E-Paper

‘সাথে-সাথে সেও চলে আসে’

হাঁপানির রোগী মায়ের যখন প্রবল শ্বাসকষ্ট হত, ছোট্ট অরুন্ধতীই যে প্রাণপণে তাঁর হয়ে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটি করে দিত।

সীমন্তিনী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৩

মা এত নিখুঁত ভাবে তার কথা বলার ধরনটিকে নকল করতে পারতেন যে, ছোট্ট মেয়েটি লজ্জায় কুঁকড়ে যেত। মনে হত যেন একটা ধারালো কাঁচি দিয়ে কোনও ছবির বইয়ের পাতা থেকে তার একটা ছবির অবয়ব কাটছেন মা। তার পর কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলছেন। একটা নিস্পৃহ শীতল রোমশ মথ যেন তার বুকে চেপে বসত সেই সব সময়ে। তখনও সে জানত না, সেই মথটা তার বুকের মধ্যে বসত করবে আজীবন। জীবনানন্দের কবিতার ভাষায় সে যেন বলে উঠবে তার বড় বেলার স্মৃতিচারণে, “আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।” নিস্পন্দ মথ বারে বারে হঠাৎ জেগে উঠবে, বিশেষ করে যখন তার সামনে রচিত হবে ভালবাসা বা উষ্ণতার কোনও নিটোল দৃশ্য। সদ্যবিবাহিত বন্ধু যখন নিজের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আধো-আধো আহ্লাদি স্বরে কথা বলবে, দু’দিন ধরে তাদের ভালবাসাবাসি দেখে তৃতীয় দিনে ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন ত্রিশের কোঠার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায়। তার কারণ, তিনি পরে বুঝবেন, বুকের মধ্যে সেই অ-তিথি মথের হঠাৎ আগমন। আজও তিনি চান, আধো-আধো স্বরে কথা বলা পূর্ণবয়স্ক আহ্লাদি মানুষেরা বিধিবদ্ধ সতর্কতা নিয়ে তাঁর সামনে আসুন।

মা মেরি রায়ের আবেগহীনতা, কঠোরতা, নিষ্ঠুরতা তাঁর বুকের ভিতরে সেই মথের আবাহন ঘটিয়েছিল সে কথা ঠিক, কিন্তু সেই মায়েরই আত্মশক্তি, আধুনিকমনস্কতা, অধ্যবসায় আর মেধার অন্ধ ভক্ত অরুন্ধতী। মা দেবী নন, বরং কেরলের গোঁড়া সিরিয়ান খ্রিস্টান সমাজের বদ্ধ জলায় ঢিলের পর ঢিল মেরে চলা দুর্বিনীত গ্যাংস্টার। দুনিয়ার প্রশংসা তাঁকে যে আনন্দ দিতে পারে না, মায়ের একটি ছোট উৎসাহবাক্যে তা তিনি পান। হাঁপানির রোগী মায়ের যখন প্রবল শ্বাসকষ্ট হত, ছোট্ট অরুন্ধতীই যে প্রাণপণে তাঁর হয়ে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটি করে দিত।

অরুন্ধতীর ছোটবেলার অনেকখানি কেটেছে কেরলের আয়েমেনেমে। সেখানকার সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে যেন মিশে গিয়েছিল খালি পায়ের দস্যি বালিকা। যে জানত নদীতে পৌঁছনোর প্রতিটি চোরাপথ। সারা দিন মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াত সে। তার বন্ধু ছিল এক কাঠবিড়ালী। তার কাঁধে বসে ফিসফিস করে সব সুখ-দুঃখের কথা বলত সেই ছোট্ট জন্তুটি। পোষ্য নয়, সঙ্গী। যার নিজের স্বতন্ত্র জীবন ছিল। শুধু খাওয়ার সময়ে সে চলে আসত অরুন্ধতীর কাছে। আনারস ছিল তার প্রিয় খাবার।

দ্য গড অব স্মল থিংস-এর আম্মুর প্রেমিক ভেলুথা যাঁর আদলে তৈরি, সেই মানুষটিও ছিলেন ছোট্ট অরুন্ধতীর সঙ্গী। গ্রামের সবাই যাঁকে অচ্ছুত মনে করত, সেই মানুষটিই ধৈর্য ধরে তাকে শিখিয়েছিলেন মাছ ধরার যন্ত্র তৈরি করতে, মাছ ধরতে। ছয় না হয়ে বয়সটা ষোলো বছর হলে, হয়তো তাঁরই সঙ্গে প্রেম হত অরুন্ধতীর। এত সুন্দর, এত নরম মনের আর কোনও পুরুষকে কখনও যে দেখেননি তিনি।

তাঁর শৈশবের পরিবারটি ছিল অদ্ভুত। ছোট্ট এক গ্রামে থাকলেও তাঁর আত্মীয়েরা ছিলেন প্রকৃতপক্ষেই বিশ্বনাগরিক, সকলেই ভাগ্যবিড়ম্বিত, হেরে যাওয়া মানুষ। দিদিমার মাথায় ইঁদুরের লেজের মতো সরু বিনুনি বাঁধতে গিয়ে অরুন্ধতী টের পেতেন, তাঁর মাথার মাঝখানে মোটা সেলাইয়ের দাগ। দাদু ছিলেন ইম্পিরিয়াল এনটেমোলজিস্ট। ব্রিটিশ সরকারের মাইনে করা কীটপতঙ্গ-বিশারদ। পেতলের ফুলদানি দিয়ে মেরে তিনি ফাটিয়ে দিয়েছিলেন দিদিমার মাথা। রেগে গেলে মেয়ে মেরিকেও চাবুক মারতেন তিনি। ভিয়েনাতে থাকাকালীন বেহালা বাজানো শিখেছিলেন দিদিমা। বেহালার শিক্ষক প্রশংসা করে বলেন, “এ বার কনসার্টে বাজাতে পারবেন আপনি।” তাতে রেগে গিয়ে দিদিমার প্রথম বেহালাটি ভেঙে দেন দাদু।

মাদার মেরি কামস টু মি

অরুন্ধতী রায়

৮৯৯.০০

পেঙ্গুইন হ্যামিশ হ্যামিল্টন

অরুন্ধতীর মামা জি আইজ়্যাক ছিলেন সে কালের রোডস স্কলার। লেখাপড়ার জগৎ ছেড়ে তিনি মায়ের সঙ্গে আচার, জ্যাম আর কারি পাউডার তৈরির কারখানা চালাতেন। জি আইজ়্যাকের খ্যাপামির সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে তিন ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরে যান তাঁর সুইডিশ স্ত্রী। কারখানার এক মেয়ে শ্রমিককে পরে বিয়ে করেন জি আইজ়্যাক। মেরি রায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটিও অদ্ভুত। তামিলনাড়ুতে দাদুর বাড়ি থেকে অসহায় মেরি আর তাঁর শিশুসন্তানদের উৎখাত করতে গিয়েছিলেন জি আইজ়্যাক আর তাঁর মা। পরবর্তী কালে এই আইজ়্যাকের বিরুদ্ধেই ঐতিহাসিক একটি মামলায় লড়ে পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার আদায় করবেন মেরি রায়। অথচ তাঁরা একে অপরকে সাহায্যও করতেন সময়ে সময়ে। উপকার আর অপকারের ভাগ যেন সমান সমান, অরুন্ধতী লিখেছেন।

বাবার অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে প্রথম যে পুরুষের কাছে বিবাহপ্রস্তাব পান, তাঁকেই বিয়ে করেন মেরি রায়। কিন্তু যাঁকে বিয়ে করলেন তিনি মদ্যপ, অপদার্থ— মেরির ভাষায় ‘নাথিং ম্যান’। দুই শিশুসন্তানের হাত ধরে তাঁকে ছেড়ে এক দিন বেরিয়ে পড়েন মেরি। একার চেষ্টায় তিলে তিলে গড়ে তোলেন একটি আবাসিক স্কুল। রক্ষণশীল সমাজে বিয়ে-ভাঙা একলা মেয়ের যাত্রাপথ কতখানি কঠিন ছিল, সে বিবরণ রয়েছে অরুন্ধতীর স্মৃতিচারণায়।

অশীতিপর মেরি রায়ের মৃত্যুর পর অরুন্ধতী ভেঙে পড়লে তাঁর দাদা অবাক হয়ে যান। বলেন, “তোর প্রতি যতখানি দুর্ব্যবহার মা করেছেন, ততখানি তো আর কারও সঙ্গেই করেননি।” অরুন্ধতী অবশ্য মনে করেন, কথাটা তাঁর দাদার ক্ষেত্রেই খাটে। ষোলো বছর বয়সে বাড়ি ছাড়েন অরুন্ধতী। মাকে ছেড়ে যাওয়ার কারণ তাঁকে ভাল না বাসা নয়, বরং ভালবাসা হারিয়ে ফেলার ভয়। দ্য গড অব স্মল থিংস-এর উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন, “মাকে, যিনি আমাকে এত ভালবাসেন যে ছেড়ে দিতে পেরেছেন।” মা-ও সে কথা বিশ্বাস করতে চাইতেন। তাঁর দাদা রসিকতা করে বলেন, “গোটা বইটায় ওইটুকুই বানানো কথা।”

ছকভাঙা উদ্দাম জীবন কাটিয়েছেন অরুন্ধতী। নদীর গন্ধ গায়ে মেখে, জলের মাছ আর ডাঙার পোকাদের ভাষা শিখে যে মেয়েটি গিয়ে পৌঁছয় নিজ়ামুদ্দিন রেলস্টেশনে, অচেনা শহরে তার প্রেম হয় জিশুখ্রিস্টের মতো দেখতে এক পুরুষের সঙ্গে। তার পর আসে অনিবার্য বিচ্ছেদ। প্রথাসিদ্ধ ভালবাসাবাসির বাঁধনের যে পরিবার, সবার কাছে যা স্বাভাবিক, তা-ই যে দম বন্ধ করে দিত মেয়েটির। সবচেয়ে নিরাপদ স্থানটিকেই মনে হত সবচেয়ে বিপজ্জনক।

চির-উদাসী পুরুষ কবি যেমন বলতে পারেন ‘চ’লে গেছি ইহাদের ছেড়ে; ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে’, অরুন্ধতীও তেমন বলতে পারেন সেই অনিবার্য, অমোঘ একাকিত্বের কথা। সব পেয়েও হারিয়ে ফেলার, হেরে যাওয়ার, হেরে যাওয়া মানুষের মন বোঝা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর যে সাহস, তার উৎস অবশ্যই আপাত-নিষ্ঠুর মেরি রায়ের ভয়শূন্যতা। সমাজের চোখে চোখ রেখে অধিকার বুঝে নেওয়ার যে জেদ মা দেখিয়েছিলেন, সমাজ-রাজনীতির অনুশাসন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মেয়ে তা আদায় করতে চেয়েছেন বিদ্বেষদীর্ণ দেশের বঞ্চিত মানুষের জন্য, কখনও নর্মদা উপত্যকায়, কখনও কাশ্মীরে, কখনও বা দণ্ডকারণ্যে।

মা-মেয়ের সত্যি জীবনের গল্প আমরা পড়েছি এমি ট্যান-এর দ্য জয় লাক ক্লাব আর দ্য বোনসেটার’স ডটার-এ, ইসাবেল অ্যালেন্দে-র পলা-য়। তবে মাদার মেরি কামস টু মি অন্য স্তরের এক ক্ষমতাশালী আখ্যান, যা একাধারে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক। এ বই এক বার পড়লে আয়েমেনেমের সন্ধের বাতাস ভারী করে দেওয়া, ইঁদুরের লেজের মতো বিনুনি-বাঁধা বুড়ি দিদিমার বেহালার করুণ সুরটির রেশ থেকে যাবে আজীবন।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Arundhati Roy book review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy