E-Paper

দেখা হবে

এ বাড়িতে এলে প্রিয়তোষকে খবর পাঠাতেন ডাক্তারবাবু। প্রিয়তোষ অনেক সময় টিউশন বাদ দিয়েও চলে আসত। সন্ধের পর দু’জন হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন নদীর দিকে।

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ০৬:২৭
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: ফোনে খবর পেয়েই মনোতোষকে হাসপাতালে দেখতে চলে এল নন্দা। অ্যাক্সিডেন্টের কথা নন্দাকে আগে জানানো হয়নি বলে খুব রাগারাগি করল ও। অনেক কথা হল নন্দার সঙ্গে মনোতোষের। যাওয়ার সময় নন্দা বলে গেল মনোতোষ যেন তার স্কুটারটা বিক্রি করে দেয়। কিন্তু যে জরুরি দরকারে নন্দা মনোতোষকে ফোনে ধরার চেষ্টা করছিল, সেই কথাটা বলতেই ভুলে গেল। অন্য দিকে বকুলডাঙায় ইলেকশনে জিতে বিভূতি লস্কর চেয়ারম্যান হল সেই অঞ্চলের। তাকে সামনে রেখে বিরাট বিজয়মিছিল এলাকা পরিক্রমা করল। অত বড় মিছিল বকুলডাঙায় তার আগে হয়নি। বিভুর দোকানের সামনে এসে বিস্তর বোমা-পটকা ফাটিয়ে তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিল। বিভুর মনে হল, ওদের দাবি মতো চাঁদার টাকা দেয়নি বলেই হয়তো ওর অফিসের সামনে এই উল্লাসের প্রদর্শন। এর ১৫ দিন পরে বিভুর দু’জন ক্যারিয়ার হঠাৎই নিরুদ্দেশ হল এবং তাদের বিকৃত মৃতদেহ পাওয়া গেল জঙ্গলের ভিতরে।

আজ রাত এখানেই, এই জঙ্গলের পাশেই কাটাতে হবে, বুঝতে পারল উদয় আর ভোলা।

আচমকাই জোরালো টর্চের আলো পড়ল উদয়ের মুখে। চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার। এক সেকেন্ডের হতচকিত ভাবের ভিতরেই টের পেল, পিছন থেকে কেউ এক জন তার ঘাড়ে প্রচণ্ড জোরে রদ্দা মেরেছে। আঘাতটা হয়েছে একদম মোক্ষম জায়গায়। কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল উদয়। বিপদ বুঝে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ভোলার পা আপনা হতেই সক্রিয় হয়ে উঠল। এক পা দৌড়তেই কেউ তাকে লেঙ্গি মেরে মাটিতে ফেলে দিল। তার পর খুব দ্রুত তার মুখ কিছু দিয়ে কষে বাঁধল। অন্ধকারে কিছু বুঝতে পারছিল না ভোলা। তার মোবাইল মাটিতে পড়ে আছে, জ্বলছে। নড়াচড়ার সাহস পেল না ভোলা। উদয়ের মতো তাকেও আধমরা করে ফেলে রাখবে হয়তো। ডাকাতি করতে এসেছে, কিন্তু তাদের কাছে আর কত টাকাই বা পাবে। হঠাৎ মনে হল, গাড়ির মাল লুট করবে নাকি! বিভু সমাদ্দারের বিরাট লস হয়ে যাবে তা হলে।

আবছা অন্ধকারে ভোলা দেখল, চার-পাঁচ জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। দু’জন উদয়কে চ্যাংদোলা করে তুলে নিল। আরও দু’জন তুলল ভোলাকে। একটু দূরে জঙ্গলে আলো জ্বলে উঠল। মোটরবাইকের শব্দ পেল ভোলা। একটা নয়, অনেকগুলো বাইকের শব্দ। গাড়ি পড়ে রইল, ওদের দু’জনকে নিয়ে বাইকের শব্দের দিকে রওনা দিল দলটা। এক জন শুধু রয়ে গেল গাড়ির কাছে। সম্ভবত ওদের কাছে অন্য গাড়িও আছে। আশপাশে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। এ গাড়ির মাল অন্য গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবে। ভোলা আর উদয়কে আর কোনও দিন কেউ কোথাও দেখতে পায়নি। খালি গাড়ি পড়ে ছিল নতুন পথে, জঙ্গলের পাশে।

বিভু সমাদ্দারের কাছে খবর পৌঁছলে প্রথমেই তারক শীলের মুখ আর বিভূতি লস্করের ঠান্ডা চোখের চাউনি তার মনে পড়ল। অনেক, অনেক টাকার ক্ষতি হয়ে গেল তার। দেখা যাক, ওরা কত দূর যেতে পারে।

১১

অনেক দিন বাদে পলাশগুড়ির বকুলডাঙার বাড়িতে এসেছেন রামপ্রিয় সান্যাল। বাড়িতে কিছু ভাল রেকর্ড এখনও রয়ে গেছে। অ্যাস্ট্রোনমির কিছু দামি বই রয়েছে। সেগুলো নিয়ে যাবেন। বিষয়সম্পত্তি নিয়েও ভাবনাচিন্তা করা দরকার। মাদারিহাটে একটা বাড়ি কিনে রেখেছেন, ওটা মনমায়ার নামে লেখাপড়া করে রাখতে হবে। এদিকেও ঘরবাড়ি, জমিজমা কম নয়। এক সময় প্রিয়তোষ এ-সব হিসেবপত্র রাখত। মন্টুর জন্মের পর প্রিয়তোষের স্ত্রী মারা যায়। পরে লক্ষণ শুনে তিনি বুঝেছিলেন, এক্লাম্পশিয়ায় তার বৌ মারা যায়। নিউবর্ন বেবি নিয়ে খুবই আতান্তরে পড়ে গিয়েছিল প্রিয়তোষ। তখন ওরা নদীর পারের নেতাজিনগর কলোনিতে থাকে। পুরনো পরিচয়ের সূত্রে প্রিয়তোষ মাঝে মাঝে আসত। তারও আসা-যাওয়া ছিল। প্রিয়তোষের বৌ বেলার সঙ্গে বসে গল্প করার একটা অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

বয়সে বেশ কিছুটা ছোট হলেও এক রকম সখ্য ছিল প্রিয়তোষের সঙ্গে। সেটা হয়তো প্রিয়তোষেরও গানবাজনার প্রতি ভালবাসার জন্য। অনেক বার তাকে দিয়ে শিলিগুড়ি থেকে দরকারি জিনিস আনিয়েছেন। এক বার কলকাতাতেও পাঠিয়েছিলেন ভাল একটা ব্লাডপ্রেশার মাপার যন্ত্র আনাতে। প্রিয়তোষ এনে দিয়েছিল। স্রেফ গান শিখিয়ে তার সংসার চলত। কিন্তু তারও ছিল অসম্ভব গানবাজনার নেশা। দু’জনেরই প্রিয় গায়ক-গায়িকা মিলে গিয়েছিল। এমনকি যেদিন রামপ্রিয় জানতে পারলেন প্রিয়তোষেরও প্রিয় রাগ ভীমপলশ্রী, জড়িয়ে ধরেছিলেন প্রিয়তোষকে। তিনি গেয়ে উঠেছিলেন এই রাগের একটি বন্দিশ। সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়তোষ একদম ঠিক ঠিক সুর লাগিয়ে তাকে সঙ্গত দিয়েছিল। প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলেন রামপ্রিয়।

সেই শুরু, তার পর এক দিন প্রিয়তোষকে তিনিই বলেছিলেন কলোনির ঘর ছেড়ে মন্টুকে নিয়ে এখানে এসে থাকতে। আসলে তাঁর ভিতরে অপরাধবোধ ছিল। হয়তো ভেবেছিলেন এভাবে কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করবেন। একটু ইতস্তত করেছিল প্রিয়তোষ। এখানে এসে থাকলে তার টিউশনিগুলো চালানো মুশকিল। সে মুশকিল তিনি আসান করে দিলেন এ বাড়ির ঘরসংসার আর জমিজমার দায়িত্ব দিয়ে। গানের টিউশনির চেয়ে বেশিই রোজগারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। একটা হারমোনিয়াম, সংসারের সামান্য জিনিস আর মন্টুর হাত ধরে তিনি এ-বাড়ি চলে এসেছিলেন।

পলাশগুড়িতে তখন মানুষের চেয়ে মাঠ আর পুকুর ছিল বেশি। রামপ্রিয় সান্যালের সঙ্গে তখনও তাঁর রাঁধুনি মনমায়ার সম্পর্ক ঘন হয়ে ওঠেনি। তার বৌ চন্দ্রার পুজো-পুজো বাতিক আর সর্বত্র ধুলো খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা অতটা বাড়েনি। অবশ্য, পথে যখন ডাক্তারবাবুর বৌ হেঁটে যেতেন, দেখে মনে হত তিনি এক্কাদোক্কা খেলতে খেলতে হাঁটছেন। কারণ, পথে পড়ে থাকা ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, কাগজের টুকরো, প্লাস্টিক— প্রতিটি ছিল তাঁর কাছে সন্দেহজনক বস্তু। নিশ্চিত ভাবেই এগুলো কেউ তাঁর সর্বনাশ করার জন্য পথে সাজিয়ে রেখেছে। তাঁর ভাল কেউ সহ্য করতে পারছে না। সেগুলো এড়িয়ে লাফিয়ে চলা ছাড়া উপায় কী! নইলে ডাক্তারবাবু আজকাল এত দিন বাদে বাদে এখানে আসছেন কেন! বাগানে কী এমন মধু আছে? পুরুষমানুষকে তাঁর হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে। ডাক্তার না ছাই! আজ পর্যন্ত কোনও দিন তাঁর শরীরের ভালমন্দের খোঁজ নিল না। প্রথম প্রথম সপ্তাহে এক দিন করে আসত। পরে সেটা গিয়ে দাঁড়াল মাসে এক বার। তার পর ন’মাসে ছ’মাসে এক বার। তাঁকে যে পছন্দ হয়নি, সেটা তো স্পষ্টই বোঝা যায়। পরে তো শুনেছেন যে, লোকটার নাকি বিয়েতেই ভীষণ আপত্তি ছিল। করল কেন বিয়ে! তাঁর কি অন্য কোনও বর জুটত না। ঢের জুটত। ময়নাগুড়ির ওরা তো পাকা কথা প্রায় দিয়েই বসেছিল। এদিকে ডাক্তার পাত্র শুনে সেটা নাকচ করা হল। তাঁর মুখে লক্ষ্মীর পাঁচালি শুনে ছেলের ঠাকুমা কথা দিয়েছিলেন, এই মেয়েকেই তিনি নাতবৌ করবেন। শরৎপূর্ণিমা নিশি নির্মল গগন, মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় পবন/ লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ, বৈকুণ্ঠধামেতে বসি করে আলাপন... পাঁচালি শুনে দিদিশাশুড়ি তাঁর চিবুক ধরে আদর করেছিল। বাসরঘরে লোকটা রাতভর জানালা খুলে আকাশের তারা গুনল। অথচ তিনি ভেবে বসেছিলেন, নতুন বরকে শিবস্তোত্রম্ শোনাবেন। সেদিনই বুঝেছিলেন, তিনি যা চাইবেন, সেটা তাঁর কপালে লেখা নেই।

এ বাড়িতে এলে প্রিয়তোষকে খবর পাঠাতেন ডাক্তারবাবু। প্রিয়তোষ অনেক সময় টিউশন বাদ দিয়েও চলে আসত। সন্ধের পর দু’জন হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন নদীর দিকে। কখনও ঘাটে মাঝি ইন্দ্রমোহনের চালার নীচে, কখনও মাঠে ঘাসের উপর বসে গল্প করতেন।

“প্রিয়, সেই গানটা কর না ভাই, ওই যে... জ্বলতে হ্যায় জিসকে লিয়ে তেরি আঁখো কে দিয়ে, ঢুন্ড লায়া হু ওহি গীত ম্যায় তেরে লিয়ে...”

“তালাত মাহমুদ। রামুদা, এ গানটা তোমার খুব প্রিয়, তাই না? এর আগেও অনেক বার শুনতে চেয়েছ। এই টাইপের গান তুমি খুব পছন্দ করো। আমরা যাকে ট্র্যাজিক সং বলি। কিছু মনে কোরো না রামুদা, তোমার ভিতরে কোথাও একটা কষ্ট আছে, আমি ঠিক টের পাই। কিছুরই অভাব নেই তোমার, ডাক্তার হয়েছ, চা-বাগানের ডাক্তারবাবু, তবু যেন...”

“আমি তো ডাক্তার হতে চাইনি প্রিয়। আমার তো কথা ছিল প্রাণভরে শুধু গান শুনব। ভাল গাইতে পারি না। কিন্তু ভাল গান শুনলে আমার চোখে জল আসে কেন বল! আর, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ। ওই যে উত্তর আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল, দ্য গ্রেট বেয়ার। অত্রি, অঙ্গিরা, মরীচি, বশিষ্ঠ, পুলহ, পুলস্ত্য, ক্রতু। ওই দেখ কালপুরুষ। অরিয়ন। আমাদের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা কোনটা জানিস? কালপুরুষ দেখতে পাচ্ছিস তো, ওর নীচের দিকে নাম, বাঁ দিকে তাকা। দেখতে পাচ্ছিস, খুব উজ্জ্বল একটা নক্ষত্র। ওটাই লুব্ধক। সাইরিয়াস।”

“পাচ্ছি, কিন্তু ওর চেয়ে তো সন্ধ্যাতারাও বেশি উজ্জ্বল দেখায়। এটা কী করে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হবে?”

“আরে ওটা তো গ্রহ, শুক্রগ্রহ। পৃথিবীর অনেক কাছে থাকে। নক্ষত্র তো অনেক অনেক দূরের ব্যাপার। তা ছাড়া নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা মাপার অন্য মাপ আছে, সে তুই বুঝবি না। আপাত মাত্রা দিয়ে তারার উজ্জ্বলতা মাপা হয়। মাত্রা যত কম, উজ্জ্বলতা তত বেশি। জানিস প্রিয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য, সৃষ্টির রহস্য যত ভাবি, তত আমার মাথার ভিতরে কেমন করে ওঠে। কোথা থেকে এল আদিম সেই ধূলিকণা? বস্তুপিণ্ডের আকার নিল, এক দিন মহাবিস্ফোরণে ফেটে পড়ল। কবে থেকে সময় শুরু হল বল তো? আসলে কাকে বলে সময়? জানিস, ছোটবেলা থেকেই এ-সব ভাবতাম। বই জোগাড় করে পড়তাম। ডাক্তার হতে চাইনি রে আমি। ভেবেছিলাম অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স নিয়ে পড়াশোনা করব, দারুণ একটা টেলিস্কোপ থাকবে আমার, খুঁজে দেখব আকাশের দূরতম নক্ষত্র আর প্রাণভরে গান শুনব। আর এখন আমাকে চা-বাগানের লেবারের পিলে টিপে বলতে হয় আর হাঁড়িয়া খেয়ো না... না, কষ্ট কিসের! ভালই আছি। নে, গান শোনা।”

প্রিয়তোষ ডাক্তারবাবুর গলায় জমে থাকা কান্না শুনতে পেল। “ভালই আছি,” এই কথা হাহাকারের মতো শোনাল। তারও কষ্ট হচ্ছিল রামপ্রিয় সান্যালের জন্য। একটু চুপ থেকে সে গেয়ে উঠল সুধীরলাল চক্রবর্তীর বিখ্যাত সেই গান, ‘খেলাঘর মোর ভেসে গেছে হায় নয়নের যমুনায়, মালতীর মালাখানি রেখে গেল অভিমানী...’

ঘাসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন রামপ্রিয় সান্যাল। কৃষ্ণপক্ষের নির্মেঘ আকাশ। আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র নক্ষত্রপুঞ্জ। যেন উর্বর কোনও জমিতে ফসল ফলিয়ে রেখেছে এক কৃষক। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিঃসীম এক সঙ্গীত শুনতে পাচ্ছিল রামপ্রিয়। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এক গান বেজে চলে অনন্তধারায়। বড় বেশি সাংসারিক কোলাহলে মানুষ সে গান শুনতেই পায় না। আর যে শোনে, তার বড় কষ্ট।

“ওঠো রামুদা, বাড়ি ফিরবে না? এবার ক’টা দিন বেশি থেকে যাও না। জানো, শিলিগুড়ির পাল কোম্পানি থেকে হারমোনিয়ামটা সারিয়ে এনেছি। ভাল কাজ জানে লোকটা। দারুণ টিউনিং করে দিয়েছে। বেলোতে লিক ছিল, হাওয়া থাকত না। সব ঠিকঠাক করে এনেছি। ইচ্ছে ছিল মন্টুকে গানের তালিম দেব। ওর হবে না। সুরের আন্দাজ নেই ওর। আমার গানের ঝুলি আমাকেই নিয়ে ফিরতে হবে। অবশ্য এক জন ছাত্রী আছে, নিলু। নীলিমা পাল। একদম ব্লটিং-পেপার। যা শোনে, যা শেখাই, একদম শুষে নেয়। সব ওকেই দিয়ে যাব আমি। কাউকে তো দিয়ে যেতেই হয়, বলো।”

“বয়স কত মেয়েটার? সুন্দরী?”

“যাহ্‌, কী যে বলো রামুদা। ও তো প্রভাতদার মেয়ে। টাবুদার কথা তোমার মনে নেই? সেই যে, ক্লাবে পনেরোই অগস্টে অবিরাম সাইকেল চালনা দেখাত। আমরা কলোনি থেকে দেখতে আসতাম। ‘শুকতারা’ নামে একটা গ্রুপ করেছিল। পাড়ার ছেলেদের নিয়ে প্রভাতফেরি করত। ‘নেতাজির আদেশ’ খেলা শেখাত। টাবুদাই তো প্রভাত বাগচি। মেয়েটার সুরের আন্দাজ খুব ভাল।”

“ঠিক আছে, মেয়েটার ঠিকুজি জানতে চাইনি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম বয়স কত, আর দেখতে কেমন। তুই কিন্তু সে কথা এড়িয়ে বাবার গল্পই করে গেলি। কিছু লুকোচ্ছিস নাকি রে?”

চুপ করে রইল প্রিয়তোষ। সে কথা কোনও দিন কাউকে বলার নয়। নিলু তো তার ছাত্রী। তার বয়স নিলুর ডবল। তা ছাড়া, আজ পর্যন্ত কম সুন্দরী মেয়েকে গান শেখায়নি সে। তাদের অনেকের চোখেই মুগ্ধতার আবেশ দেখতে পেয়েছে। শারীরিক, মানসিক ভাবেও অনেকে কাছে আসার চেষ্টা করেছে। সব এড়াতে হয়। নইলে এই যে তার বন্দনা, রেওয়াজে বসার আগে, আসরে বসে মনে মনে বলা… ‘এসো মা ভারতী, এসো হংসবাহিনী, এসো শতরূপা মা মহাশ্বেতা। আমার স্বরে এসো, সুরে এসো, শ্রুতিতে এসো। আমার চৈতন্যে তোমার বসত হোক মা সারদা’… এ-সব মিথ্যে হয়ে যাবে। বহু ওস্তাদের নৌকো বানচাল হয়ে গেছে রিপুসংযমের অভাবে। প্রিয়তোষ লাহিড়ী শুধু যন্ত্রের মতো রেওয়াজ করে গেছে। শুধু তার সেই গোপন মেঘ, বুকের অনেক গভীরে ভিজিয়ে দেওয়া, শিউরে শিউরে ওঠা গানের কথা কেউ জানে না।

নীলিমার চোখে আলাদা করে কোনও দিন কোনও মুগ্ধতা দেখেনি প্রিয়তোষ। শুধু সে যখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসে, বেহাগের আরোহণ-অবরোহণ শোনায়, পা র্মা গা মা গা, দুই মধ্যমের মিলনে যে ব্যথা ফুটে ওঠে, তখন সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু নীলিমার চোখের দিকে তাকায় প্রিয়তোষ। আসলে নিলু নয়; অনুরণন ওঠে, মেঘছায়া ঘনায়, এমন আশ্রয় খোঁজে সে। নিলু কি ইচ্ছে করেই তখন চোখ বন্ধ করে রাখে!

আর কিছু নয়। ওর চোখদুটো যেন তার কষ্টিপাথর। জটিল বুদ্ধির মারপ্যাঁচে, আড়ি-কুয়াড়িতে নীলিমার চোখে কোনও মেঘ ঘনায় না। অথচ মধ্যসপ্তকে যখন সে এক দমে ণিণিপা ণিণিপা রেমাপাণি রেমাপার্সা বাজায়, র্সা-এ দাঁড়ালে পৃথিবী যেন সুন্দর হয়ে ওঠে, অথচ মূল র্সা তখন অশ্রুত, তবু তার রেশ থাকে, যেন সূর্যের আলো চাঁদ নিয়েছে... তখন নীলিমার চোখে মেঘতিমিরের মাঝে কী আলো! আর প্রিয়তোষ দেখতে পায় অস্পষ্ট প্রাসাদ, গঙ্গার উপর কুয়াশা। দুটো চোখের উপর কুয়াশা, মেঘ জমেছে, ভরিয়া পরান শুনিতেছি গান, আসিবে আজি বন্ধু মোর। রাগ বেহাগ। প্রিয়তোষ সরাসরি নীলিমার চোখের দিকে তাকায়।

না, এটা পুরুষ আর নারীর চিরকালের সেই প্রণয়কাতর কোনও গল্প নয়। নীলিমার সঙ্গে তার সে রকম কোনও সম্পর্ক হতেই পারে না। হওয়া উচিতও নয়। ও তো টাবুদার মেয়ে। প্রিয়তোষের অর্ধেক বয়স। তা ছাড়া, সে রকম কোনও ব্যাপার হলে সে তো কবেই টের পেয়ে যেত। কষ্ট হয়। চিরকাল এক বিন্দু ব্যবধান থেকে যায় চাওয়া আর পাওয়ার মাঝে।

ক্রমশ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Novel Novel

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy