ইটালীয় প্রাচ্যবিদ জুসেপ্পে তুচ্চি তাঁর টিবেটান পেন্টেড স্ক্রোল বইয়ের মুখবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, “ভারতীয় ও পারস্যের চিত্রকলা গোটা বিশ্বে যে ভাবে সমাদৃত হয়েছে, তিব্বতি চিত্রকলা এখনও পর্যন্ত ততটা হয়নি।” তিব্বতি শিল্প নাকি মূর্তিবিদ্যার নিয়মে এতটাই বাঁধা যে, সেখানে শিল্পীর ব্যক্তিগত কল্পনার জায়গা নেই বললেই চলে। তিব্বতি শিল্পকলার এই অনাদর কতটা অন্যায্য, তুচ্চি তাঁর বইয়ে তা সবিস্তারে আলোচনা করেছিলেন।
আমাদের আলোচ্য বইটিতে অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় পাঠককে প্রথমেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “পাশ্চাত্যে মৌলিকতাকে শিল্পের প্রধান মানদনণ্ড ধরা হলেও, তিব্বতি শিল্প ঐতিহ্যের নিয়মের মধ্যে থেকেই সৃজনশীলতাকে মূল্য দিয়েছে।” যে কথাটি আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে তা হল, তিব্বতি শিল্পকলায় নান্দনিকতা ও আধ্যাত্মিকতা দু’টি পৃথক ক্ষেত্র নয়, বরং তারা একে অন্যের পরিপূরক— তা সে মণ্ডল চিত্রকলার ক্ষেত্রেই হোক বা থাংকা কিংবা গুরু-লামাদের প্রতিকৃতিই হোক। হেবজ্র মণ্ডল, চক্রসম্বর মণ্ডল, গুহ্যসমাজ মণ্ডল, বজ্রপাণি মণ্ডল, এই সব মণ্ডল এক দিকে যেমন শৈল্পিক, অন্য দিকে তেমনই ধর্মীয় চেতনা আর দর্শনের দৃশ্যমান প্রকাশ।
থাংকা শিল্পের ক্ষেত্রেও বৌদ্ধতন্ত্রে বিভিন্ন মুদ্রা, তত্ত্ব ও উপাদানের প্রতীক, বিভিন্ন মহাপুরুষলক্ষণ, দেবদেবীদের চিত্রায়নের আনুপাতিক মাপ ইত্যাদি সম্পর্কে শিল্পীর সবিস্তার ধারণা থাকা জরুরি। লেখক থাংকা ও মণ্ডলের বৈশিষ্ট্য, অষ্টমঙ্গল প্রতীক (তিব্বতিতে যাকে বলে ‘টাশি তাকগ্যে’) ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে আমাদের ধন্যবাদার্হ হয়েছেন।
তিব্বতের চিত্রকলা: থাংকা, লিপি, মুদ্রণ এবং শামানি ঐতিহ্য
অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়
৯০০.০০
অমর ভারতী
শাররি ও বেরি চিত্রকলার প্রসঙ্গ স্বাভাবিক ভাবেই এই বইয়ে ফিরে ফিরে এসেছে। শাররি, বেরি, মেনরি, খ্যেনরি আর কারমা গারডি— এই পাঁচটি হল তিব্বতের প্রধান শিল্পধারা। এর মধ্যে শাররি শৈলীর সঙ্গে পাল আমলের বাংলার চিত্রকলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তিব্বতিতে ‘শার’ কথাটির অর্থ ‘পূর্ব’, আর ‘রি’ হল ‘চিত্র’। পূর্ব ভারত তথা বাংলাই যে এই শিল্পের জন্মভূমি, তা নামেই নিহিত। অতীতে এই শৈলী এশিয়ার অনেক জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ১২০০-১৪০০ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতে তা নতুন মাত্রা নিয়ে বিকশিত হয়। বেরি (তিব্বতিতে ‘বাল’ বা ভিন্ন উচ্চারণে ‘বে’ বলতে নেপালকে বোঝায়) শাররি-ই একটি উপধারা, কাঠমান্ডুর নেওয়ারি শিল্পীদের হাত ধরে যা তিব্বতে আসে। চতুর্দশ থেকে পঞ্চদশ শতকে এই বেরি-ই হয়ে ওঠে তিব্বতি চিত্রকলার প্রধান শৈলী। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে সপ্তদশ শতকের বিভিন্ন পর্বে বাকি চারটি শৈলী তিব্বতে বিকাশ লাভ করে। এর মধ্যে ‘গারডি’ নামটি উল্লেখযোগ্য। ‘গার’ শব্দটির অর্থ ‘তাঁবু’। ভ্রাম্যমাণ তাঁবুতে ঘুরে ঘুরে এই শৈলীর বিকাশ, ইংরেজিতে তাই একে বলা হয় ‘এনক্যাম্পমেন্ট স্টাইল’। আলোচ্য বইয়ের লেখক এ সব সম্পর্কে পশ্চিমি গবেষকদের বিস্তর মতামত উল্লেখ করেছেন। বইটিতে অনেক মূল্যবান প্লেট ও স্কেচও দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমি গবেষকদের রেফারেন্স এ নিয়ে আরও পড়াশোনার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কাজে লাগবে, কিন্তু থাংকা তথা তিব্বতি চিত্রকলা নিয়ে একটি সরল, সুসম্বন্ধ বিশ্লেষণ বিষয়টির রসগ্রহণে আরও সাহায্য করত। তিব্বতি ‘থাংকা’ কথাটির সঙ্গে পরিচিত আমরা অনেকেই, অনেকেই তা কিনে বাড়িতে সাজিয়ে রাখি, কিন্তু থাংকার ঐতিহ্য ও তাৎপর্য জানি ক’জন?
বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ বইটিতে লেখক করেছেন। যেমন, তিব্বতি চিত্রকলায়, বিশেষ করে মানব আইকনোগ্রাফির ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়টি। তিব্বতি থাংকাচিত্রে সাধক, লামাদের প্রতিকৃতিতে পুরুষদের প্রাধান্যই বেশি। তপস্বী নারীদের সংখ্যা সীমিত। আরও একটি বিষয়, পুরুষদের চিত্রাঙ্কনে যেখানে সামাজিক পরিচয়ের কোনও বাধা নেই, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে অভিজাত শ্রেণির মহিলারাই মূলত বিষয়বস্তুতে স্থান পেয়েছেন। যেমন, মায়াদেবী, মন্দারভা, ইয়েশে ছোগ্যাল— এঁরা। তবে এই বিষয়ে, বিশেষ করে বৌদ্ধদেবী তারা-র আইকনোগ্রাফি নিয়ে, আরও বিশদ আলোচনা প্রত্যাশিত ছিল।
লেখক তাঁর বইয়ে শামানি ঐতিহ্য ও তিব্বতের পেট্রোগ্লিফ বা শিলাচিত্রের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় শামানি ঐতিহ্যের সঙ্গে বোন ধর্মের যোগসূত্রের বিষয়টি উঠে এসেছে। বর্তমানে বোন ধর্ম বৌদ্ধধর্মের এক প্রকার শাখা হিসেবে বিবেচিত হলেও, বোন-অনুগামীরা চিরকাল দাবি করে এসেছে তাঁদের ধর্ম শাক্যমুনি বুদ্ধের কাছ থেকে আসেনি, এসেছে শেনরাপ-এর কাছ থেকে, যিনিই নাকি ছিলেন আদি বুদ্ধ। এবং তা ভারত থেকে নয়, এসেছে শাংশুং-এর পথ বেয়ে তাকশিক প্রদেশ (পারস্য) থেকে। যদিও ইতিহাসবিদদের কাছে এ সব দাবির গ্রহণযোগ্য কোনও প্রমাণ মেলেনি। আলোচ্য বইয়ে এই বিতর্কটি এড়িয়েই যাওয়া হয়েছে।
সাড়ে ছ’শো পৃষ্ঠার, সুবৃহৎ বইটি পড়তে গিয়ে যে বিষয়টি বার বার পীড়া দিয়েছে তা হল তিব্বতি শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ। লেখক বলেছেন, তিনি এই বইয়ে আমেরিকান পণ্ডিত ওয়াইলি-র প্রতিবর্ণীকরণ বিধি অনুসরণ করেছেন। ওয়াইলি যা করেছিলেন তা তিব্বতি বানান বোঝানোর সুবিধার্থে, তার সঙ্গে উচ্চারণের সম্পর্ক নেই। ফলত, তিব্বতিতে যে শব্দের উচ্চারণ ‘কার-পো’, তা লেখা হয়েছে ‘দকার-পো’ (পৃ ৩৩), ‘ছোয়ে-পা’ হয়েছে ‘ছোস-পা’ (পৃ ৩৪), ‘দাম’ ‘গদামস’ (পৃ ১৩৮)। প্রায় প্রতি পৃষ্ঠায় এমন উচ্চারণে হোঁচট খেতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূল তিব্বতি বানান ও বাংলা উচ্চারণ দুটোই ভুল লেখা হয়েছে। ৫৬৮ পৃষ্ঠায় প্রতীত্যসমুৎপাদের তিব্বতি প্রতিশব্দ ‘তেন-ডেল’ (লেখা হয়েছে, রতেন ব্রেল) এমনই এক উদাহরণ। কিছু ফরাসি নামের উচ্চারণেও একই ত্রুটি চোখে পড়ল। এত পরিশ্রমসাধ্য একটি বইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি দুঃখজনক।
পার্থপ্রতিম মণ্ডল
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)