Advertisement
E-Paper

নিজের হাতে নিরামিষ রান্না করে খাওয়ালেন

পিট সিগার। যাঁর গাওয়া ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ বা ‘হু কিলড নর্মা জিন’ আজ ইতিহাস। একাধিক বার গাইতে এসেছেন এই বঙ্গেও। কুকি তৈরির রেসিপি জানিয়ে দেন ভারতীয় বন্ধুকে। গত শুক্রবার ছিল তাঁর জন্মশতবর্ষ। কিছু দিন অপেক্ষা করলাম। উত্তর নেই। সাহস করে এক দিন ফোন করে বসলাম। পেলাম। আমতা আমতা করে ওঁকে জানালাম, কী উদ্দেশ্যে ফোন করেছি। উনি বললেন, ২৫ জানুয়ারি ওঁর একটি অনুষ্ঠানে যেতে।

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০১৯ ০০:০১

সালটা ১৯৯৪। আমি তখন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিশ স্কুল অব দ্য আর্টস’-এর ছাত্র। পড়ি পারফর্মেন্স স্টাডিজ়, কিন্তু বৈষয়িক পরিখার বাইরে গিয়ে সবে ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ বলে একটা কোর্স শেষ করেছি ছবি তৈরির উপর। শেষ করতে করতেই মনে হচ্ছিল, এমন একটা বিষয়ে ছবি করতে হবে যা আমার প্রবাসী জীবনের সঙ্গে বাঙালিয়ানাকে মিলিয়ে দেবে। এমন একটা কাজ যা কলকাতায় সেই সময় কেউ করছেন বলে আমার জানা নেই। তার বছর দুই আগে পরিচিত হয়েছি সুমন চট্টোপাধ্যায়ের (তখনও তিনি কবীর সুমন হননি) গানের সঙ্গে। সেই গানের অভিঘাত দু’বছরে পরিণত হয়েছে তথ্যচিত্র তৈরির অভিপ্রায়ে। সুমনদার সঙ্গে ফোনে আলাপ করে নিলাম। নম্বর দিলেন কলেজ-বেলার বন্ধু শ্রীকান্ত আচার্য। সুমনদার সম্বন্ধে খবর নিচ্ছি চারদিকে। নিতে গিয়ে জানলাম আশির দশকে আমেরিকায় থাকাকালীন, ওঁর আলাপ হয়েছিল সে দেশের প্রবাদপ্রতিম সংগীতশিল্পী পিট সিগারের সঙ্গে, অসমবয়সি অথচ গভীর বন্ধুত্বও হয়েছিল। সেই সূত্রে মনে হল আমার ছবিতে পিট সিগারের সাক্ষাৎকার থাকা উচিত। সুমনদার কাছে ওঁর ঠিকানা ও ফোন নম্বর চাইলাম।

প্রথমে চিঠি লিখলাম পিটের পোস্ট-বক্স নম্বরে— ৪৩১, বিকন, নিউ ইয়র্ক। কিছু দিন অপেক্ষা করলাম। উত্তর নেই। সাহস করে এক দিন ফোন করে বসলাম। পেলাম। আমতা আমতা করে ওঁকে জানালাম, কী উদ্দেশ্যে ফোন করেছি। উনি বললেন, ২৫ জানুয়ারি ওঁর একটি অনুষ্ঠানে যেতে। অনুষ্ঠানের পরে বসে কথা বলবেন। জীবনে সেই প্রথম বার পিট সিগারের গান শুনলাম সামনে বসে। ছোট অনুষ্ঠান। কিন্তু অসামান্য। শিশু বয়েস থেকে শুনছি ওঁর গান, আমার বাবার আমেরিকা থেকে আনা একটি লং-প্লে রেকর্ডে— ‘উই শ্যাল ওভারকাম’, ‘হু কিল্‌ড নর্মা জিন’, ‘লিটল বক্সেস’, ‘হোয়্যার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার্স গন’ ইত্যাদি। ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে গানগুলি মাথায় বসে গিয়েছিল। কোনও দিন ভাবিনি সামনাসামনি বসে ওঁর পারফর্মেন্স দেখব। অনুষ্ঠানের পরে উনি গ্রিনরুমে দেখা করলেন। বললাম তথ্যচিত্রের জন্য সাক্ষাৎকার দিতে। এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। সেদিন সময় নেই হাতে, বললেন, ডায়েরি দেখে জানাবেন কবে সময় দিতে পারবেন। ওই অনুষ্ঠানের পরেই, জানুয়ারির শেষ দিকে হঠাৎ পিটের কাছ থেকে একটি অপ্রত্যাশিত পোস্টকার্ড! আমার সেই প্রথম লেখা চিঠির জবাব। পিটের ভক্তদের চিঠির পাহাড়ের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল সেই চিঠি। তাই দেরি হয়েছে জবাব দিতে। প্রথম চিঠিতে আমি ব্যাঞ্জো শেখার কথা লিখেছিলাম। জবাবে উনি সে ব্যাপারে সাজেশন দিয়েছেন। সব শেষে বলেছেন, ২০ ফেব্রুয়ারি ওঁর আর একটি অনুষ্ঠানে আসতে, আরও বিশদে কথা বলার জন্য।

২০ তারিখে গেলাম। এবার বড় অনুষ্ঠান। তবে ৭৪ বছরে পিট আর একা গোটা সন্ধে গাইতে পারেন না, তাই বড় অনুষ্ঠান হলে, নাতি তাও রডরিগেজ়-কে নিয়ে পারফর্ম করেন। আবার চমৎকৃত হলাম! অনুষ্ঠানের পরে উনি আলাদা করে বসলেন। তখন বুকে বল এনে ওঁকে আর একটি আবদার জানালাম। অবশ্য আমার আবদার নয়, সুমনদার। সেই আশির দশকে সুমনদার গান শুনে পিট ওঁকে বলেছিলেন গিটার বাজিয়ে গান গাইতে। সুমনদা তখন গিটার বাজাতে জানতেন না। পিট বলেছিলেন, শিখে নিতে। সুমনদার ইতস্তত ভাব দেখে পিট বলেছিলেন, “শিক্ষার কোনও বয়স হয় না।” তাতেও সুমনদার সংকোচ কাটে না দেখে উনি লোভ দেখিয়ে বলেছিলেন, “সুমন, তুমি যদি প্রমাণ দিতে পার যে, গিটার শিখেছ এবং দর্শকের সামনে গিটার হাতে মঞ্চে উঠেছ, আমি তোমাকে একটি বিশেষ উপহার দেব। উডি গাথরি (আমেরিকার আর এক প্রবাদপ্রতিম লোকগান বাঁধিয়ে-গাইয়ে) অসুস্থ হওয়ার আগে আমাকে তাঁর নিজের ব্যবহার করা একটি বারো তারের গিটার দিয়ে গিয়েছিলেন; সেটা আমি তোমাকে দেব।” সুমনদা কথায় কথায় আমাকে এই ঘটনার কথা বলেছিলেন। আমি সুমনদার গিটার-বাজানোর প্রমাণস্বরূপ ‘তোমাকে চাই’-এর ক্যাসেট পিটের হাতে তুলে দিয়ে সে কথা স্মরণ করাতেই উনি বললেন, কিছু দিন পরেই নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত কার্নেগি হল-এ ওঁর আর একটি বড় অনুষ্ঠান আছে। এই অনুষ্ঠানে ওঁর সহশিল্পী উডি গাথরির পুত্র আর্লো গাথরি। সেই অনুষ্ঠানে উনি শেষ বার উডির বারো তারের গিটার বাজিয়ে সেটি আমাকে দিয়ে দেবেন, সুমনদাকে কলকাতায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য!

মুহূর্ত: পিট ও তোশি সিগার এবং দুই বন্ধুর সঙ্গে লেখক (একদম ডান দিকে)

আমি তো হতবাক! পৃথিবীর দুই প্রান্তে দুই সংগীতধারার এমন ঐতিহাসিক মেলবন্ধন ঘটবে, তাও আবার আমার মতো অর্বাচীনের ঘটকালিতে? ক’দিন পরেই হাজির হলাম কার্নেগি হল-এ। ইতিহাসের সাক্ষী হলাম আবার। এক ঢিলে দুই পক্ষীরাজ— পিট সিগার ও আর্লো গাথরি। স্বপ্নেও ভাবিনি এই দুই প্রবাদপুরুষকে এক মঞ্চে দেখার, গান শোনার সৌভাগ্য আমার কোনওদিন হবে। দু জনেই সমান দাপটে দর্শককে মাতিয়ে রাখছেন—গানে তো বটেই, কথায়, ঠাট্টায়, রাজনৈতিক মন্তব্যে, সঙ্গে অসামান্য গিটার ও ব্যাঞ্জো, কখনও আবার উপরি পাওনা হার্মোনিকা। চোখের পাতা ফেলারও জো নেই। মানুষকে এ ভাবে মাত করে, কাছে টেনে নিতে খুব বেশি শিল্পীকে দেখিনি ইহজীবনে। অথচ স্রেফ ‘ফিল গুড’ আবেগ নয়, চিন্তনের পথে মানুষকে টেনে আনছেন দুজনেই, ভাবাচ্ছেন। যেন পথে নামানোর রিহার্সাল। অনুষ্ঠানের পরে সিকিউরিটির বাধা পার করে (পিট তাঁদের বলে রেখেছিলেন) গেলাম দেখা করতে সেই গ্রিনরুমে, যেখানে দুনিয়ার সমস্ত শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা কোনও না কোনও সময়ে বসেছেন, বিশ্রাম নিয়েছেন, রেওয়াজ করেছেন, অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। অপেক্ষা করতে লাগলাম, পিট কখন ভক্তদের হাত থেকে ছাড়া পাবেন। অবশেষে সময় হল। ভিতরের ঘরে ঢুকে বার করে আনলেন বাক্সবন্দি গিটার। বাক্স খুললেন। আমার ভিডিয়ো ক্যামেরা ততক্ষণে চালু হয়ে গিয়েছে। দেখলাম, সেই মহান শিল্পীদের হাতের কানমলা ও আদর-খাওয়া বুড়ো গিটারটাকে। পিট ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সুমনদাকে মুখেমুখে খোলা চিঠি ‘বললেন’— “সুমন, তোমাকে এই বিশেষ গিটারটি পাঠালাম। তোমার সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে জানি না… বেশি দেরি না হওয়াই ভাল। তার আগেই আশা করব, শিগগিরই এক দিন এই যন্ত্রটি তোমার হাতে প্রাণ পাবে, আরও অনেক গান লিখতে থাকবে তুমি, গাইতে থাকবে… আরও অনেক মানুষকে স্পর্শ করবে, তাদের কাছে টেনে নেবে, তোমার সুর দিয়ে।”

গিটারটি নিয়ে গিয়ে সুমনদার হাতে তুলে দেওয়ার কাজটা সেই বছরই সম্পন্ন করেছিলাম। দমদম বিমানবন্দর থেকে সোজা যশোর রোডে গ্রামোফোন কোম্পানির স্টুডিয়োতে। সুমনদা সেদিন হিমাংশু দত্তের গান রেকর্ড করছেন। আমি পৌঁছাতেই উডি গাথরি, পিট সিগারের ঐতিহাসিক গিটারে বাংলার শিল্পীদের হাতে বেজে উঠল হিমাংশু দত্ত সুরাপোপিত ‘বিরহিণী, চির বিরহিণী’ গানের সংগতে। পিট আর উডি অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে গেলেন বাংলা গানের শরীরে। পরে এক মঞ্চ-অনুষ্ঠানে, পিটের সুরাঙ্ক অনুসরণ করে, সুমনদা এই গিটারেই গেয়েছেন— ‘কোথায় গেল তারা’। গানের ফাঁকে ফাঁকে জবাব দিয়েছেন পিটের খোলা চিঠির— “এত ছোট হাতে এ বিশাল গিটার মানায় না।’’

কিন্তু পিটের সঙ্গে আমার বন্ধুতা আসলে শুরু হল এর পরে। গিটার নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সাক্ষাৎকার নেওয়া ছিল বাকি। সে বছরের পরের দিকে অবশেষে পিট তাঁর বাড়ি যাওয়ার ডাক দিলেন। সাক্ষাৎকারের শুটিং হবে। ট্রেনে করে গেলাম ক’জন বন্ধু মিলে। নিউ ইয়র্ক শহরের খানিক উত্তরে বিকন গ্রামে থাকেন পিট আর তোশি সিগার। পিট নিজে তাঁর ‘পিক-আপ ট্রাক’ নিয়ে এসে আমাদের তুলে নিয়ে গেলেন স্টেশন থেকে। টিলার ওপর ছিমছাম, আড়ম্বরহীন কাঠের বাড়ি। বসার ঘরের জানলা দিয়ে দেখি, সবুজের কোল কেটে বয়ে যাচ্ছে প্রশস্ত হাডসন নদী। কিছু ক্ষণ আড্ডার পরে শুটিংয়ের কাজ হল। পিট বললেন, “সংগীতকে বন্দি করা যায় না। যে কোনও জেলখানার দেওয়াল ভেদ করে সে বেরিয়ে আসতে পারে। তবে গান মানেই এক ধরনের অতি-সরলীকরণ। তাই গান শুনে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না, পথে নামতে হবে, কাজ করতে হবে। আনলেস উই অ্যাক্ট, দেয়ার উইল বি নো ওয়ার্ল্ড!” সেদিনই পিটের জাপানি-মার্কিন স্ত্রী, তোশি, পিটের আজগুবি কাণ্ডকারখানার একটি গল্প বলেছিলেন আমাদের। এক জাপানি গাড়ি-কোম্পানি একবার পিটের কাছ থেকে, কয়েক লক্ষ ডলারের বিনিময়ে, তাঁর একটি গান বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। পিট সব শুনে এক গাল হেসে বলেছিলেন, “আমি রাজি, কিন্তু একটি শর্ত আছে।” কোম্পানির প্রতিনিধি বেজায় খুশি। জানতে চাইলেন কী সেই শর্ত। পিট বললেন, “এবার থেকে আপনাদের সব গাড়ি জলে চালাতে হবে।” “মানে?’’ “মানে, তেল ব্যবহার করা চলবে না।” তোশি যখন আমাদের এই গল্প বলছেন, লাজুক পিট উঠে চলে গেলেন। আমাদের কথা বেশি বাড়তে না দিয়ে জানালেন, “লাঞ্চ ইজ় রেডি!” তোশি জানালেন, বিশেষ অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য আজ পিট নিজে হাতে সমস্ত রান্না করেছেন। নির্মেদ, নির্ভেজাল, নিরামিষ আহার। সবই নাকি ওঁর বাগানের আনাজ।

খাওয়া হয়ে গেলে ওঁর বাগান দেখাতে নিয়ে গেলেন। তখন শুনলাম এই বাগান শুধু নয়, বাড়িটাও তাঁর নিজের হাতে তৈরি। একটু একটু করে বানিয়েছেন। আমার প্রশ্নের জবাবে শোনালেন পঞ্চাশের দশকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা পেয়ে ওঁর গান বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প। কিন্তু এক ফোঁটা রাগ বা উষ্মা নেই কারও প্রতি। কোনও নিন্দে নেই, বাজে কথা নেই। শুধু দেশের প্রতি সামান্য একটু চাপা অভিমান। বললেন আমেরিকায় বাম-রাজনৈতিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কথা। হাঁটতে হাঁটতে আরও শোনালেন উডি গাথরির গল্প, বব ডিলানের প্রথম জীবনের ‘ডিলান’ হয়ে ওঠার গল্প। শোনালেন ষাটের দশকে ভারত-ভ্রমণকাহিনি, কলকাতায় পার্ক সার্কাস ময়দানের শামিয়ানা-ঘেরা মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। ঘোরা হয়ে গেলে, গাছের গুঁড়ির ওপর বসে ব্যাঞ্জো বাজিয়ে শোনালেন। আইরিশ লোকগান “ডার্লিং কোরি”-র সুর। বোঝা যাচ্ছিল না, সরোদ বাজছে, না ব্যাঞ্জো! ৭৪ বছর বয়সেও এমন অসাধারণ তাঁর হাতের দক্ষতা। শুটিং করলাম। তার পর দুঃসাহস দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটা আমার ছবির টাইটেল মিউজ়িক হিসেবে ব্যবহার করতে পারি কিনা। নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে গেলেন। পারিশ্রমিকের কথা পাড়তেই দিলেন না।

স্মৃতি: লেখককে লেখা পিট সিগারের চিঠি

বাগানের আড্ডা-গান সেরে বাড়ি ঢুকতেই দেখি এক অসাধারণ গন্ধে ভরে উঠেছে ঘর। তোশি বললেন, “শর্টব্রেড কুকি!” পিটের বানানো। গরমাগরম কুকি। মুখের মধ্যে যেন গলে গেল। ক’টা খেয়েছিলাম আজ আর ঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে কুকি খেতে খেতে যখন জানলার দিকে চোখ ফেরালাম, হাডসনের পরপারে পশ্চিম আকাশের চাদরে ছড়িয়ে আছে রাঙা গোধূলির আভা। পিট আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। থাকতে না পেরে বললাম, “গর্জাস!” পিট আমার কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে বললেন, “দিনের এই বিশেষ সময়টিতে পৃথিবীর সব নদীই সুন্দর। মানুষের মতোই।” আড়চোখে দেখি, পিটের প্রশান্ত ঋষিতুল্য বলিরেখা-আঁকা মুখে সেই একই আলোর বিভাস। গোধূলিবেলা কোনও কোনও মানুষকে ঈশ্বরের মতো অনন্যসুন্দর করে দেয়। মনে হয় ঈশ্বরকে যদি দেখতে পেতাম, বোধহয় এই রকমই লাগত। এসব আজকের ভাবনা, সেদিন মনেও আসেনি। সেদিন শুধু বলেছিলাম, “আপনার শর্টব্রেড কুকির রেসিপিটা পাঠাবেন?” কিছু দিন বাদে আমার ডাকবাক্সে পৌঁছেও গিয়েছিল রেসিপি। চেষ্টা করেছিলাম বানাতে। জমেনি!

এর পর আর একবারই দেখা হয়েছিল পিটের সঙ্গে। তবে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ থাকত। ১৯৯৬ সালে পিট শেষ কলকাতায় গিয়েছিলেন। একাধিক বার সে নিয়ে কথা হয়েছিল আমার সঙ্গে। পরে জেনেছিলাম, অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে অনুষ্ঠান হয়েছিল এবং ওঁর ইচ্ছে অনুসারে সুমনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়েছিলেন কিছু গান। পরে দেশ পত্রিকায় মানব মিত্র নামে সুমন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন সেই অভিজ্ঞতা। আমেরিকায় ফিরে আমায় বলেছিলেন বামফ্রন্ট জমানায় ওঁকে নিয়ে টানাহেঁচড়ার সেই বিচিত্র গল্প। সুমনকে নিয়ে আমার ছবির নাম দিয়েছিলাম, ‘ফ্রি টু সিংগ?’। নাম পছন্দ হয়েছিল পিটের। “আর উই রিয়েলি ফ্রি টু সিংগ? গুড কোয়েশ্চেন!” ছবির কদ্দূর কী হল, খোঁজ নিতেন সময়ে সময়ে। ছবিতে বব ডিলানের গানের একটি উদ্ধৃতি ছিল। পিট মধ্যস্থতা না করলে, সে অনুমতি মিলত না। সে সময়ে ডিজিটাল ভিডিয়ো ছিল না। ‘ফ্রি টু সিংগ?’ তোলা হয়েছিল হাই-এইট ভিডিয়ো টেপে। ছবি সম্পাদনার সময় হঠাৎ দেখি পিটের ইন্টারভিউয়ের একাংশে কিছু প্রযুক্তিগত গোলমাল হয়েছে। সেই অংশগুলি ব্যবহার করা যাবে না। অনেক ভেবে পিটকে ভয়ে ভয়ে ফোন করলাম। বললাম যে ওই অংশটুকু আবার শুট করতে হবে। এবারেও পিট এক কথায় রাজি। আমি ক্ষমা চাইতেই বললেন, “এমন তো যে কারওরই হতে পারে। টেকনোলজির সামনে আমরা সবাই অসহায়।” এবার শুট করতে গেলাম নিউ ইয়র্ক শহরের আর এক ল্যান্ডমার্ক, অ্যাস্টোরিয়ার ‘হোটেল ওয়ালডর্ফ’-এ। পিটের ঘরে গিয়ে দেখি বিলাসবহুল হোটেলের একটি বিলাসবিহীন ছোট্ট আস্তানা। পিট প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। যেতেই নিজে কফি বানিয়ে খাওয়ালেন। আধ ঘণ্টার মধ্যে শুটিং শেষ।

চার বছর লেগেছিল ছবি শেষ করতে। শেষ হওয়ার পরে ওঁকে দেখাতে গিয়েছিলাম, বিকনের সেই বাড়িতেই। সেই শেষ দেখা হয়েছিল পিটের সঙ্গে। ততদিনে কানে আর তেমন শুনতে পান না পিট। কেবল ফোনে কথা হলে কিছুটা বোঝেন। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে ব্যাঞ্জো বা গিটারের তারের ঝঙ্কার ঠিক শুনতে পান, তাই অনুষ্ঠান করে চলেছেন। তোশি বললেন, “হাই ডেসিবেল আওয়াজ বলেই শুনতে পান।” কিন্তু আমার মন বলছিল, না। শব্দের ঘরে ঋষি পিট সিগার বেঁধেছেন নিঃশব্দের কুঁড়ে। সেখানে সংগীত ছাড়া আর সমস্ত শব্দের প্রবেশ নিষেধ। শুধু সংগীত থামেনি… কোনও ইঙ্গিতেই নয়।

পিটের কাছ থেকে থেকে পাওয়া সেই প্রথম পোস্টকার্ডের মলাটে একটি সাদাকালো ছবি ছিল। কৃষ্ণকায় মহাকাশের বুকে তারা ছিটোনো গ্রহমণ্ডল। তার মধ্যে পৃথিবীর অবস্থান একটি তির দিয়ে চিহ্নিত।

উপরে লেখা— “তুমি এইখানে।” ঋষি পিটও জানতেন, এইখানেই তুমি হবে, হয়ে উঠবে, আর বিস্ময়ে জাগবে তোমার গান।

Pete Seeger Birth Centenary American Singer
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy