ্য সরকারের খুব একটা ‘সুনজরে’ ছিলেন না তিনি। ফলে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দফতরে কাটাতে হয় তাঁকে। অবসরের ছ’মাস আগে কেন্দ্রের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প মন্ত্রকের সচিব হন তিনি।
আরও পড়ুন:
২০২৫ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নেন সুব্রত গুপ্ত। গত অক্টোবরে নির্বাচন কমিশন এ রাজ্যে শুরু করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)। ওই সময় সুব্রতকে বিশেষ রোল পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করে তারা। অচিরেই কমিশনের চোখ-কান হয়ে ওঠেন তিনি। যদিও ওই সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল।
ঘাসফুল শিবির সুব্রতের কর্মদক্ষতা নিয়ে ‘বাঁকা’ কথা বললেও তাঁকে পদ থেকে সরায়নি কমিশন। উল্টে এসআইআরের কাজে বিশেষ রোল পর্যবেক্ষক হিসাবে তাঁর ভূমিকায় যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিল কমিশন। ফলে রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিশেষ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পান তিনি। তাঁর নেতৃত্বে সেখানেও নজরকাড়া সাফল্য পেয়েছে কমিশন।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভোটের প্রচার চলাকালীন নাম না করে সুব্রত গুপ্তকে বেশ কয়েক বার খোঁচা দেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল ‘সুপ্রিমো’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি, আদালতে এসআইআর মামলাতেও তাঁর ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজ্য সরকার। ভোটপর্বেও তাঁকে নিয়ে নানা অভিযোগ তোলে ঘাসফুল শিবির। এর কোনও রকম উত্তর না দিয়ে কর্তব্যে অবিচল ছিলেন ৯০-এর দশকের দুঁদে বাঙালি আমলা।
গত ৪ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিনে কমিশনের সাফল্যের রহস্যফাঁস করেন সুব্রত গুপ্ত। গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘ভোটের সময় গোলমাল পাকানো অপরাধীদের প্রশাসনের তরফে একটা স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল। হয় ঘরে থাকো, নয় শ্রীঘরে। এতেই কাজ হয়েছে ম্যাজিকের মতো। কেউ বুথে গিয়ে বা রাস্তায় গোলমাল করেননি। ফলে বাংলার জনগণ নির্ভয়ে নিজের ভোট দিতে পেরেছেন।’’
আরও পড়ুন:
মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসাবে নাম ঘোষণার পরও সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন সুব্রত গুপ্ত। বলেন, ‘‘এটা একটা বিরাট বড় দায়িত্ব। আর তাই সকলের সহযোগিতা চাইব। বাংলার মানুষের আশীর্বাদ চাইব।’’ উপদেষ্টা হিসাবে কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চলেছেন, তা-ও স্পষ্ট করেন তিনি। ১০ মে, রবিবার থেকেই নতুন পদে কাজ শুরু করে দিয়েছেন খড়্গপুর আইআইটির প্রাক্তনী।
সুব্রত জানিয়েছেন কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা, উপদেষ্টা হিসাবে এই পাঁচটি বিষয়ের দিকে সর্বাপেক্ষা নজর থাকবে তাঁর। শিল্পায়ন সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এটা কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এই রাজ্যে শিল্প আসতে সময় লাগবে। সেটা রাতারাতি করা সম্ভব নয়। যদিও কাজটা এখনই শুরু করতে হবে। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে বাংলা যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে যেতে চাই।’’
অতীতে তৃণমূল আমলে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বহাল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি। সুব্রতের নিয়োগের পর একই কথা জিজ্ঞাসা করেছে ঘাসফুল শিবির। তা হলে কি তৃণমূলের রীতি বজায় রেখেই অবসরপ্রাপ্তদের পুনর্বহাল চালিয়ে যাবে রাজ্য সরকার? শপথ নেওয়ার পর সরাসরি এর জবাব দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শনিবার, ৯ মে সুব্রত গুপ্তের নিয়োগ প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, ‘‘যাঁর বাংলার অত্যন্ত মেধাবী আইএএস অফিসার, তাঁদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যবহার করেননি।’’ এ ব্যাপারে সঞ্জয় মিত্র এবং মলয় দে-র উদাহরণ দেন তিনি। পরে তিনি আরও বলেন, ‘‘সুব্রত গুপ্তের মতো লোকদের সাহায্য নিতে হবে। কারণ, আমরা নীতি নির্ধারক, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেব। সেটা কার্যকর করার ব্যাপারটা বুঝবেন আমলারা।’’
অশান্তিহীন ভোট পরিচালনায় সুব্রতের পাশাপাশি ষোলো আনা কৃতিত্ব রয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের। আধিকারিক মহলে জোর গুঞ্জন, তাঁকে মুখ্যসচিব হিসাবে বেছে নিতে চলেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সে ক্ষেত্রে ফের একবার মনোজ-সুব্রত যুগলবন্দিতে এগোবে বিজেপিশাসিত বাংলার প্রশাসন।
শুভেন্দু অধিকারীর শপথের দিনে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হিসাবে শান্তনু বালার নাম ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। ২০১৭ ব্যাচের আইএএস অফিসার তিনি। আমলা হওয়ার আগে সুব্রতের মতো শান্তনুও ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। মহকুমাশাসক এবং বিভিন্ন জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।
এ বছরের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে কোচবিহার থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় শান্তনুকে অতিরিক্ত জেলাশাসক করে কমিশন। ভোটপর্বে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অতিরিক্ত জেলাশাসক (নির্বাচন)-এর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ৪৬টি দফতরের মন্ত্রীর সচিব পদে থাকা ডব্লিউবিসিএস (এক্জ়িকিউটিভ) স্তরের বিগত তৃণমূল সরকারের সব আধিকারিককে বদলি করেছে রাজ্য। সূত্রের খবর, মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে সমস্ত জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
পাশাপাশি, নতুন করে তৈরি হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর বা সিএমও (চিফ মিনিস্টার্স অফিস)। আগের সরকারের ১৬ জন আধিকারিককে কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতরে (পার) যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পৃথক একটি আদেশনামায় দার্জিলিং পুলবাজারের বিডিও অফিসে বদলি হয়েছেন ‘আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট’ প্রতাপ নায়েক। তৃণমূল প্রভাবিত সরকারি কর্মচারী সংগঠন ফেডারেশনের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তিনি।