E-Paper

কালির দাগ

আমি ডাকলে ও আপত্তি করে না, কিন্তু আজ আসতে চাইছিল না কিছুতেই। কথা বলে মনে হল, মুড ভাল নেই একেবারে।

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ০৯:৪৬
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

চার দিকে তুমুল ব্যস্ততা। এক দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর উচ্চকিত প্রচার তুঙ্গে। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানেরা টহলদারি শুরু করে দিয়েছে এলাকা জুড়ে। অন্য বারও ভোট আসে, পরিবেশ এমন গরমই থাকে। কিন্তু সেই উত্তাপের মধ্যে এবারকার আবহাওয়া থমথমে। এক ধরনের চাপা উত্তেজনা ঝুলে রয়েছে হাওয়ায়। এবার কী হবে কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারছে না! ভোটের আর পুরো দু’সপ্তাহও বাকি নেই।

ছুটির দিন বিকেলের দিকটা এই রকম ফাঁকা পেলে আমি মানিককে ডেকে নিই। ও আসে ওর লজ্‌ঝড়ে টোটোটা নিয়ে। দু’জনে মিলে বেরিয়ে পড়ি টাউনের বাইরের দিকে কোনও খোলামেলা জায়গার উদ্দেশে। এমন কোনও জায়গা, যেখানে এই গরমকালে আদিগন্ত খোলা মাঠে ঝোড়ো হাওয়া রয়েছে। নির্জন কোনও এক কোণ খুঁজে নিয়ে আমরা বসি। গপ্পো করি, সংসারের নানা সুখ-দুঃখের কথা হয়। মাঝে মাঝে একে অপরকে গানও শোনাই আমরা। আমাদের গানের গলা তেমন ভাল নয়, তবু নির্জনে কারও সঙ্কোচের কিছু থাকে না।

আমি ডাকলে ও আপত্তি করে না, কিন্তু আজ আসতে চাইছিল না কিছুতেই। কথা বলে মনে হল, মুড ভাল নেই একেবারে। এমনিতে ভয়ডরের বিশেষ ধার ধারে না, তবু আজ বলল, “এখন ও-সব জলাজঙ্গলের দিকে না গিয়ে বসাই ভাল। ভোটের আগের টাইম বলে কথা স্যর, যত রাজ্যের গন্ডগোল-খুনখারাপি হয় এই সময়। মেরে-কেটে ফেলে দিয়ে গেলে কেউ দেখতে যাবে না। আমার নয় জীবনের কুনু দাম নেই, আপনার তো আছে।”

কিন্তু ওর বারণে আমি কান দিইনি, জোর করে, দেড়গুণ ভাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওকে নিয়ে এসে বসেছি ব্রিজ পেরিয়ে, নদীর ধারে ‘মায়াকোল’ নামক এই গ্রামের চাষের খেতের এক পাশে। যত দূর চোখ যায়, এখানে সব কিছু আশ্চর্য মেদুর। বাঁক নেওয়া অলস নদীটার হাওয়া ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের, আর তার উপর আজ সকাল থেকেই আমাকে শ্যামল মিত্রের গানে পেয়ে বসেছে। এখানে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ওঁর সুর করা হৈমন্তী শুক্লের গাওয়া ‘এমন স্বপ্ন কখনও দেখিনি আমি, মাটিতে যে আজ স্বর্গ এসেছে নামি...’ গানটা গেয়ে ফেললাম পুরোটা, কিন্তু আজ মানিকের কী হয়েছে কে জানে, গানে একেবারেই মন দিল না। মুখটা ভারী, চোখের তলা কালি, সিসের মতো কালচে ধূসর হয়ে রয়েছে আপাদমস্তক।

ঘাড়ে হাত রেখে বলি, “কী হয়েছে মানিক? তুই তো বরাবর হাসিখুশি ছেলে, আগে বেড়াতে বেরিয়ে কখনও এরকম বেজার মুখ দেখিনি, বাড়িতে কিছু হয়েছে? বৌয়ের সঙ্গে খটামটি?”

“না স্যর, বাদ দেন, কপালটাই এমন পোড়া! এতো ছুটোছুটি করলাম, এতো চেষ্টাচরিত্ত, কিস্‌সু হল না।”

“কী হল না! কী নিয়ে এত চেষ্টাচরিত্র করলি?” প্রশ্ন করি আমি।

“কী আর বলব, এ-সব কথা কী আর মুখ ফুটে বলা যায়!”

“কী বলা যায় না? আমার সঙ্গে তো তোর তেমন সম্পর্ক নয়। তুই তো আমায় সব কথাই বলিস, কোনও কথা লুকোস না বলেই জানি।”

“লুকুই না কিন্তু এটা কুন মুখে বলতাম বলেন!” বেশ খানিক ক্ষণ চুপ করে থেকে পড়ে থাকা এক টুকরো ইট নদীর থেকে বেরিয়ে থাকা জলাটার দিকে ছুড়ে দেয় ও।

“কোন মুখ মানে! আমার-তোর সম্পর্ক তো কোনও দিনই সে রকম ছিল না যে কিছু বলতে আটকাবে।”

“ঠিকই স্যর। আসলে কী জানেন, এবারও ভোট দিতে পারব না। যা-যা কাগজপত্তর ছিল, সবই তো জমা দিয়েছিলাম। পেরায় কেসটা মেরে এনেছিলাম, ভেবেছিলাম এবার নামটা উঠে যাবে, কিন্তু কিছুই তো হল না, অফিছার বলে দিল হবে না, কিছু করার নেই।”

“সে কী? তোর ভোটার লিস্টে নাম নেই, জানতাম না তো? তোর তো এখানেই জন্ম, এখানেই স্কুলে সেভেন অবধি পড়েছিস তো বলেছিলি।”

“ঠিকই বলেছিলাম। ইস্কুলের রেজ়াল্ট, সাট্টিফিকেট সবই আছে, দু’চাকা-চারচাকা চালানোর লাইছেন, র‍্যাশন কার্ড, আধার কার্ড, লাইট বিল সবই আছে কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, সবই আমার কপালের ফুটো গলে পড়ে গেল।”

“কেন, কপালে ফুটো মানে? কেমন ফুটো শুনি?”

“কী বলি বলেন তো! বললে আপনি আমায় কী না কী ভাববেন! কিন্তু এতে আমার তো কুনু দোষ নেই, আমার মায়েরও। মায়ের খালি একটাই দোষ, সে এক হাবাগুবা, বেভুলো মহিলা ছিল। লোকের বাড়ি পাঁচবেলা খাটতে খাটতেই জীবন কাবার। লিখতে-পড়তে জানত না, কাগজপত্তর কিচ্ছু করায়নি, দু’হাজার দুয়ের লিস্টেও মায়ের নাম নেই।”

“আর তোর বাবা?”

“বাবা, ওরে বাব্বা!” ঠাট্টার ঢঙে হেসে ওঠে মানিক, “আমার বাবা বলে কুনুদিন কি কিছু ছিল!”

“মানে?” আমি অবাক হই।

“মানে তো আমিও জানতাম না, কয়েক মাস আগে জেনেছি। কিন্তু এখন সে মানুষ অন্য লোক, তাকে দিয়ে আমার আর কিছু হবে না।”

“কী সব বলছিস! খোলসা করে বল, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না।”

“বললে বাবাকে নিয়ে আবার কী ভাববেন, ভুল তো মানুষ মাত্তরেরই হয়। এক সময় বিচ্ছিরি রাগ হত, মনে হত দেখা হলে মেরে হাড়গোড় ভেঙে শুইয়ে দিতে পারলে শরীলের জ্বালা জুড়োয়। কিন্তু এক দিন এমুন করে তাকাল, মনে হল যাক্‌গে, যা হওয়ার হয়ে গেছে।”

আমি হাঁ করে চেয়ে থাকি।

কপালের ওপর এসে পড়া চুল খামচে ধরে মানিক বলল, “আমার বাপ ছিল ভবঘুরে। আমাদের দুই ভাইকে যখন জম্ম দিয়েছিল, সেই দু’-তিন বছর মায়ের সঙ্গে ছিল। তখন তেনার নাম ছিল মিন্টু সাহা। সেই থেকে আমার নাম মানিক সাহা, ভাইয়ের নাম মোহন সাহা। তার পর সে লোক উধাও, বিশ বছরের ওপর পুরো হাওয়া, বেঁচে আছে কি না জানতাম না, মুখও মনে নেই। ওই মিন্টু সাহা, বাপের নাম নিয়েই আমরা ইস্কুলে ভর্তি হয়েছি, ওই নামই আছে আমার সব কাগজপত্তে।”

“এখন সে লোক ফিরে এসেছে তো? তা হলে কী সমস্যা?”

“সমস্যা মানে, সমস্যাই সমস্যা। সে লোক উধাও হয়ে যাওয়ার পর হাওড়ায় গিয়ে ফের বিয়ে করে। সেখানে তার নাম কমল সাহা। সেই পক্ষের তার আর এক ফেমিলি আছে, বৌ, একটা ছেলে, একটা মেয়ে। ভোটের লিস্টে নাম-ফাম তুলে এখন ওখানকারই লোক পঁচিশ-তিরিশ বছর ধরে। তা হলে আমার বাবা কে হল, মিন্টু সাহা না কমল সাহা? মিন্টু বলে তো আর কেউ নেই দুনিয়ায়, কাগজ ছাড়া তো মানুষ হয় না শুনছি, তা হলে আমার জম্ম কে দিইছিল?”

“এ বাবা, এ তো মহাসমস্যা!”

“এবার এছআইআর যখন শুরু হল, বাড়িতে কাগজ করতে বিএলও দিদিমুনি এল, আমার বৌয়ের নামে ফরম দিল, কিন্তু আমার নাম কেউ বলল না। কুনু লিস্টিতেই কোতাও পাওয়া গেল না। তা হলে আমি কি নেই, আমার পায়ের তলার মাটি...”

“তোর কাগজপত্র দেখালি না এসডিও অফিসে নিয়ে গিয়ে?”

“দেখালাম, ধাবা থেকে অনলাইন ফরমে সব জমাও দিলাম। কিন্তু তাতে কিছুই তো হল না। তখন মাথায় রোখ চেপে গেল। সেই লোককে আমার মায়ের দিকের চেনাশুনা কারা নাকি কয়েক বছর আগে দেখেছিল টাউনে, তাদের কাছ থেকে খোঁজপাতি করে পৌঁছুলাম উলবেড়িয়ায়, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে খুঁজে বের করলাম। দেখে তো আমি থ, যে কুনু বাচ্চাও দেখলে বলে দেবে আমিই ওই লোকের ছেলে। সবটা খুলে বলতে সে লোকের গলা শুকিয়ে কাঠ, পালানোর পথ পায় না আর কী! ধরে-পাকড়ে বসিয়ে বললাম, ‘আমি তোমার কাছে অন্য কুনু ধান্দায় আসিনি, তুমি যে আমার বাপ সেটা স্বীকার করো তো নাকি?’”

“কী বলল তাতে?”

“সব মেনে নিল, অনেক ভুল করেছে স্বীকার করল। কিন্তু কাঁদো-কাঁদো মুখে হাত চেপে ধরে বলল, আমি যেন মাফ করে দিই। আমাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে বসাতে পারছে না বলে নাকি দুঃখের শেষ নেই।”

“সে ঠিক আছে, কিন্তু কোর্টে গিয়ে ওই মিন্টু সাহা আর এই কমল সাহা যে একই লোক, সেটা তো প্রমাণ দিতে পারবে? এফিডেভিট যাকে বলে।”

“সেই বুদ্ধিও এক জন দিইছিল, কিন্তু হিয়ারিং-এর অফিছার বলে দিল, এপিঠ-ওপিঠ নাকি কুনু পোমান নয়। আমাকে নাকি মামলা করে পোমান করতে হবে, ওই দুই নাম একই লোকের।”

“এ তো প্যাঁচালো কেস!”

আমি আর দেরি না করে, ওখানে বসেই ফোন লাগালাম আমার দুঁদে উকিল বন্ধু শুভজিৎ রায়কে। সে পরিষ্কার জানিয়ে দিল, আশু অন্য কোনও উপায় নেই। বাদীপক্ষকে মুনসেফ কোর্টে ডিক্লেয়ারেটরি স্যুট করতে হবে, আন্ডার সেকশন থার্টিফোর অব স্পেসিফিক রিলিফ অ্যাক্ট, নাইনটিন সিক্সটি থ্রি।

সে-কথা ওকে বলায় আরও মুষড়ে পড়ল মানিক। বিড়বিড়িয়ে উঠল, “মা তো আর বেঁচে নেই, তার সঙ্গে বাপেরও ঠিক নেই, এ-কথা কেউ যাতে না বলতে পারে তাই একটা কাগজ খুব দরকার ছিল। বাপ অবিশ্যি ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল কাগজপত্তর করতে যদি তেনাকে লাগে ডেকে নিতে, তিনি চুপিচুপি এসে সব লিখিতপড়িত করে দিয়ে যাবেন। কিন্তু তার পর থেকে সে তো আর ফোনই ধরে না। ফোন করলে দেখি ফোন বন্ধ।”

“কী করে করে দেবে, আইনত তো এক জন হিন্দু পুরুষের দুটো বিয়ে থাকতে পারে না। তোর হাতে কাগজ থাকলে বা কোর্টের আদেশনামা থাকলে তুই তো তার সম্পত্তি পর্যন্ত দাবি করতে পারিস, তখন তার পরের পক্ষের বৌ-ছেলেমেয়েদের কী হবে!”

“কিন্তু আমার তো সে সবের এক কানাকড়িও কিছু চাই না।”

“সেটা তুই জানিস, সে লোক তো জানে না। তা ছাড়া তুই মামলা করবিই বা কিসের জোরে। সে যখন তোদের দুই ভাইয়ের বাপ হওয়ার কারণ হয়েছিল, সেই সময়ের তো কোনও ছবি, এক টুকরো ছেঁড়া কাগজও নেই। আছে কি?”

“নাঃ, কিচ্ছু নেই!” পাঁজর ফাঁকা করে বেরোনো একরাশ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল মানিকের রোগা বুক থেকে, “তা হলে কী হবে?”

“কোনও উপায় তো দেখছি না। একমাত্র ডিএনএ টেস্ট ছাড়া মনে হয় না আর কোনও উপায় আছে। সে কী জিনিস বুঝিস?”

সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বলল সে সব কী ভাবে হয় না বুঝলেও, ব্যাপারটা কী তা শুনেছে লোকমুখে। সযত্ন হাত ওর ঘাড়ে হাত রেখে বললাম, “অদ্দূর কি যাবি, যেতে পারবি? সে কিন্তু অনেক দিনের ধাক্কা। তা ছাড়া তো উপায় নেই, একমাত্র ঈশ্বর নেমে না এসে সাক্ষী না দিলে আর তো কোনও রাস্তা নেই এই মিন্টু আর কমলকে এক করার।”

“যেতে পারব, কিন্তু যাব না। আমার জন্য কিছু মানুষের মাথায় বাজ পড়ুক, ক’টা নিদ্দোষ মানুষের ক্ষতি হোক, তা চাই না স্যর।”

“কিন্তু সে-ক্ষতি না হলে যে তোর কোনও হিল্লে হবে না?”

“সে না হোক, বেঁচে তো আছি, থাকবও যা হোক করে। বাতিল, তাই সই, মানুষ তো নাকি?”

“সে তো ঠিকই...” বলে শ্বাস ফেলে মাথা হেঁট করি আমি।

অদূরে একটা আগাছার ফুলের থোকার উপর একটা বড়সড় রংচঙে প্রজাপতি বসে মধু খাচ্ছে। ভাঁজ করা হাঁটুর উপর থুতনিটা রাখে মানিক, ওদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলে, “ওই যে এখন পোজাপতিটা বুনোফুলের থোকাটার উপর বসে আছে, আর একটু বাদে আর একটা থোকায় গিয়ে বসবে। তার থেকে যে ফলগুনো হবে, সেগুনোর মা-বাপ সবই তো ওই আগাছাটা। পোজাপতিটার তো কেউ খোঁজ নিতে যাবে না, বলেন স্যর!”

“সে করে আর কী হবে।”

“আমরা যদি গাছপালাদের মতো হতাম, কী ভাল হত তাই না, বলুন...”

আমি ম্লান হাসি। অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। ওকে কী বলে সান্ত্বনা দেব, বুঝতে পারি না।

সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মানিক বলে, “অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল, নখের উপর ভোটের কালির দাগ দেখব। এ জীবনে আর সে জিনিস দেখা হবে না স্যর। দুটো পয়সার লোভে এ-পাটি ও-পাটির হয়ে ছাপ্পা ভোট বেশ ক’বার দিইছি আগে। কিন্তু নিজের নখে কালি দেখার সুখ তো আলাদা, কী বলেন?”

নিরুত্তর তাকিয়ে আছি, চোখের সামনে নির্লিপ্ত চরাচর। প্রজাপতিটা শেষ হয়ে আসা এই বিকেলের হাওয়ায় আলতো চাপ দিয়ে উঠে ডানা মেলে উড়ে গেল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy