E-Paper

উদারা মুদারা তারা

আবার গুছিয়ে শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করে নিধি। পাশের মানুষ যে রেটে নাক ডাকছে, সে এখন ফ্যানের হাওয়ায় জাগবে না নিশ্চয়ই। চাদর মুড়ি দিয়ে সেই নাসিকাধ্বনি বিশ্লেষণ করে তারই মধ্যে ভাল কিছু খোঁজার চেষ্টা করছিল নিধি। যদি এই সুরেই ঘুমটা আসে। সারাটা জীবন তো এই করেই কেটে গেল।

রাজশ্রী বসু অধিকারী

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৭:০৬

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

রাত যত বাড়ে, নিধি তত সরে। সরে যায় খাটের প্রান্তে। বেঁকে-চুরে দ’ হয়ে ঝুলে থাকে বিছানার দেড় হাত বাইরে। মুখের উপর বালিশ চাপা দেয়, যাতে কানের ফুটোয় কোনও শব্দ না ঢুকতে পারে। কিন্তু সব কারসাজি মিথ্যে করে পৃথিবীর আদি অকৃত্রিম অর্কেস্ট্রার শব্দ ঢুকে পড়ে কান থেকে মাথায়। কিছু মশা এবং অমিতেন্দু একযোগে সঙ্গীতসাধনায় নেমেছে যেন। মশাদের গানে এক সুর এক তাল, কিন্তু অমিতেন্দুর নাসিকাগর্জন বিলম্বিত বিস্তার সহযোগে উদারা মুদারা তারায় নানা ছন্দে তালে সুরে অবাধে বিচরণ করে। নিধির কানের পর্দা তো তুচ্ছ, পারলে ছাদ ফাটিয়ে চলে যায় অনন্ত আকাশে। দুইয়ে মিলে নিদারুণ অবস্থা।

নাহ্‌, এভাবে ঘুমোনো সম্ভব নয়। নিধি এপাশ-ওপাশ করে উঠে পড়ে চাদর ছুড়ে ফেলে। ফেব্রুয়ারির শেষ। গরমে ঘাম জমছে গালে, গলায়। ফ্যান চালানো যেতেই পারে। হাতের তালুতে কপাল মুছে ফুল স্পিডে ফ্যানটা চালিয়ে দেয়। মশাগুলোর হাত থেকে তো নিস্তার পাওয়া যাবে।

আবার গুছিয়ে শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করে নিধি। পাশের মানুষ যে রেটে নাক ডাকছে, সে এখন ফ্যানের হাওয়ায় জাগবে না নিশ্চয়ই। চাদর মুড়ি দিয়ে সেই নাসিকাধ্বনি বিশ্লেষণ করে তারই মধ্যে ভাল কিছু খোঁজার চেষ্টা করছিল নিধি। যদি এই সুরেই ঘুমটা আসে। সারাটা জীবন তো এই করেই কেটে গেল।

কিন্তু আশা ভুল প্রমাণিত হতে দেরি হয় না। নিধির এত ক্ষণের ‘আহ’, ‘উহ’, ‘ওরে বাবা!‌ আর পারছি না’, ‘কী দুঃশাসনের হাতে পড়েছি’, ‘বাবা গো’, ‘মা গো’ ইত্যাদি কাতর উচ্চারণেও অমিতেন্দুর যে ঘুম ভাঙেনি, এক মিনিট ফ্যান চলতে না চলতেই সেই ঘুম যেন ঘর থেকে বেরিয়ে গোবি মরুভূমিতে হারিয়ে যায়। ধড়ফড় করে উঠে বসে অমিতেন্দু। নাক ডাকা থেমেছে কিন্তু ভোকাল কর্ডে সন্তুর বেজে ওঠে। এর চেয়ে চরম বিস্ময় যেন আর কিছু হয় না, এভাবেই বলে ওঠে, “এ কী! তুমি ফ্যান চালিয়েছ?”

“হ্যাঁ। চালিয়েছি। এত অবাক হওয়ার কী আছে? ফ্যান চালানো কি ক্রাইম নাকি?”

“একে এই ভয়ঙ্কর ঠান্ডা আর তুমি ফ্যান চালালে? তা বেশ, কিন্তু আমার কম্বল কোথায়? কম্বল?” ম্রিয়মাণ রাত আলোয় ঘুম-ভাঙা চোখে অন্ধ ভিখারির মতো খাটের চার দিকে হাতড়ে হাতড়ে কম্বল খুঁজতে থাকে অমিতেন্দু। গায়ের চাদরটা টেনেটুনে জড়ায় আরও কয়েক দফা।

নিধির ঘুমের আরাধনায় আবারও জল পড়ে গেছে। নিজের গায়ের ঢাকনা ছুড়ে ফেলে সে উঠে দাঁড়ায়।

“খাটের ওপর হাতড়াচ্ছ যে, খাটে কী কম্বল আছে? দেখতে পাচ্ছ না? ঠান্ডা নেই বলে তুমিই তো বললে কম্বল তুলে দিতে। আমি ঢুকিয়ে দিয়েছি। চাদরেই হবে। শুয়ে পড়ো।”

আঁতকে ওঠে অমিতেন্দু, “শোব কী করে? এই হাওয়ায় চাদর গায়ে দিয়ে শুলেই নিমোনিয়া। বলা নেই কওয়া নেই, কম্বল ঢুকে গেল! এটা একটা বাড়ি? ছিঃ!”

ভারী শরীর টেনে নিধি আবার উঠে পড়ে। দুপদাপ করে সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে বন্ধ করে দেয় পাখার ঘুরে চলার দুঃসাহসিক ক্ষমতা। মুখে গজগজ করতেও ছাড়ে না, “না, এটা বাড়ি নয়। এটা একটা মোষের খাটাল। সারা দিন গাধার খাটুনি খাটো, দুনিয়ার লোকের অর্ডার তামিল করো, তার পর রাত জেগে মশার কামড় খাও আর নাক ডাকার বোমাবাজিতে উড়ে যাও। আমার ঘুমের দরকার নেই। আমি শুধু বেগার খাটতেই এসেছি। জঘন্য বাড়ি একটা! তার চেয়েও জঘন্য এই বাড়ির লোকজন।”

পা ছড়িয়ে বসে বসে নিধি মোবাইলে ইউটিউব সার্চ করতে থাকে। মুখ তত ক্ষণ চলবে, যত ক্ষণ না একটা কিছু দেখা শুরু হয়।

অমিতেন্দু ফ্যান বন্ধ হওয়ায় আবার চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়েছে। আবার তার জড়ানো গলা। নাকের ডাক, নাকি নাকের ঢাক, আবার মাতিয়ে তুলতে শুরু করেছে ঘরের বাতাস। সেই প্রায় ঘুমন্ত অবস্থাতেই নিধির হাত ধরে টানে সে, জড়িয়ে জড়িয়ে বলে, “মোবাইল রেখে শুয়ে পড়ো, না ঘুমোলে শরীর খারাপ করবে।”

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয় নিধি, “মরণ আমার। মোবাইল রেখে কী করব শুনি? শুয়ে শুয়ে তোমার ঢাকের বাদ্যি শুনব? ছাড়ো আমাকে।”

আবার অমিতেন্দুর নিজস্ব মিউজ়িক্যাল প্রোগ্রাম শুরু। ঘুম তার পোষা। চাইলেই এসে যায়। সেই সঙ্গে এতক্ষণ কোথায় যেন লুকিয়ে থাকা তিন-চারখানা মশাও এসে সঙ্গত করতে লেগেছে। ঠিক নিধির কানের চার পাশে ঘুরে ঘুরে তারা গান প্র্যাকটিস করছে। হয়তো বলছে, ‘কেমন জব্দ! আর ফ্যানের হাওয়ায় আমাদের তাড়িয়ে মজা দেখবে?’

নিধি মনের মতো একখানা সিনেমা ফোনে চালিয়ে দেখবে বলেই বসেছিল। ঘুম তার হবে না। এই গরমে বন্ধ ঘরে, মশার কামড় আর নাক ডাকার আওয়াজে কোনও সভ্য মানুষ ঘুমোতে পারে না। নিধির চোখে জল আসতে চেয়েও আসে না। এক জন মানুষের চোখে আর কতই বা জল আঁটে? সারা জীবনই তো নানা প্রসঙ্গে কান্নাকাটি করতেই হয়। সবটুকু জলই খরচ হয়ে গিয়েছে প্রায়। বিয়েটাও তো হল প্রায় সতেরো বছর। আর কি চোখে জল থাকে?

তবে কান্নার সময় যে গলাভাঙা আওয়াজ আর ফোঁপানি, সেটুকু এখনও আছে। সেই ফোঁপানি প্র্যাকটিস করতে করতেই নিধি ভাবে, থাকবই না আর এই ঘরে। ওপাশের ঘরখানা তো ফাঁকা পড়েই আছে। আজ থেকেই ওখানে শোব। অন্তত এই নাক ডাকা তো শুনতে হবে না। আর গরমেও পচতে হবে না। নড়েচড়ে উঠে খাট থেকে নামতে যায় সে। কে জানে কেন, মোশন বড্ড স্লো হয়ে গেছে। পা দুটো খাট থেকে মাটি ছুঁল, তো কোমরের নীচের ভারী অংশ আর বিছানা ছাড়তেই চাইছে না। কেবলই মনে হচ্ছে এরকম একটা সিনে স্বামীর কি উচিত নয়, আর এক বার হাত টেনে ধরে এখানেই রেখে দেওয়া! এক বার বললেই তার দায়িত্ব শেষ! নিধির নিজেকে বঞ্চিত লাঞ্ছিত অত্যাচারিত মনে হতে থাকে। তার পর মনে পড়ে যায় ওই ঘরখানার ছবি। চোখে ভেসে ওঠে এক বিশাল কুঞ্চিত কাপড়ের স্তূপ। ওয়াশিং মেশিনে কাচার পর আধশুকনো হয়ে কুঁচকে থাকা যত পরিধানগত রোজনামচার খতিয়ান।

সারা ঘরে শুধু লুঙ্গি গেঞ্জি মোজা বারমুডা নাইটি বিছানার চাদর সায়া প্যান্ট পায়জামা পাঞ্জাবি শার্ট রান্নাঘরের ঝাড়ন বালিশের ওয়াড়ের শোভাযাত্রা। ইস!... কী অসহ্য একটা দৃশ্য। বিছানা, মেঝে, চেয়ার, লেখার টেবিল, শো-কেসের মাথা, বুকশেলফের আংটা, বেতের পেপার র‌্যাক... কোনও জায়গা এতটুকু ফাঁকা নেই। ফ্ল্যাটে ভেজা জামাকাপড় মেলা যায় না। তাই আধা-শুকনো হয়ে ওয়াশিং মেশিন থেকে বেরিয়ে সেই সব কাপড়ের স্তূপ নিজেরাই নির্বিবাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সহাবস্থানে থাকে ঘর জুড়ে। দিন সপ্তাহ মাস পেরিয়ে এক না এক দিন তারা খটখট করে গান গাইতে শুরু করে। তারও বেশ মাসখানেক পেরিয়ে কোনও এক দিন নিধি সময় মুড মেজাজ এক জায়গায় জড়ো করে তাদের গুছিয়ে ফেলার উপক্রম করে। গ্রহ-নক্ষত্র-ভাগ্য সব ঠিক ঠিক থাকলে সেই কাজটা শেষ হয়। ঘরটা দিন তিনেকের জন্য ফাঁকা হয়। কিন্তু দেওয়ালগুলো বোধহয় ওই শূন্যতা নিতে পারে না। ওদের অভ্যাস হয়ে গেছে ওই স্তূপ আগলে থাকা। তাই তিন দিনের মধ্যেই আবারও অমিতেন্দু চব্বিশ ঘণ্টা ওয়াশিং মেশিন চালিয়ে ঘরটাকে পুনর্মূষিক ভব করে দেয়। তার মধ্যে নিধি কোথায় গিয়ে শোবে!

অনেকক্ষণ ইউটিউব সার্ফ করে মনের মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে খাটের ধার ঘেঁষেই আধশোওয়া হয় নিধি। আজকে কপালটাই খারাপ। এত বড় রাতটা কাটবে কিসে? মশার গান আর নাকডাকা শুনে? এমনই কপাল যে, রাগ করে একটা রাত ঘরের বাইরে পর্যন্ত যাওয়ার জায়গা নেই ওর। এই জীবন রেখে কোনও লাভ আছে?

নাহ্‌, যত রাত বাড়ছে, তত নিজেকে অনাথ আশ্রয়হীন আরও সব কী কী অ-যুক্ত, মনে হচ্ছে। নিধি অভিমানাহত মনে পাশের লোকের গায়ের চাদরটা ঠিক আছে কি না দেখে নেয়। যা ঠান্ডা বাতিক, কাল সকালে উঠে হয়তো গায়ের চাদর সরার জন্যই দশ বার প্রেশার মাপতে বসবে। ঠান্ডা লাগতে পারে ভেবেই সে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলবে। তার চেয়ে ওকে ঢাকাচাপা দিয়ে রাখাই ভাল।

আস্তে আস্তে কখন যে ওই চাদরটারই একটা কোণ টেনেটুনে নিজের উপরেও একটু বিছিয়ে নিয়েছিল, মনে নেই। হয়তো মশার হাত থেকে বাঁচতেই। অনেক ভেবে দেখেছে নিধি। মশার কামড় বা গান ভাল, নাকি গরমে সেদ্ধ হওয়া ভাল। এক বার এ ভোট পায় তো আর এক বার ও। দুটোই অসহ্য। তবু চাদরটার একটাই যৎসামান্য প্লাস পয়েন্ট, ওটার ভিতর অমিতেন্দু আছে।

ঘুম কখন এসেছে জানে না নিধি। বেশ আরামের ঘুম ছিল ভোরের দিকটায় চোখ জুড়ে।

রোদভর্তি খাটের ওপর এক সময় ধড়ফড় করে উঠে বসতে যায় সে। মেয়ে টুবলাই চা করে নিয়ে এসে ঘরে ঢুকেই চিৎকার করছে, “এ বাবা! এই হিম ঠান্ডায় তোমরা ফ্যান চালিয়ে শুয়েছ? কত দিন না বারণ করেছি?”

অমিতেন্দু ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে মেয়েকে চেঁচাতে বারণ করে। নিধির কান এড়ায় না। অমিতেন্দু ফিসফিস করছে, “আস্তে কথা বল। তোর মা খুব ঘামছিল। আমিই ভোরের দিকে ফ্যানটা চালিয়ে দিলাম। আহা, বেচারা আমার জ্বালায় ঘুমোতেই পারে না।”

মনে মনে মুখ বেঁকায় নিধি। কত ঢং! এই সব শুনেই তো লোকে ভাবে কত্ত ভালবাসা! যা-ই হোক আর তা-ই হোক, এই নাকের ডাকওলা লোকটাকে নিয়েই তো জীবন কেটে গেল। এই ঘর ছেড়ে নিধি আর যাবেই বা কোথায়! ফ্যানটা দেরিতে হলেও চালিয়েছে তো! নাকের আওয়াজটাও ফ্যানের হাওয়ায় বেশ অভ্যেসহয়ে গেছে।

আজ দুপুরে কম্বলটা না হয় আবার বার করেই দেবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Literature Bengali Short Story Bengali Story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy